kalerkantho

রবিবার । ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩১  মে ২০২০। ৭ শাওয়াল ১৪৪১

কালের কণ্ঠ বিজনেস শোতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা

করোনায় রেমিট্যান্স কমতে পারে বলছেন প্রবাসীরা

বাণিজ্য ডেস্ক   

১৯ মে, ২০২০ ১৫:১১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনায় রেমিট্যান্স কমতে পারে বলছেন প্রবাসীরা

সারা পৃথিবীতে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি প্রবাসে আছেন। তারা বিভিন্ন দেশে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, উদ্যেক্তা। পৃথিবীজুড়ে তারা দক্ষতা, যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। সোমবার রাতে কালের কণ্ঠের নিয়মিত ফেইসবুক লাইভ বিজনেস শোতে অংশ নিয়ে চারজন প্রবাসী বাংলাদেশি জানিয়েছেন লকডাউনের এই সময়ে তারা কিভাবে জীবনযাপন করছেন?

সবাই বলেছেন, প্রবাসে যারা বৈধভাবে বসবাস করছেন তারা সেদেশের সরকারের কাছ থেকে নানা সহযোগিতা পাচ্ছেন। বেকার হয়ে পড়লেও জীবনযাপন নিয়ে তাদেরকে দুচিন্তা করতে হচ্ছে না। উন্নত দেশগুলোতেও বেকারত্বেও হার বাড়ছে। যারা ব্যবসা করছেন তাদের অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে অবৈধভাবে বসবাসরতরা উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন কারণ লকডাউনে বেকার হয়ে পড়লেও তারা সরকারি কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না। আবার তাদের ব্যাপারে দেশে ফিরে আসার চাপও রয়েছে। ফলে প্রবাস থেকে আসা রেমিট্যান্স ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে।

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্ত হন সারিকা দেব। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। এ ছাড়া ছিলেন যুক্তরাজ্য থেকে উদ্যেক্তা, ব্যবসায়ী জাহেদুল ইসলাম। সুইডেন থেকে উদ্যেক্তা ফারজানা ছন্দ। আর কাতার থেকে ফরহাদ আহমেদ। কালের কণ্ঠের সিনিয়র বিজনেস এডিটর ফারুক মেহেদীর সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে কয়েকজন দর্শকের প্রশ্নও অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হয়।

এ পর্যন্ত ২৫৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশি আমেরিকায় মারা গিয়েছেন। তাদের পরিবারের প্রতি শোক জানিয়ে সারিকা দেব বলেন, আমেরিকার বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। সোমবার পর্যন্ত বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬ মিলিয়ন (৩ কোটি ৬০ লাখ) লোক। এর মধ্যে বাংলাদেশিও আছে। অন্যান্য দেশের অর্থনীতির মতো আমেরিকার অর্থনীতিও ঝুঁকির সম্মুখীন। তবে আমেরিকার সরকার বেশকিছু ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন স্টিমুলাস প্রজেক্ট নামে একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। যাদের আয় কম তাদেরকে সেখান থেকে এককালীন অনুদান দিয়েছেন। যারা বেকার তাদেরকে প্রতি সপ্তাহে ৬০০ ডলার করে চেক দেওয়া হচ্ছে। এটা কোন রাজ্যে ৪ আবার কোনো রাজ্যে ৬ মাসের জন্য দেওয়া হচ্ছে। এই দুর্যোগকালীন সময়ে অবশ্যই এই টাকার তাদের জন্য উপকার হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, যারা উদ্যেক্তা তাদেরকে পিপিপিতে (পেচেক প্রটেকশন প্রোগ্রাম) অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যেক্তাদেরও প্রচুর পরিমাণে অনুদান দেওয়া হয়েছে। এখন যারা বৈধভাবে আমেরিকায় আছেন এবং ব্যবসা করেন বা চাকরি করেন তারা তেমন খারাপ অবস্থা নেই। তবে যারা অবৈধভাবে আমেরিকার বড় শহরগুলোতে আছেন তারা কোনো অনুদান পাচ্ছেন না। কেননা তারা আমেরিকার শ্রমশক্তির অন্তর্ভূক্ত নয়। তবে তারা দাতব্য সংস্থ্যার মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন বা কিছুটা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন।

সামগ্রিক অর্থে বলতে গেলে দক্ষ কর্মীরা এখন পর্যন্ত বেতন পাচ্ছেন আবার অনুদানও পাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত খাদ্য ঘাটতি নিয়ে তারা কোনো অসুবিধার মধ্যে নেই। তবে লকডাউন উঠে গেলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যারা অতিরিক্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আবার তারা হয়তো নতুন করে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন না। তারা টিকে থাকতে পারবেন না। যারা চাকরি করছেন তাদের অনেকে অসুবিধায় পড়বেন। যেমন- জেসিপেনির মতো বড় প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেছে। অনেক বাংলাদেশি সেখানে কাজ করে। তাদের সবারই চাকরি চলে যাবে। অবশ্যই লকডাউনের বড় প্রভাব আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপর পড়বে।

ইমিগ্রান্টদের নিয়ে আমেরিকার পলিসি নিয়ে তিনি বলেন, কিছু ইমিগ্রান্ট আছেন যারা এখনও গ্রিনকার্ড পাননি। বিভিন্ন ধরণের ইমিগ্রেশন ভিসায় আছেন। তারা আসলে খুবই দু:চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ট্রাম্পের পলিসি কী হবে তারা বুঝতে পারছেন না। যদি হঠাৎ করে বলে যে দেশে গ্রিনকার্ডধারীরাই শুধু থাকতে পারবে বা আমেরিকান সিটিজেনই শুধু থাকতে পারবেন। এ অবস্থায় যারা এখনো গ্রিনকার্ড পান নাই, তারা অবশ্যই ভয়ের মধ্যে আছেন। যদিও তারা বেশ দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে আছেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন এধরণেরও আছেন অনেকে। কিন্তু তারা খুবই ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আমি শুনেছি জুনের মাঝামাঝি থেকে ট্রাভেল ব্যান তুলে নেওয়া হবে।

যুক্তরাজ্য থেকে জাহিদুল ইসলাম বলেন, যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের বড় অংশ রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য করেন। করোনা লকডাউনের কারণে এই ব্যবসাগুলো আক্রান্ত হয়েছে। অন্যভাবে হেলপও হচ্ছে। এখানে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা দুই ধরণের। একটা হচ্ছে ক্রেতারা দোকানে এসে খাচ্ছেন। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলো জুলাইয়ের আগে আর খুলবে না। ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যবসা এখান থেকে হয়।
আরেকটা হচ্ছে হোম ডেলিভারি সার্ভিস যা আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। যার কারণে অনেক রেস্টুরেন্ট আগের চেয়ে ভালো ব্যবসা করছে। কারণ বেশিরভাগ মানুষ লকডাউনের কারণে বাসায় অবস্থান করছেন। শুধু ডেলিভারি সার্ভিস চালু থাকার কারণে অন্য খাতগুলোর তুলনায় রেস্টুরেন্ট ব্যবসা ভালো আছে। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে সহজ কিস্তিতে এককালীন ঋণ দেওয়া হয়েছে। তবে বৈধ কর্মীরা সেই অর্থে কষ্ট করছেন না।

তিনি আরো বলেন, যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশ এখনও কাগজপত্রের ব্যাপারে স্ট্রাগল করছেন। বৈধদের এ মুহূর্তে কোনো সমস্যা নাই। চাকরি আছে অথবা সরকার থেকে সহায়তা পাচ্ছে। কিন্তু দুভার্গজনকভাবে যারা আনডকুমেন্টেট ওয়ার্কার বা অবৈধ শ্রমিকরা সরকার থেকে কোনো ধরণের সহায়তা পাচ্ছেন না। যারা রেস্টুরেন্টে কাজ করেন তাদের কাজ এখনো আছে। মালিকরা শ্রমিকদের সহায়তা করছে, কমিউনিটি এগিয়ে আসছে এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সমস্যা হচ্ছে না। এভাবে দীর্ঘদিন চললে কতদিন টিকে থাকা যাবে, সেটা বলা মুশকিল। সরকার যে সহযোগিতা করছে এটা খেয়ে পড়ে বাঁচার জন্যই করছে। এই ব্যয়ে তো আর মানুষ অভ্যস্থ নয়। ফলে অনেকে সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাপন ব্যয় করছেন। তারই একটা অংশ হয়তো দেশে পাঠাচ্ছেন। তবে পুরো বছর এভাবে যেতে থাকলে অবৈধ কর্মীরা আরো বেশি দুর্ভোগে পড়বেন। এসব কারণে রেমিটেন্সে বড় ধরণের প্রভাব পড়বে সামনের দিনগুলোতে।

যুক্তরাজ্যের চলমান অর্থনৈতিক অবস্থা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এখানে ২১ হাজারের মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লকডাউনের প্রথম তিন মাসেই বন্ধ হয়ে গেছে। ৬৪৩১টি প্রতিষ্ঠান লন্ডনেই বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ৫০ শতাংশে বেশি প্রতিষ্ঠান বলছে এভাবে চলতে থাকলে বছরের কোনো এক সময়ে তাদের কর্মীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাই করতে হবে।

কাতার থেকে ফরহাদ আহমেদ বলেন, কাতারে ক্ষুদ্র ব্যবসার বেশিরভাগই বাংলাদেশিদের হাতে আছে। এ মার্কেটগুলো দুই মাস যাবত বন্ধ আছে। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অসুবিধার মধ্যে আছে। অনেকলোক বলতে গেলে না খেয়ে আছে। অনেক কষ্টে আছে। বাংলাদেশি দূতাবাস প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ লোককে ত্রাণ দেয়। কাতার সরকার বড় বড় কম্পানিকে বলে দিয়েছে কর্মীদের ছাঁটাই না করতে এবং বেতনটা নিয়মিত রাখতে।

তিনি আরো বলেন, কাতারের প্রধান আয় হল জ্বালানি তেল। এখানে জ্বালানি তেলের দাম ইতিমধ্যে কমে গেছে। এর ফলে অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশিদের যারা ফ্রি ভিসায় আছেন। তারাই মূলত বিপদে আছেন। কারণ তাদের কাজ একেবারে বন্ধ। আর যারা ব্যবসায়িরা আছেন তারাও অসুবিধায় আছেন। অনেক কম্পানি বলছে দেশে চলে যেতে। কিন্তু দেশে  যাওয়ার ফ্লাইট বন্ধ।

সুইডেন থেকে ফারজানা ছন্দ বলেন, সুইডেন একমাত্র দেশ যারা এখন পর্যন্ত লকডাউনে যায়নি। সারাবিশ্ব যেখানে এক নীতিতে চলছে সেখানে সুইডেন চলছে ভিন্ন নীতিতে। সুইডেন বরাবরই সব ইস্যুতে নিরপেক্ষ থাকে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় যখন সারা ইউরোপ  যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লো তখন সুইডেন যুদ্ধে না জড়িয়ে নিরপেক্ষ ছিল। যদিও সুইডেন সবসময় অস্ত্র এবং যুদ্ধ জাহাজে শীর্ষ বিক্রেতা দেশগুলোর অন্যতম।        

অনুলিখন : শরিফ রনি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা