kalerkantho

মঙ্গলবার । ১ আষাঢ় ১৪২৮। ১৫ জুন ২০২১। ৩ জিলকদ ১৪৪২

সাক্ষাৎকার

এফডিআই আকর্ষণে আস্থার ঘাটতি দূর করতে হবে

ড. আব্দুর রাজ্জাক, গবেষণা পরিচালক, পিআরআই

এম সায়েম টিপু    

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১০:৩১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এফডিআই আকর্ষণে আস্থার ঘাটতি দূর করতে হবে

করোনায় বিশ্বব্যাপী বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) স্থবির হলেও ছয় থেকে সাত বছর ধরে দেশের বেসরকারি খাতে টেকসই বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার সহজেই দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিনিয়োগকারীদের কাছে আস্থা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে চীনের বাজারে ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগাতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক ড. আব্দুর রাজ্জাক সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্ট্রিগেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (আরএপিআইডি) চেয়ারম্যান।

ড. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বে বিনিয়োগ অবস্থা নাজুক হলেও বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অন্যান্য দেশের তুলনায় কোনো অংশে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ব্যক্তি খাতে দেশের বিনিয়োগ ঈর্ষণীয়। এটা ছয় থেকে সাত বছর ধরে বেশ চাঙ্গা ছিল। দেশের জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান ২৩ শতাংশ। এটা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম থেকেও বেশি। ভারতের প্রায় সমান। ভারতের জিডিপিতে বেসরকারি খাতের অবদান ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদেশি বিনিয়োগ তেমন একটা আসছে না। এর পরও গত চার বছরে এক হাজার ১০০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশের জন্য কম নয়। জিডিপিতেও এর অবদান প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশের এফডিআই যদি ৫ থেকে ৬ শতাংশ বাড়ানো যায়, জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ১০ শতাংশ। এ ছাড়া দেশে সরকারি বিনিয়োগও প্রায় ৭ শতাংশের বেশি।’

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মধ্য মেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিসহ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে সহজে রপ্তানি করা যায়, এসব খাতে বিনিয়োগে উদার হতে হবে। চীনের বাজারে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে, এটা কাজে লাগাতে হবে। এতে চীনের শ্রমঘন শিল্পের বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসতে পারে। কেননা চীনে শ্রমিক মজুরি আমাদের থেকে অনেক বেশি। বিশ্বের অন্য দেশও বাংলাদেশ হয়ে চীনে রপ্তানি বাড়াতে পারে।’

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশে সফরকালে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই বিনিয়োগের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে পারে সরকার। ওই সব বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে এরই মধ্যে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়নি বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।

বিদেশি বিনিয়োগে বাধা তুলে ধরে ড. রাজ্জাক বলেন, ‘নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বিনিয়োগ আনা কঠিন। দক্ষ জনবলের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাও আছে। অবকাঠামো দুর্বলতা নিয়ে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া বিমানবন্দর, গভীর সমুদ্রবন্দর, অভ্যন্তরীণ পরিবহনব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগকারীদের অনেক ব্যয় বেড়ে যায়। যদিও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে দেশে।’

দক্ষ জনবলের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। দক্ষ জনবল তৈরি করতে নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।’ এ ছাড়া যোগাযোগের জন্য ইংরেজি দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এ জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোরও তাগিদ দেন।

বিদেশি বিনিয়োগের সুফল তুলে ধরে ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিনিয়োগ এলে জ্ঞাননির্ভর প্রযুক্তি আসবে। দক্ষ শ্রমিক আসে। ফলে অভ্যন্তরীণ শিল্প এবং শ্রমিক সমৃদ্ধ হয়। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিশ্বব্যাপী ভালো যোগাযোগ থাকে। আর এই সক্ষমতার কারণে বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থায় সুযোগ তৈরি হয়। এ ছাড়া এফডিআই না আসা পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশ রপ্তানিপণ্য বহুমুখী করতে পারেনি।’

চীন থেকে সরে আসা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নিয়ে আসতে করণীয় জানতে চাইলে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘চীনের বাজারে বাংলাদেশকে ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্যোগ চমৎকার। এই চমৎকার উদ্যোগে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন করেই পরিপূর্ণ করতে হবে। ট্যানারিপল্লীর মতো শুধু অবকাঠামো করলেই হবে না, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার সিইটিপিসহ আনুষঙ্গিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।’

এফডিআই আনতে দেশের সরকারপ্রধানরা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারেন—এই বিষয়ে ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে প্রচারণায় জোর দিতে হবে। এই প্রচারণা হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য। বিনিয়োগকারী যেন বিশ্বাস করে। সুনির্দিষ্টভাবে তাদের জন্য কী কী সুবিধা আছে, তা তুলে ধরা। সেখানে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি রাখা যাবে না। এ ছাড়া যারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে করে সুফল পেয়েছে তাদের কথা বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা যেতে পারে।’ ড. আব্দুর রাজ্জাক কমনওয়েলথ সচিবালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের সাবেক প্রধান।



সাতদিনের সেরা