kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

সুরক্ষা পণ্যের উচ্চ চাহিদা, সরবরাহে টান

বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ, লকডাউনে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত ♦ সাবান ও এজাতীয় পণ্যের বাজারের আকার দুই হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। বছরে শুধু সাবান বিক্রি হয় আড়াই হাজার কোটি টাকার ♦ হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি হতো দুই কোটি টাকার, যা তিন গুণ বেড়েছে ♦ হ্যান্ডওয়াশ বিক্রি হয় ১৬৯ কোটি টাকার

মাসুদ রুমী    

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০৯:৫৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুরক্ষা পণ্যের উচ্চ চাহিদা, সরবরাহে টান

ছবি : শেখ হাসান

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সুরক্ষা পণ্যের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাস মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার হাত ধোয়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এতে গ্রাম-শহর সর্বত্রই সাবান, হ্যান্ডওয়াশ, হ্যান্ড রাব, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে টান পড়েছে। অঘোষিত লকডাউনের মধ্যে চাহিদা এত বিপুল যে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করেও সবাইকে পণ্য সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। গত জুন মাসের বাজার জরিপ অনুযায়ী, দেশে সাবান ও এজাতীয় পণ্যের বাজারের আকার ৭৭ হাজার ৩৮২ টন, যার বাজার মূল্য দুই হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। এ সময় বার্ষিক বিক্রির প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ শতাংশের মতো। তবে করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর বিক্রি বহুগুণ বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। চলতি বছর শেষে এই বাজার তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশের অন্যতম জীবাণুনাশক ও সাবানজাতীয় পণ্য বিপণনকারী এসিআই কনজ্যুমার ব্র্যান্ডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে ১৭ কোটি মানুষেরই সুরক্ষা পণ্য ব্যবহার করা দরকার। কিন্তু সবার ক্রয়ক্ষমতা নেই। মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ ভোক্তা, যা এখন হয়তো ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হবে। আমাদের হেক্সিসল, স্যাভলন, হ্যান্ড রাব, হ্যান্ড স্যানিটাইজার অনেক আগে থেকেই আছে। যাদের ক্রয়ক্ষমতা আছে, তারা অনেক আগে থেকেই স্যানিটাইজেশন পণ্য ব্যবহার করছিল। এখন আরো অনেকেই ব্যবহার করছে।’

তিনি বলেন, ‘চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে, কিন্তু সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এখন কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে। আমাদের সুরক্ষা পণ্যের কাঁচামাল ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। জনবল সংকটে প্যাকিং ম্যাটেরিয়াল নিয়েও আমরা সংকটে পড়েছি। স্প্রে, পাম্প, ক্যান কারখানা মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর থেকে আসে। সেখানেও লকডাউন চলছে। তার পরও আমরা আগের কাঁচামাল দিয়ে কারখানার সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা কাজে লাগিয়ে মানুষকে সাধ্যমতো সুরক্ষা পণ্য তুলে দিচ্ছি। কারণ এখন ব্যবসার চেয়েও মানুষের সুরক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল কম্পানি হিসেবে এসিআই সেটাই করছে।’

সুরক্ষা পণ্যের বাজারে শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশনস শামীমা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ পণ্যই যেহেতু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়, আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি এই পণ্যসামগ্রীর উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করার। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাদের কর্মী ও তাদের পরিবারের সুরক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনাবলি মেনেই আমরা কারখানা চালু রেখেছি। আমরা আমাদের কারখানার প্রত্যেক কর্মীর সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পরিবহন থেকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম—সব কিছুই নিশ্চিত করছি। আমরা বাংলাদেশের মানুষকে তাদের নির্ভরশীল পণ্য পৌঁছে দিতে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি এবং আমাদের পণ্যের ঘাটতির সম্ভাবনা নেই।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সবখানে যাতে পণ্য পাওয়া যায় আমরা সেটা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি এবং সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পেয়ে আসছি। আমরা ১২ লাখ লাইফবয় হ্যান্ডওয়াশ বিনা মূল্যে দিয়েছি। মানুষকে সচেতন করতে জানুয়ারি থেকে কাজ করে যাচ্ছি।’

রেকিট বেনকিজার (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মার্কেটিং ডিরেক্টর নুসরাত জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস আতঙ্কে আমরা সশরীরে অফিস করছি না। একটি বহুজাতিক দায়িত্বশীল কম্পানি হিসেবে রেকিট বেনকিজার তার কর্মীদের নিরাপত্তার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যারা আমাদের মার্কেটে কাজ করছে তাদেরও নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া আছে এবং তারাও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিয়ম মেনেই কাজ করছে।’

জীবাণুনাশক ও সাবানের বাজারে আরেক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্কয়ার টয়লেট্রিজের বিপণন বিভাগের প্রধান জেসমিন জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার প্রথম দিকে সুরক্ষা পণ্য সরবরাহে কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছিল। তবে এখন সমস্যা ততটা নেই। হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াশের চাহিদা তিন থেকে চার গুণ বেড়েছে। আর সাবানের বাজারের আকার দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যেখানে বিক্রি বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। গত বছর আমরা সবাই মিলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি করেছিলাম দুই কোটি টাকার মতো, যা এখন এক মাসেই তার দ্বিগুণ বিক্রি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, এখন কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করছে, যা ভোক্তাদের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে ভোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডের ওপর আস্থা রাখার অনুরোধ করেন তিনি।

বাজারে বাড়তি চাহিদার মধ্যে ওষুধ উৎপাদনকারী শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসকেএফ বাজারে এনেছে হ্যান্ডি স্যানিটাইজার নামের হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আগে থেকেই তাদের একই ব্র্যান্ডের হ্যান্ড রাব ছিল। তারা বলছে, বাজারে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে চাহিদা বেড়েছে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হেক্সিসল, হ্যান্ড রাব, জ্বর মাপার থার্মোমিটার, হ্যান্ডওয়াশ, টিস্যু পেপারেরও। হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হেক্সিসল, হ্যান্ড রাবসহ বিভিন্ন সুরক্ষা জাতীয় তরল পদার্থের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রকারের মাস্ক বাজারে থাকলেও সার্জিক্যাল মাস্কের সংকট চরমে। এদিকে দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছেন এসব পণ্য।

চাহিদা এত বিপুল যে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করেও সবাইকে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সাধারণ মাস্ক বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশে করানো শনাক্তের আগে যেসব দোকানে দিনে পাঁচ-সাতটি মাস্কও বিক্রি হতো না, এখন সেসব দোকানে কয়েক শতাধিক মাস্ক বিক্রি হয়। একটা সময় দোকানসহ রাজধানীর ফুটপাতেও এর সংকট দেখা দেয়। তবে সেই সুযোগে বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। এর পরও ক্রেতাদের চাহিদামতো সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করতে পারছে না দোকানিরা।

মোহাম্মদপুরের লাজ ফার্মায় সাধারণ মাস্ক বিক্রি করা হচ্ছে ৯০ টাকায়। জানতে চাইলে বিক্রয় প্রতিনিধি আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সার্জিক্যাল মাস্কসহ হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হেক্সিসল, হ্যান্ড রাবসহ সুরক্ষা পণ্যের সরবরাহে টান পড়েছে। এ কারণে দাম বেড়ে গেছে। আমরা গায়ের দামেই বিক্রি করছি। তবে কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রি করছে শুনেছি। এ ছাড়া এখন চাহিদা বেশি, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

সাধারণ ছুটিতে পুরো দেশ প্রায় অচল থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ই-কমার্স সাইটগুলোতে জমে উঠেছে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্টের (পিপিই) ব্যবসা। বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে এসব পণ্য। এসবের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও প্রয়োজন ও বাস্তবতার কারণে অনেকেই অনলাইন কেনাকাটায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

গুলশান-২ নম্বর মোড়ের একটি ফার্মেসিতে কথা হলো বেসরকারি চাকুরে শফিক আদনানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে এসে না পেয়ে ফিরে গেছি। আজ বিভিন্ন দোকান ঘুরে অবশেষে একটা নিয়েছি। দাম অনেক বেশি। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে সবাই এখন এসব পণ্য কিনছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা