kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

২৪ ঘণ্টায় পেঁয়াজের দামে সেঞ্চুরি!

এম সায়েম টিপু ও রোকন মাহমুদ   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০২:২১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



২৪ ঘণ্টায় পেঁয়াজের দামে সেঞ্চুরি!

পেঁয়াজের বাজারে নৈরাজ্যের পুনরাবৃত্তি হলো। গত বছর ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার খবরে রাতারাতি যেভাবে দাম চড়ে গিয়েছিল, এবারও তাই হলো। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে শতক পার করেছে পেঁয়াজের কেজি। সোমবার ভারত হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের কথা জানায়। এরপর দফায় দফায় দাম বেড়ে গতকাল পর্যন্ত খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ ১০০ টাকা পার হয়ে গেছে। আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের দামও বাড়িয়ে খুচরা বিক্রেতারা ৮০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি করেন।

পেঁয়াজের বাজারে নৈরাজ্যের লাগাম টেনে ধরতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল কাজ শুরু করেছে। চিহ্নিত অসাধু ব্যবসায়ীদের নজরদারিসহ এরই মধ্যে সাতটি উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জানা যায়, ভারতে সাম্প্রতিক বন্যার কারণে দেশের পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কায় মন্ত্রণালয় আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। সেই প্রস্তুতির আলোকে এসব উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কৌশলে মূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা ঠেকাতে করণীয় বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী আজ বুধবার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনিশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থিতিশীল রাখতে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেছি। তুরস্ক ও মিয়ানমার থেকে দ্রুত পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে আমদানি আরো বাড়ানো হবে। তার পরও সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ীদের কঠোরভাবে দমন করার পরিকল্পনাও আছে সরকারের।’ গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আজ এ নিয়ে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, দাম বৃদ্ধির এই হুজুগ পাইকারি ও খুচরা সব বাজারেই রয়েছে। এর পেছনে একমাত্র কারণ হলো ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে—এমন খবরে ক্রেতারাও আতঙ্কে বেশি করে পেঁয়াজ কেনায় নেমেছেন। ফলে বিক্রেতারাও এই সুযোগ লুফে নিতে ছাড়েননি। অথচ বাজারে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি দেখা গেল না। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে পাঁচ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া আরো চারটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশে পেঁয়াজের চাহিদার ৮০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। গত বছর ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত টনপ্রতি পেঁয়াজের দাম ন্যূনতম ৮৫০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করে দেয়। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর রপ্তানি বন্ধ করে। এরপর দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে তিন শ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে। এবার সেই আশঙ্কা থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেড় মাস আগে থেকেই দ্রব্যমূল্য মনিটরিং জোরদার করতে থাকে। প্রথমেই গত রবিবার টিসিবি খোলাবাজারে ৩০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাত উদ্যোগ : টিসিবির মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত রাখা, অবৈধভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, অসাধু ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা, আমদানিকৃত পেঁয়াজ বন্দরগুলোতে দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করা, পেঁয়াজ আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক ছাড় দেওয়া, পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলে বাজার যাতে স্বাভাবিক থাকে এর জন্য জেলা প্রশাসকের মাধমে উদ্যোগ নেওয়া। এ ছাড়া ঋণপত্র খোলার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত সময়ে যাতে পেঁয়াজ আমদানি করা যায় তার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে বাজারে অভিযান জোরদারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুসারে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে ২৫ লাখ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে ২৫ লাখ টনের বেশি উৎপাদন হয়েছে। পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য, প্রায় ২৫ শতাংশ পচে যায়। সেই হিসাবে পেঁয়াজের প্রকৃত উৎপাদন ১৯ লাখ টনের বেশি।

বাংলাদেশে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) তথ্য অনুসারে, গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ লাখ মেট্রিক টন। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১০ দশমিক ৯১ লাখ টন। গত জুলাই ও আগস্ট মাসে আমদানি হয়েছে এক লাখ ৮৪ হাজার টন।

বাজার পরিস্থিতি : গতকাল দুপুরে কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, পেঁয়াজের বাজার বেশ চড়া। ক্রেতা-বিক্রেতারা চরম অস্থির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি বুঝি বাজারের সব পেঁয়াজ শেষ হয়ে যাবে। তাই দামেও বারবার পরিবর্তন আসছিল। নতুন কেউ এসে বিক্রেতাদের কাছে দাম জানতে চাইলেই কেজিতে ৫-১০ টাকা বেশি চাইছেন। দুপুর ১২টায় বাজারে ঢুকে দেশি পেঁয়াজ ৪০০ টাকা পাল্লা (৮০ টাকা কেজি) দেখা গেল। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৪৫০ টাকায় (৯০ টাকা কেজি) বিক্রি শুরু করলেন বিক্রেতারা। ২.৩০টায় বের হওয়ার সময় এক বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলে ৫০০ টাকা পাল্লা (১০০ টাকা কেজি) দাম চাইলেন। একই অবস্থা আমদানি করা পেঁয়াজের দামেও। বিকেল পর্যন্ত কারওয়ান বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ওঠে ৩০০ টাকা পাল্লা বা ৬০ টাকা কেজি। অথচ বাজারে পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি দেখা গেল না।

জানতে চাইলে পাইকারি বিক্রেতা জসিম, আলাউদ্দিনসহ বাজারের প্রায় সব বিক্রেতার একই সুর, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। বাজারে মাল নেই।

টিসিবির হিসাবে গত এক মাসে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৪০ শতাংশ। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৮১ শতাংশ।

পেঁয়াজের বাজারে এমন অস্থিরতার মধ্যে গতকাল রাজধানীর ঢালি বাজার থেকে আলম নামের এক ক্রেতাকে দুই ব্যাগে মোট ১৫ কেজি পেঁয়াজ নিয়ে বাসায় ফিরতে দেখা গেল। আলম বলেন, ‘গত বছরও সরকার বলেছিল মজুদ পর্যাপ্ত। কিন্তু তার পরও দাম বেড়ে ২৫০ টাকায় উঠেছিল। তাই এবার আর ভুল করব না।’

তবে ভিন্নমত বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ফয়সালের। গতকাল ওই বাজারেই তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘মানুষ হুজুগে কেনে বলেই ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নেন। আমরা এভাবে হুজুগে না মাতলে তাঁরা এর একটা জবাব পাবেন। তাই এবার আমি পেঁয়াজই কিনব না।’

ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি : রাজধানী ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায়ও পেঁয়াজের বাজার চড়া। দেশি পেঁয়াজ ৯০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। নাটোরের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় হাটসহ বিভিন্ন বাজারে ৫০ টাকা কেজির পেঁয়াজ এক দিনে এক লাফে ১০০ টাকা হয়ে গেছে। লোকজন অযথা আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি পেঁয়াজ কিনছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে যশোরের বেনাপোল, লক্ষ্মীপুর, গাইবান্ধা ও ময়মনসিংহের ভালুকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৩ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে।

আমাদের নীলফামারী, লক্ষ্মীপুর, গাইবান্ধা, বেনাপোল (যশোর), ভালুকা (ময়মনসিংহ) ও গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি এসব তথ্য জানিয়েছেন।

বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার বলেন, দুই দিন ভারত থেকে কোনো পেঁয়াজ আমদানি হয়নি।

পেঁয়াজের দাম বেশি নেওয়ায় বেনাপোলে ভ্রাম্যমাণ আদালত তিন আড়তদারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। নীলফামারী জেলা বিপণন কর্মকর্তা এরশাদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছেন। গতকাল বিকেলে বড়বাজারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও র‌্যাবের অংশগ্রহণে অভিযান চালান হয়। লক্ষ্মীপুরে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি ও মূল্য তালিকা না থাকায় দুটি আড়তকে ছয় হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গাইবান্ধা সদর ও সাদুল্যাপুর উপজেলার ছয় ব্যবসায়ীকে ২৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। দোকানে মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করায় ভালুকা উপজেলার সিডস্টোর বাজারের দুই ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা