kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

বাজেট ২০২০-২১

করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের বাজেটোত্তর ভাবনা

অধ্যাপক ড. এ.এফ.এম. মফিজুল ইসলাম   

২৭ জুলাই, ২০২০ ১৪:৫৯ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের বাজেটোত্তর ভাবনা

নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণে যাই চন্দ্রিমা উদ্যানে। সূর্যোদয়ের পূর্বেই তিন তলা থেকে ধাঁই ধাঁই করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেট পার হয়েছি মাত্র। সে কি করুন দৃশ্য! ট্রাক ভরা হাঁড়ি-পাতিল, খাট, তোষক-বালিশ, ফ্রিজ। বাড়ীওয়ালা বকেই চলেছে, ভাড়া না দিয়ে চোরের মত কোথায় পালাচ্ছেন? ভাড়া দিন, ট্রাক ছাড়ুন। পাঁচ তলার সাদেক সাহেব (ছদ্মনাম) অঝোরে চোখের জল ফেলছে, বারবার বাড়ীওয়ালাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, করোনায় কম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেছে, চাকরি নেই। আমি তো বলেছি দেশে গিয়ে জমি বিক্রি করে ভাড়া আমি দিয়ে দিব। কে শুনে সে কথা।

দূরে দাঁড়িয়ে বাবার বেদনাশ্রু অবলোকন করছে তাঁর ষোড়শী কন্যা আর শিশু পুত্র। মা বোরখার আড়ালে মুখ লুকিয়ে চোখের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। পুত্র-কন্যার মুখাবয়ব অন্ধকার, বিষাদের কি করুন ছায়া। সে দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

সন্তানের কাছে পিতা-মাতার অপমানের অশ্রুজলই বোধ করি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশী কষ্টদায়ক, সবচেয়ে বেশী বিষাদময়। সেদিন অফিসে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারিনি। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল বাচ্চা দু’টোর বিষাদময় চেহারা আর সাদেক সাহেবের করুন আকুতি। অফিস টেবিলে থরে থরে সাজানো খবরের কাগজ। অনেক কাজ হাতে, কিন্তু কিছুতেই কাজে মন বসাতে পারলাম না। মনের অবস্থা এমন, খবরের কাগজও পড়তে  ইচ্ছে করছে না।

ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও, আনমনে কখন যেন হাতে নিয়েছি এক খানা খবরের কাগজ। চোখ বুলিয়ে যাচ্ছি, পড়ছি শুধু শিরোনাম। এক জায়গায় এসে চোখ আটকে গেল। শিরোনামটি -’করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় শেষ অস্ত্র বেছে নিল মনিকা’। মনিকা আত্মহত্যা করেছে। যশোরের মেয়ে মনিকা। থাকতো ঢাকায়। চাকরি করতো এক মধ্যম মানের কোম্পানীতে । সর্বসাকল্যে সে হাজার পঞ্চাশেক টাকা বেতন পেত। বছর খানেক আগে তার স্বামী মারা গেছে। দুই শিশুপুত্র নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতো সে। করোনা পরিস্থিতিতে সে অর্ধেক বেতন পেল প্রথম এক মাস। দ্বিতীয় মাসে কম্পানি তাকে স্রেফ জানিয়ে দিল তার চাকুরি নেই। হঠাৎ যেন তার মাথায় বাজ পড়লো। সামান্য যে সঞ্চয় ছিল তা থেকে সে প্রথম মাসের বাড়িভাড়া দিয়েছে। দ্বিতীয় মাসের ভাড়া না চুকিয়ে সে দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে পালিয়ে গেল গ্রামে।

পিতৃকুলের এবং শ্বশুর কুলের আপন বলতে কেউ বেঁচে নেই। উঠলো এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়, ফুফুর বাসায়। ফুফু দয়াপরবশ হয়ে থাকার জায়গা দিলেন। হঠাৎ একদিন ফুফু লক্ষ্য করলেন মনিকা রান্না চরায় নি। একদিন-দুইদিন-তিনদিন ফুফু খেতে দিলেন। তারপর মনিকাকে বলে দিলেন, তোমাকে থাকতে না হয় দিলাম, তিনটি পেটকে তো আমি দৈনিক খাওয়তে পারবো না বাপু ! মনিকা এম, এ পাশ। শিক্ষিতা মহিলা। কোথাও হাত পাততে পারলো না। এদিকে বাচ্চা দুটো না খেয়ে খেয়ে মরতে বসেছে। নেই কোন জীবিকা। মনে মনে একবার মনিকা ভেবে নিল আর নয় জীবন। ’এ জীবন, এ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব’।

মনিকা আত্মহত্যা করলো। কবরস্থ করার প্রাক্কালে কে যেন শিশুপুত্রটিকে মায়ের পাশে নিয়ে এলো। কফিনের কাপড় টেনে ধরে শিশুপুত্রটি বারবার ডাকছে, ’মা ক্ষিদে পেয়েছে, ক্ষেতে দাও, আর কতক্ষণ ঘুমাবে?’ শিশুটি তখনো বুঝতে শিখে নি, তখনো জানে না, তার মা আর কোন দিন তাকে খেতে দিবে না। কোনদিন তার মায়ের ঘুম আর ভাঙ্গবে না।

এর কয়েক দিন পরের ঘটনা। বাসায় ফিরছি। গেটে পা দিতে না দিতেই দাড়োয়ান ছুটে এসে বললো, ’স্যার জানেন, পাঁচ তলার সাদেক সাহেব, সেদিন যে কাঁদতে কাঁদতে দেশে চলে গেলেন, তিনি নাকি আত্মহত্যা করেছেন। ঘরে ফিরে বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, সাদেক সাহেব আর মনিকা, দুজনই ছিলেন দুটি মধ্যবিত্ত পরিবারের অবিভাবক। দুটি সংসারই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। সাদেক সাহেব এবং মনিকা দু’জনই ’মরে বেঁচে গেছে’। কিন্তু যে সমস্ত মধ্যবিত্ত পরিবার বেঁচে মরতে বসেছে, বেঁচে ধুকে ধুকে তিলে তিলে মরছে, তাদের পরিত্রাণের উপায়  কি?

আমার এই লেখাটি অর্থনৈতিক উচ্চমানের বিশ্লেষণমুখী কোনো লেখা নয়। উপরোক্ত দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে আবেগ থেকে একটি সাধারন লেখা মাত্র।  যদি একটি সাধারণ প্রশ্ন করা হয়, করোনা পরিস্থিতিতে কোন শ্রেনীর মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ? অনেকেই বলবেন, দরিদ্র ও হতদরিদ্র যারা, তারাই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । কিন্তু আমরা কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছি, করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের কি হাল হয়েছে! কেমন করে কাটছে তাদের দিন ! কি খাচ্ছে তারা! বেতনভুক যারা, বেতন কি পাচ্ছে, বাড়ীভারা কি দিতে পারছে! সঞ্চয় কি তাদের এখনও আছে? যা ছিল তাও শেষ, পরিবার পরিজন নিয়ে কে কোথায় ছিট্কে পড়েছে কে জানে। বাড়িওয়ালা বের করে দিয়েছে, থাকার জায়গা নেই, খাবার কেনার অর্থ নেই।  গরীব-দুঃখী-দরিদ্র, হতদরিদ্র যারা তারা তো রাস্তায় এসে দাঁড়াতে পারে। মহানুভব হৃদয়ের মানুষ পথ চলতে তাদের টাকা-পয়সা দেন, দান-খয়রাত করেন, কখনো কখনো কেউ কেউ অন্ন বিতরণ করেন। যাকাতের অর্থও তাদের জন্যে। এ ছাড়াও করোনা মহামারীতে এগিয়ে  এসেছে অনেক বেসরকারি সংস্থা, রাজনৈতিক দল এবং সরকার। সবারই লক্ষ্য দরিদ্র জনগোষ্ঠী। যারা হাত পেতেছে, তারা সাহায্য পেয়েছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত যারা, তারা দেয়ালে পিঠ ঠেকলেও হাত পাততে পারে না, ধুকে ধুকে মরে। এবারের করোনা পরিস্থিতি কর্মক্ষেত্রের যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তাতে কাজ হারানো মধ্যবিত্ত শ্রেণী নীরবে নিভৃতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, মহা বিপর্যয়ের মুখোমুখি তাদের জীবন। পরিবার পরিজন নিয়ে পাগল প্রায় জীবন কাটাচ্ছে তারা। ধীরে ধীরে হয়ে যাচ্ছে মানসিক রোগী।  

করোনাভাইরাস নিয়ে ভয়াবহ এক হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরিচালক ডেভোরা কেস্টেল।  তাঁর মতে, করোনা পরিস্থিতির কারণে নিদারুণ এক মানসিক সংকট সৃষ্টি হবে। নিঃসঙ্গতা, আতঙ্ক, অর্থনৈতির্ক টালমাটাল অবস্থায় মানুষ মানসিক রোগীতে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন সংস্থা (বিআইডিএস)-এর গবেষণা পরিচালক, অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কোভিড পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে মধ্যবিত্তরা।

খুঁজছিলাম মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা কি? আমি অর্থনীতির ছাত্র ছিলাম বটে, তবে অর্থনীতিবিদ নই। অর্থনীতিবিদ হতেও চাই না। কারণ আমি কখনো দুজন অর্থনীতিবিদকে এক হতে দেখি নি। খুঁজে দেখলাম, মধ্যবিত্তের হাজারও সজ্ঞা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, এক ব্যক্তির ক্রয় ক্ষমতা (পিপিপি) যদি প্রতিদিন ২ মার্কিন ডলার (১৬০ টাকা) থেকে ২০ মার্কিন ডলারের (১৬০০ টাকা) মধ্যে হয়, তাহলে তাকে মধ্যবিত্ত বলা যায়। এই হিসেবে তারা বলছে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত হলো ৩ কোটি ৭ লাখ। অপর পক্ষে, বিশ্বব্যাংক যে সংজ্ঞা দিয়েছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সংজ্ঞার সাথে মিল নেই। বিশ্বব্যাংক বলছে, যাদের প্রতিদিন আয় ১০ মার্কিন ডলার (৮০০ টাকা) থেকে ৫০ মার্কিন ডলার (৪,০০০ টাকা) তারা মধ্যবিত্ত।

বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. বিনায়ক সেন তাঁর এক গবেষণায় যারা দিনে ২ থেকে ৩ ডলার আয় করেন, তাদেরকে তিনি মধ্যবিত্তের মধ্যে ফেলেছেন। বিনায়ক সেনের  ২০১৫ সালের হিসেবে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ পরিবার মধ্যবিত্ত। কিন্তু করোনা ভাইরাস এই হিসেব পাল্টে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী উন্নয়ন পদক্ষেপের ফলে গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিস্তর পরিবর্তন ঘটেছে। বেড়েছে মধ্যবিত্তের বিস্তৃতি। গেল বছর দারিদ্রের হার সারে ২০ শতাংশ এবং চরম দারিদ্রের হার সারে ১০ শতাংশে নেমে এসেছিল।  অনেকে মনে করেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে আবার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে বা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি উপরের দিকের উচ্চবিত্ত ও বিত্তশালী ২০ শতংশ, আর নিচের দিকে দারিদ্র জনগোষ্ঠী ২০ শতাংশ হয়, তাহলে বাকিটা অর্থাৎ ৬০ শতাংশ মধ্যবিত্তের কাতারে পড়ে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশী মানুষ মধ্যবিত্ত।

ব্র্যাকসহ আরও কয়েকটি সংস্থা সম্মিলিতভাবে একটি গবেষণা করেছে। তাতে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের কারণে নতুন করে ৫ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে চলে এসেছে। এরা কারা? এরা সবাই ছিল নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ।ডেভোরা কেস্টেল যা বলেছেন, তাতে সঙ্কা হয়, করোনা পরিস্থিতিতে তা হলে এরা কি ধীরে ধীরে মানসিক রোগীতে পরিনত হতে চলেছে ?

৩০শে জুন ২০২০ তারিখে ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশ বাজেট ২০২০-২১। বাজেটপূর্ব আলোচনা টেবিলে অনেকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, এবছরের বাজেট হতে হবে হেলথ বাজেট, এটি আমাদের বেঁচে থাকার বাজেট। কেউ কেউ বলেছেন, ২০২০-২১ অর্থ বছরের সংকোচন মূলক বাজেট চাইনা, চাই সম্প্রসারণমূলক বাজেট। কিন্তু মধ্যবিত্তের বাঁচার বাজেটের কথা তেমন উচ্চারিত হয় নি।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, করোনা পরিস্থিতিতে গরিবদের কথা চিন্তা করে সরকার নানা কর্মসূচী ঘোষণা করেছে। আগের ১০ টাকা দরে চাল বিক্রির কর্মসূচীর সঙ্গে সরকার এখন তাদের ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছেন, নগদ অর্থও দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা তার হিসেব দিতে গিয়ে বলেছেন, ২রা জুলাই পর্যন্ত ২ লাখ ১১ হাজার ১৭ মেট্রিক টন চাল, ৯৫ কোটি ৮৩ লাখ ৭২ হাজার ২৬৮ নগদ টাকা এবং ২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা শিশুখাদ্য সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর সিংহভাগ ইতিমধ্যে বিতরনও করা হয়েছে যা গরিবদের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মধ্যবিত্তের সমস্যা রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাধানের লক্ষণীয়  উদ্যোগ চোখে পড়ে না। করোনা পরিস্থিতিতে গরিবদের জন্য আছে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা, উচ্চবিত্তের জন্য আছে শিল্পের প্রণোদনা এবং তার সাথে পাচ্ছে কম সূদে ঋণ। কিন্তু মধ্যবিত্তের জন্য কী আছে?

মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সরকারের মনোযোগ থেকে দূরে রাখা হলে সমাজের জন্য এর ফল ভাল হবে না। বরং  উল্টে যেতে পারে অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রের হিসাব-নিকাশ। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জে.এম.কেইন্স যিনি আমেরিকাকে ১৯৩০ দশকের মহামন্দা থেকে রক্ষা করেছিলেন, তিনি অর্থনেতিক উন্নয়নে ’চাহিদা সৃষ্টির’ উপর জোড় দিয়েছেন। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিশাল জনগোষ্ঠী, বিশাল ভোক্তা, বিশাল চাহিদা সৃষ্টিকারী । চাহিদাই উন্নয়নের চাবিকাঠি।  গত দুই দশকে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন ঘটেছে তা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিস্তার এবং এই শ্রেনীর জনগনের চাহিদা বৃদ্ধির কারনে ঘটেছে তা অনস্বীকার্য।  

তবে এবারের বাজেটকে পুরোপুরি মধ্যবিত্ত বিবর্জিত বাজেট বলা যাবে না। বাজেটে বেশ কিছু খাতের উল্লেখ  ও বরাদ্দ আছে যা আংশিকভাবে হলেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা উপকৃত হবে। তবে তা যথেষ্ট কিনা তা বিবেচ্য বিষয়। কেননা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত এক বিশাল মানব গোষ্ঠী। শতকরা ষাট ভাগ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বাজেটে সরকার ‘কৃষিবীমা’ চালুর যে প্রস্তাব করেছে, সেটি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কৃষক উপকৃত হবে।   সাম্প্রতিক বন্যা ও করোনা পরিস্থিতিতে  এটির দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজন এটা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবারের বাজেটে। প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ১০০কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। সরকার শিল্পখাতে দক্ষ জনবল সৃজনের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনগোষ্ঠীর অধিক হারে কর্মে প্রবেশ উপযোগি আইন-বিধি, নীতি-কৌশল সংস্কারের জন্য তিন বছর মেয়াদে কার্যক্রম শুরু করেছেন।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘গত অর্থবছরে ১০টি আইন-বিধি, নীতি-কৌশল প্রণয়ন অথবা সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। আগামী দুই বছরে অবশিষ্ট সংস্কার কাজ সম্পাদন করে ক্রমবর্ধমান জনশক্তির জন্য মান সম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। ২০২০-২১ অর্থ বছরের বাজেটে বলা  হয়েছে, সরকারি যে পেনশন ব্যবস্থা রয়েছে তাতে জনসংখ্যার খুব সামান্য একটি অংশ এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন। দেশের সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের সকল কর্মীদের ক্রমান্বয়ে পেনশন সুবিধার আওতায় আনতে শিগগিরই ইউনিভার্সাল পেনশন অথরিটি গঠন করবে সরকার। ধরে নিতে পারি, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের অনেকে এই সুবিধার আওতায় পড়বে। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কত ভাগ এ সব সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তারা তো বিশাল জনগোষ্ঠী, সমগ্র জনগোষ্ঠীর ষাট ভাগ। বাজেটে আলাদা ভাবে তার প্রতিফলন নেই।

করোনা পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ যারা চাকুরি হারিয়েছে, যাদের ক্ষুদ্র ও কুটীর শিল্প ধ্বংসের মুখে, তাদের ব্যাপারে কোন জরীপ নেই। জরীপ  করে এমন সব পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে এই শ্রেণীর মানুষ আবার  উঠে দাঁড়াতে পারে। ভারতে এই শ্রেণীর মানুষকে কেবল মাত্র স্বল্পসূদেই ঋণ দেওয়া হচ্ছে না, এদেরকে জামিন ছাড়াই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এদের ছেলে-মেয়েদের উপবৃত্তি দেয়া আশু প্রয়োজন, নইলে তারা আর পূর্বের ¯কুলে ফিরে যেতে পারবে না। এই শ্রেণীর মানুষ খেয়ে না খেেেয় ছেলে-মেয়েদের ভাল স্কুলে, ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। ছেলে-মেয়েদের দূঃশ্চিন্তায় এরা যেন পাগলপ্রায় না হয়, আর অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় এই শ্রেণীর মানুষ যেন মানসিক রোগীতে পরিণত না হয়।

এ কাজটি করতে সরকারের অর্থ যোগানেব খুব একটা সমস্যা হবে তা আপাতত: মনে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে ৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৬ হাজার ২২২ কোটি টাকার সমান। এটা একটা বিশাল ঋণ সুবিধা যা বাংলাদেশ অন্য কোন দাতা সংস্থার কাছ থেকে পায় নি। আইএমএফ কখনো কোনো শতর্ ছাড়া কোনো দেশকে ঋণ দেয় না।তবে ৬ হাজার ২২২ কোটি টাকার ঋণে কোনো ধরনের শর্তযুক্ত করেনি আইএমএফ। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য সরকার ৬ হাজার ২২২কোটি টাকার বৃহদাংশ  নির্ধিদ্বায় খরচ করতে পারবে। অপর দিকে এর আগে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলারের সহায়তা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। ওদিকে নয়াদিল্লির সেন্টার অব পলিসি রিচার্সের প্রফেসর ব্রাহ্ম চ্যালানির হিসাব মতে, বাংলাদেশে মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি সরকারি ঋণ হলো জাতীয় প্রবৃদ্ধির শতকরা প্রায় ১৪ ভাগের সমতুল্য। এই ঋণ সহনীয়। কাজেই বলা চলে, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে সরকারকে অসহনীয় ঋণের মধ্যে পড়তে হবে না। কাজেই নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের যতটা না অর্থ যোগানের প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশী প্রয়োজন সদেচ্ছার। স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা মানুষকে বিদগ্ধ করেছে। শিক্ষিত চাকুরি হারা মধ্যবিত্ত এবং ধংসপ্রায় ক্ষুদ্র ও কুটীর শিল্প মালিকদের জন্য বিশেষ বিশেষ প্রকল্প হাতে নিতে হবে দ্রুত এবং সেই সাথে জোর দিতে হবে সৎ ও সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা।

মূল কথা, করোনা পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের প্রথমতঃ একটি জরিপ প্রয়োজন এবং তাদের বাঁচার জন্য সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন। যে পরিকল্পনায় থাকবে মধ্যবিত্তের সমস্যা ভিত্তিক সুস্পষ্ট উপখাত, পৃথক পৃথক বরাদ্দ এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার সঠিক নির্দেশনা। মনে রাখতে হবে, যেহেতু শত বিপদেও মধ্যবিত্ত মানুষ হাত পাতে না, অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় এরা যেন দিশেহারা হয়ে না পড়ে, যেন মানসিক রোগীতে পরিণত না হয়, এরা যেন না করে আত্মহত্যা। তাছাড়া, মধ্যবিত্তরাই উন্নয়নের চাবিকাঠি। এরা তাদের আয়ের পুরোটাই খরচ করে। ফলে চাহিদা সৃষ্টি হয়, উৎপাদন বাড়ে, উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। কাজেই দেশের উন্নয়নের স্বার্থেও মধ্যবিত্তের  জন্য এ মুহূর্তে প্রয়োজন নতুন নতুন পরিকল্পনা ও প্রকল্প এবং তার সৎ ও সঠিক বাস্তবায়ন।

(লেখক- উপাচার্য, সাউথইষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা