kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

বিশেষ তহবিল গঠনে পুঁজিবাজারে বড় উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১২:৪৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশেষ তহবিল গঠনে পুঁজিবাজারে বড় উত্থান

প্রতীকী ছবি

তারল্য সংকট কাটাতে পুঁজিবাজারের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিটি ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা করে বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারবে। এই তহবিলের অর্থ নিজে বিনিয়োগের পাশাপাশি সহযোগী বা সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে পারবে।

গতকাল সোমবার বিশেষ তহবিল গঠনের অনুমোদনের পর মঙ্গলবার পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হলে ব্যাপক উত্থান ঘটে। শেয়ার কেনার চাপে মূল্যসূচকে ব্যাপক উত্থান হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক বেলা ১২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত ৮৭ পয়েন্ট উত্থান ঘটে। লেনদেনের পরিমাণও আড়াই কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।

শেয়ারবাজারে স্টেকহোল্ডারদের একটি অংশের দাবির প্রেক্ষিতে সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ তহবিল গঠনে সুযোগ দেয়। এর আওতায় প্রতিটি ব্যাংক বিদ্যমান আইনি সীমার বাইরে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। অর্থাৎ প্রতিটি ব্যাংক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারবে। এ তহবিলের মেয়াদ হবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

সব মিলে তহবিলের আকার দাঁড়াবে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। এটি হবে ঘূর্ণায়মান বা আবর্তনশীল তহবিল। ব্যাংকগুলো নিজস্ব উৎস থেকে তহবিল জোগানের মাধ্যমে অথবা নিজেদের ধারণকৃত ট্রেজারি বিল ও বন্ড বাংলাদেশ ব্যাংকে বন্ধক রেখে সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে এই টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ শতাংশ সুদে এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে ব্যাংকগুলো, যা পরিশোধের সময় পাবে পাঁচ বছর। তবে ব্যাংকগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারবে। এ তহবিলের বিনিয়োগকে পাঁচ বছরের জন্য ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এসংক্রান্ত আলাদা দুটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারের অস্বাভাবিক উত্থান-পতন ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। দেশের পুঁজিবাজারে বিরাজমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পর্যালোচনায় পরিস্থিতি উন্নয়নে অন্যান্য ব্যবস্থাদি গ্রহণের পাশাপাশি বাজার মধ্যস্থতাকারীদের তারল্য সহায়তাদানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। সার্বিক বিষয় বিবেচনান্তে পুঁজিবাজারে ক্রমাগত তারল্য প্রবাহ বজায় রাখার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে তফসিলি ব্যাংক তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান (মার্চেন্ট ব্যাংক ও ডিলার লাইসেন্সধারী ব্রোকারেজ হাউস) এবং অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসকে (ডিলার) শুধু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য এই তহবিল গঠন করা হলো। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৭টি ব্যাংক এ তহবিল গঠন করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে। এই হিসাবে ৫৭টি ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ হবে ১১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি থেকে পুঁজিবাজারে ক্রমাগত পতন ঘটে। শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় তারল্য সংকট দেখা দেয়। এ সময় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবনা ছিল একটি বিশেষ তহবিল গঠনের। তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনে সরকারের বিভিন্ন মহলে প্রস্তাব করা হয়েছিল। সে প্রস্তাবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশ্বাস ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক মনোভাবের পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে এই বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এ তহবিল পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও গতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখবে।

সার্কুলারে বলা হয়, প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারবে। একাধিক প্রক্রিয়ায় সেই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া যাবে। রেপোর সুদের হার ৫ শতাংশ নির্ধারিত থাকবে এবং কোনো প্রকার অকশনের প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে ট্রেজারি বন্ড বা বিল রেপোর মাধ্যমে এই তারল্য সুবিধা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চাহিদা অনুসারে সর্বোচ্চ ৯০ দিন মেয়াদি রেপো প্রদান করা হবে। এ সুবিধা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

তহবিল ব্যবহারের বিষয়ে সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলো নিজস্ব বিবেচনা এবং সুবিধা অনুসারে তহবিল ব্যবহার করতে পারবে। তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পুঁজিবাজারের সার্বিক স্বার্থে বিশেষ তহবিলের ন্যূনতম ১০ শতাংশ অর্থ মেয়াদি বা বেমেয়াদি বা উভয় প্রকার মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে মোট তহবিলের ১০ শতাংশ বন্ডে বিনিয়োগ করতে হবে। তহবিল বিভাজন নিয়ে সার্কুলারে বলা হয়, ব্যাংকের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও বিশেষ তহবিলের ৪০ শতাংশ। এ জন্য ব্যাংকের নতুন বিও হিসাব খুলতে হবে। ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কম্পানিকে ২০ শতাংশ ঋণ, অন্য ব্যাংকের বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউসকে ৩০ শতাংশ এবং অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউসের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও গঠনের জন্য ১০ শতাংশ ঋণ দিতে পারবে।

ব্যাংকগুলোর গঠন করা এই তহবিল থেকে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে। এই ঋণের মেয়াদ হবে ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ ঋণ পেতে পৃথক ব্যাংক হিসাব ও বিও থাকতে হবে। একই সুদে ঋণ মার্চেন্ট ব্যাংক, ডিলার ও ব্রোকারেজ হাউসও। ঋণের মেয়াদও হবে একই। তবে এ জন্য মার্চেন্ট ব্যাংক, ডিলার ও ব্রোকারেজ হাউসকে পরিচালনা পর্ষদের করপোরেট গ্যারান্টি গ্রহণ করতে হবে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিও হিসাবের সিকিউরিটিজ বাজেয়াপ্ত করবে ঋণদাতা ব্যাংক।

বিশেষ তহবিলের বিনিয়োগ নীতিমালা : সার্কুলারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয়, তালিকাভুক্ত ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যাবে। ব্যাংক ও ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি নীতিমালার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, তারা নিজস্ব ব্যাংকের শেয়ার কিনতে পারবে না। অন্য কোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইস্যুকৃত শেয়ারের ২ শতাংশের বেশি ক্রয় করা যাবে না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো কম্পানির শেয়ার ১০ শতাংশের বেশি কেনা যাবে না। ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি নয় এমন মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউস কর্তৃক কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২ শতাংশের বেশি শেয়ার কেনা যাবে না। মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে মোট ইউনিটের ১০ শতাংশ ও বে-মেয়াদির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশের বেশি কেনা যাবে না।

ইক্যুইটি শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, যেসব কম্পানি পর পর তিন বছর ১০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করেছে ও যেসব কম্পানির অনূর্ধ্ব ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফ্রি-ফ্লট শেয়ার রয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে তিন বছর ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে, নিট অ্যাসেট ভ্যালু অভিহিত মূল্যের বেশি ও বিগত তিন বছর ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে, বন্ড ও ডিভেঞ্চারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম কুপন বা সুদবাহী তালিকাভুক্ত করপোরেট বন্ড ও ডিভেঞ্চার এবং যেকোনো মেয়াদের কুপনবাহী সরকারি বন্ড ও বিলে বিনিয়োগ করা যাবে।

বিশ্লেষণ
পুঁজিবাজার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন
ছায়েদুর রহমান
সভাপতি, বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিএমবিএ

পুঁজিবাজার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা প্রয়োজন ছিল। সেই লক্ষ্যে বাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলে কিছু সুপারিশ ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেছিলাম। বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজার উন্নয়নে একটি তহবিল গঠন করেছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। পুঁজিবাজারের জন্য খুবই সহায়ক হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজার উন্নয়নে এই তহবিলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে। পাশাপাশি এই তহবিলকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার বাইরেও রাখা হয়েছে। এই তহবিল গঠনে ব্যাংকের কোনো প্রভিশন রাখতে হবে না। ব্যাংক এ অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। যাতে দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজার উন্নয়নের জন্য সহায়ক হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারের গতিশীল করার পক্ষে সহায়ক। পুঁজিবাজারের অগ্রযাত্রায় এই সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রাখবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা