kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

বিভিন্ন সূচকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন বছর শুরু

♦ রাজস্ব, রপ্তানি ও পুঁজিবাজারে অস্বস্তি ♦ রেমিট্যান্সে স্বস্তি

সজীব হোম রায়    

১ জানুয়ারি, ২০২০ ০৮:৩৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিভিন্ন সূচকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন বছর শুরু

শুরু হলো নতুন বছর। তবে নতুন বছরের শুরুটা মোটেও স্বস্তির হলো না অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের জন্য। কারণ, ২০১৯ সালের পুরো বছরই নেতিবাচক ছিল অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক। অস্বস্তি ছিল রাজস্ব আহরণ, রপ্তানি, পুঁজিবাজার, ব্যাংকিং খাতে। উচ্চ ঋণের সুদহারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগেও ছিল স্থবিরতা। এত এত নেতিবাচকের মধ্যে বছরজুড়ে উজ্জ্বল ছিল শুধু প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রতি মাসেই আগের চেয়ে বেড়েছে রেমিট্যান্স। বলা চলে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এত নেতিবাচক সূচক নিয়ে সামনের বছর খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে। আর তা উত্তরণে সরকারকে নিতে হবে দ্রুত পদক্ষেপ।

পুরো বছরের অর্থনীতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বছরজুড়েই অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচক ছিল নেতিবাচক। রপ্তানি খুবই নেতিবাচক। ব্যাংকিং খাতের অবস্থা উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণ বাড়ছেই। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। তার মানে বেসরকারি বিনিয়োগে উন্নতি নেই। বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি নেতিবাচক। রাজস্ব আদায় হতাশাজনক। সর্বোপরি সামনের বছর খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে।

উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, সামনের বছরে এসব চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিকীকরণ থেকে মুক্ত করতে হবে। ঋণ দেওয়া ও নেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে হবে। বিচারিক ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে, পণ্য বহুমুখীকরণ করতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক ডিজি তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, পুরো বছর সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে যেসব উপাদান কাজ করে সেগুলো নিয়ে একটু চিন্তা আছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। কিন্তু এটা উত্তরণে কোনো পদক্ষেপ দেখা গেল না। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে চাইলে ব্যাংকিং খাতকে ভালো করতে হবে। রাজস্ব আয়ে হতাশা আছে। কিন্তু তার চেয়ে বড় ব্যাপার হলো, অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা। রাজস্ব আয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রপ্তানি এখন একটু খারাপ। তবে এটা ঠিক হয়ে যাবে। আমদানিও নেতিবাচক। এ উপাদানগুলোর সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ঠিক মেলে না। এগুলো ঠিক করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘সামনের বছর আমাদের চ্যালেঞ্জিং হবে। এ জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এনবিআরকে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা দিতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে খেলাধুলা বন্ধ করতে হবে। ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।’

রেমিট্যান্স : ২০১৯ সালে যে খাতটি অর্থনীতিকে দু-হাত ভরে দিয়েছে তা হলো ‘রেমিট্যান্স’। বছরজুড়েই নেতিবাচক সূচকের খবরের মধ্যে উজ্জ্বল প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স খাত’। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-অক্টোবর) রেমিট্যান্স এসেছে ৭৭১ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। নভেম্বর মাসে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১৫৬ কোটি ডলার। মূলত রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ প্রণোদনাই এর নেপথ্য নায়ক।

আয় নিয়ে দুশ্চিন্তা : প্রতি অর্থবছর সরকার যে বাজেট ঘোষণা করে, সেটি হলো মোট ব্যয়। এই ব্যয়ের বিপরীতে আয়ের বড় দুটি খাত হলো রাজস্ব আয় এবং অন্যটি রপ্তানি। কিন্তু রাজস্বে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছে বছর। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

আয়ের আরেকটি বড় উৎস রপ্তানি খাত। অথচ এটিই এখন নেতিবাচক। ২০০১-০২ অর্থবছরের পর আর কখনো রপ্তানিতে নেতিবাচক বছর পার করেনি দেশ। ২০১৯ সালে আবার তা দেখতে হলো। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১৬১ কোটি ইউএস ডলার। এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় এক হাজার ৪৩৩ কোটি ডলার। আর আয় হয়েছে এক হাজার ২৭২ কোটি ডলার। এটি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ কম। দেশের রপ্তানি খাতে নেতৃত্ব দেয় তৈরি পোশাক খাত। ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে শুরু করা অর্থবছর নভেম্বরে এসে আয় কমেছে ৮ শতাংশ। দেশে আমদানিতেও ভাটা পড়েছে। আর এতে কাস্টমস রাজস্ব আয় কমেছে ২.২৯ শতাংশ। জুলাই-আগস্টে এলসি খোলার পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৯.৯০ শতাংশ।

আয়ে ঘাটতি থাকায় বড় ধরনের চাপে পড়েছে সরকার। ফলে চলতি অর্থবছরের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়ে ফেলেছে সরকার। চলতি অর্থবছর ব্যাংক থেকে ধারের লক্ষ্যমাত্রা ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। অথচ ছয় মাসেই সরকারের ঋণ ৪৭ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। ফলে বলা যায়, সংশোধিত বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁটে বাধ্য হবে সরকার।

বিনিয়োগে স্থবিরতা : গত কয়েক অর্থবছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩.৪ শতাংশ। তবে বিদেশি বিনিয়োগে স্বস্তি মিলেছে। চলতি অর্থবছরে জুলাই-আগস্টে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭৫ কোটি ডলারের। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।

খেলাপি ঋণ আর নয়ছয়ে আটকা ব্যাংক খাত : দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, খেলাপি ঋণ বাড়বে না এক টাকাও। উল্টো জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে অর্থমন্ত্রী সিঙ্গেল ডিজিটের সুদের ঘোষণা দেন। সেটি বাস্তবায়িত তো হয়ইনি বরং তা আরো পিছিয়ে গেছে। এমনকি খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ঋণখেলাপিদের পুরস্কৃত করেও ফল আসেনি।

স্থিতিশীল হয়নি পুঁজিবাজার : চলতি অর্থবছরের বাজেটে সবচেয়ে বেশি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে পুঁজিবাজারে। অথচ বছরজুড়ে অস্থিতিশীল পুঁজিবাজারে ক্রমান্বয়ে কমেছে শেয়ারের দাম। এতে বাজার মূলধন কমেছে ৪৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা