kalerkantho

মঙ্গলবার। ২০ আগস্ট ২০১৯। ৫ ভাদ্র ১৪২৬। ১৮ জিলহজ ১৪৪০

স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ায় ঋণ পুনঃ তফসিলের হিড়িক

সজীব হোম রায়   

২৯ জুলাই, ২০১৯ ০৮:৩২ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ায় ঋণ পুনঃ তফসিলের হিড়িক

ঋণ পুনঃ তফসিলের জন্য যোগ্যদের নির্বাচন করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের। ব্যাংকিং সেক্টরের অভিভাবক হিসেবে তদারকি করার কথাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কিন্তু পুরো বিষয়টি দেখভাল এবং তদারকি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবর্তে কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। নেতৃত্বও দেবে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একজন প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা খর্ব নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে আদালতে স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ায় খেলাপিদের ঋণ পুনঃ তফসিলের সুবিধা নিতে আবেদনের হিড়িক পড়েছে। সরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপিরা আগেভাগেই এ সুবিধা নেওয়ার জন্য আবেদনের পাশাপাশি দৌড়-ঝাঁপও শুরু করেছে। তবে এ বিষয়ে ছোট খেলাপিরা বেশি এগিয়ে। বড়রা এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

এ ব্যাপারে কমিটির প্রধান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. শুকুর আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঋণ পুনঃ তফসিলের পুরো বিষয়টি কমিটি তদারক করছে। এখন পর্যন্ত আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি।’ এ উদ্যোগ সফল হলে খেলাপি ঋণ কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র এবং নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতেই আমরা সার্কুলার দিয়েছি। আমরা আশাবাদী যে খেলাপি ঋণ কমবে। দীর্ঘদিন এসব ঋণ আদায় বন্ধ ছিল। এ উদ্যোগের ফলে আটকে থাকা এসব টাকা উদ্ধার হবে। ঋণখেলাপিদের জন্য এটা একটা সুযোগ। তারা খেলাপির তালিকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। তাই এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’

ঋণ পুনঃ তফসিলের ব্যাপারটি যাচাইয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তাই কমিটি গঠনের ফলে ক্ষমতা খর্বের প্রশ্ন নেই। এই উদ্যোগ সফল করতে যা যা প্রয়োজন সব করা হচ্ছে। কমিটি এরই অংশ। তাই ক্ষমতা খর্ব হওয়ারও সুযোগ নেই।

সূত্রে জানা গেছে, ঋণখেলাপিদের গণসুবিধা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করলেও আদালত তা আটকে দেন। পরে শর্ত সাপেক্ষে আদালত স্থগিতাদেশ তুলে দেন। ফলে খেলাপিদের ঋণ পুনঃ তফসিলের উৎসব শুরু হতে আর কোনো বাধা থাকে না। এতে দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এ সুবিধা নিতে আবেদনের হিড়িক পড়েছে। ব্যাংকাররা বলছেন, সবার আগে এ সুবিধা পেতে খেলাপিরা তদবিরও করছে। কারণ, তাদের মনে ভয়, আবার যদি আদালত এতে বাগড়া দেয়! তবে এ ক্ষেত্রে বড় খেলাপিরা সাবধানে পা ফেলছে। এখন পর্যন্ত বড়রা এ বিষয়ে আগ্রহী হলেও তেমন সাড়া দিচ্ছে না। আদালতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তারা পদক্ষেপ নিতে চায়।

এ ব্যাপারে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস উল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ পুনঃ তফসিলে ভালো সাড়া পাচ্ছি। বেশি সাড়া দিচ্ছেন ছোট গ্রাহকরা। বড় গ্রাহকদের মামলার ভয় আছে। তারা মনে করছেন, আবার মামলার ঝামেলা হলে যে টাকা ব্যাংককে ফেরত দেব তাও নষ্ট হবে।’ এ সময় তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা যাতে কোনোভাবেই এ সুযোগ নিতে না পারে সে জন্য সজাগ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রমতে, জনতা ব্যাংকের ৩৩ ঋণখেলাপি ৫২ কোটি টাকা দিয়ে পুনঃ তফসিল সুবিধার আবেদন করেছে। এদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া আরো ৪০০ ঋণখেলাপি রয়েছে, তারাও এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের এ পর্যন্ত ৮০ জন এ সুবিধা নিয়েছে। গত সোমবার এক দিনেই ৪২ জন গ্রাহক ঋণ পুনঃ তফসিলের সুবিধা নিয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত অর্থের পরিমাণ চার কোটি টাকা।

আলোচিত বেসিক ব্যাংকের ৩৫ গ্রাহক ঋণ পুনঃ তফসিল সুবিধার জন্য আবেদন করেছে। এই গ্রাহকরা চার কোটি তিন লাখ টাকা দিয়েছে। এ ছাড়া দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকেও বড় গ্রাহকদের তুলনায় ছোটরা ভালো সাড়া দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে আদালতের স্থগিতাদেশ উঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ কাজে লাগাতে অর্থ মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে ৯ সদস্যের তদারকি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. শুকুর আলীকে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব (অভ্যন্তরীণ ও বহির্নিরীক্ষা শাখা) মৃত্যুঞ্জয় সাহা সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব কামরুন নাহার সিদ্দীকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির, সোনালী ব্যাংকের ডিএমডি মো. এবনুজ জাহান, জনতা ব্যাংকের ডিএমডি মো. ইসমাইল হোসেন, অগ্রণী ব্যাংকের ডিএমডি মো. ইউসুফ আলী, রূপালী ব্যাংকের ডিএমডি বেলায়েত হোসেন এবং বেসিক ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাসুদ-উর রহমান।

কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ১৬ মে জারীকৃত বিআরপিডির সার্কুলার নং-৫ এর আওতায় ঋণ পুনঃ তফসিল এবং এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত কার্যক্রমের হালনাগাদ অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি কমিটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। তবে এ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কে, তা এতে উল্লেখ করা হয়নি।

নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ পুনঃ তফসিলের জন্য ঋণখেলাপিরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে আবেদন করে। ঋণের অবস্থা, পরিশোধের ধরনসহ নানা বিষয় যাচাই-বাছাই করে এটি পুনঃ তফসিলের যোগ্য কি না, তা সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক পর্ষদ। পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপির সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ কমিটি গঠনের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, বরং এ কমিটিই ঋণখেলাপিদের ঋণ পুনঃ তফসিলের আবেদন অনুমোদনের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। কমিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো তা যাচাই-বাছাই করবে। চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় তা বাংলাদেশ ব্যাংককে পাঠানো হবে।

পুরো বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা ক্ষুব্ধ। তাঁরা বলছেন, এতে কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচকের চেয়ে বরং নেতিবাচক প্রভাবই বেশি ফেলবে। দেশে খেলাপির সংস্কৃতি আরো বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা খর্ব করা নিয়েও উদ্বিগ্ন দেশের অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলছেন, ব্যাংকিং সেক্টরের অভিভাবক বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী ঋণ পুনঃ তফসিলের ব্যাপারটিই বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখার কথা। এ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে তিন উপায় অবলম্বন করা উচিত। এগুলো হলো, ঋণ আদায়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশে যেগুলো আটকে আছে সেগুলো মুক্ত করা। পাশাপাশি ঋণখেলাপিদের দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অথচ সরকার ঋণখেলাপিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। এটি ভালো হলো না। এতে হয়তো কাগজ-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখানো যাবে। কিন্তু তা সুফল বয়ে আনবে না। আর কমিটি গঠনের ফলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক ডিজি তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, পুনঃ তফসিলে সুবিধা বাস্তবায়নের কারণে হয়তো কিছুটা ঋণ কমবে। তবে পুনঃ তফসিল সুবিধা দীর্ঘ মেয়াদে কতটুকু সুফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এখন ভালো গ্রাহকরা খেলাপি হতে চাইবে। অর্থ মন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে পুনঃ তফসিল যাচাইয়ের কাজ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক কী করবে—প্রশ্ন রাখেন এ অর্থনীতিবিদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা