kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

নানা উদ্যোগেও নেই পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ জুলাই, ২০১৯ ০৮:২৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নানা উদ্যোগেও নেই পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা

ফাইল ফটো

অস্বাভাবিক চরিত্র ধারণ করা পুঁজিবাজারে প্রতিদিন পুঁজি হারাচ্ছে বিনিয়োগকারী। আর ‘অজানা’ কারণে শেয়ার কিনছে না বড় বিনিয়োগকারী। যদিও তারা পুঁজিবাজারে ‘বড় খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচিত। নানা উদ্যোগের পরও পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আসেনি।

বিনিয়োগকারীরা বলছে, পুঁজিবাজারে বড় পতনে দিশাহারা অবস্থার মধ্যে পড়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। যারা অল্প অল্প করে জমানো অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে বা পেনশন বা এককালীন তহবিলের অর্থ পুঁজিবাজারে এনেছে, লাভের পরিবর্তে তাদের এখন মূলধন হারানোর দশা।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, সম্প্রতি কিছু কারণে আস্থা হারিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। তাদের আস্থা ফেরাতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইন সংস্কার ও নীতি পরিবর্তন করলেও কাজ হচ্ছে না। এখন পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়েই চলেছে।

পুঁজিবাজার গতিশীল করার লক্ষ্যে চলতি বছরের বাজেট ঘোষণার আগে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বা এক্সপোজারে ছাড় দিয়েছে আর্থিক বাজার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের বাজেটে একগুচ্ছ প্রণোদনাও দিয়েছে সরকার। পুঁজিবাজারকে সহায়তা দিতে দুই হাজার কোটি টাকার তহবিল পেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। এর বাইরে সরকারি প্রণোদনা স্কিমের ৮৫৬ কোটি টাকার মধ্যে ৭৬১ কোটি বিনিয়োগের জন্য পেয়েছে সংস্থাটি। একই স্কিমের তহবিল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অর্থ জোগানে ৮৫ কোটি টাকা ছাড়ের প্রক্রিয়াও চলছে, যা শিগগিরই হাতে পাবে ২৭টি প্রতিষ্ঠান। তবুও বাজারের উন্নতি হচ্ছে না, পতন চলছেই।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চলতি বছরের শুরুতে আট কম্পানির শেয়ারে পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন সবুর আহমেদ। ওই সময় বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়, টানা কয়েক দিন বড় উত্থানও ঘটে। সঞ্চয়পত্রের চেয়ে পুঁজিবাজার লাভজনক মনে করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করে তিনি এই টাকা পুঁজিবাজারে খাটান। তবে বাজারের অব্যাহত পতনে তাঁর বিনিয়োগ এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতিদিনই কমছে শেয়ারের দাম। এখন কী করবেন সেটাও বুঝতে পারছেন না তিনি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে গত সোমবার একরাশ হতাশা নিয়ে সবুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাভজনক মনে করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছি, কিন্তু প্রতিদিনই মূলধন কমছে। যে দামে শেয়ার কিনেছি, এখন দর কমে সেটা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে গেলে অর্ধেক টাকাই লোকসান হবে। বাজার কবে ভালো হবে, সেটাও বুঝতে পারছি না।’

সুজন মোল্লা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে গত দুই মাসে খুইয়েছেন তিন লাখ টাকার বেশি। তিনি যে দামে শেয়ার কিনেছিলেন, সেটা অনেক কমে যাওয়ায় তাঁকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়েছে।

সুজন মোল্লা ও সবুর আহমেদের মতো পুঁজিবাজারের কয়েক লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এখন দিশাহারা। অব্যাহত দরপতনের কারণে পুঁজি হারাতে বসেছে তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুঁজিবাজারের মূল নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সঙ্গে প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান স্টক এক্সচেঞ্জের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন নিয়ে এ দুই প্রতিষ্ঠানের টানাপড়েন বিনিয়োগকারীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ও উচ্চসুদ হারের কারণে আর্থিক বাজারে তারল্য প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে। আর ব্যাংক থেকে মূলধন নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও পড়েছে সংকটে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৭ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হয়েছে ১৩ কার্যদিবস। যার মধ্যে ১০ দিনই মূল্যসূচকের বড় পতন ঘটেছে। তিন দিন বেড়েছে সূচক। বড় পতনে ডিএসইর প্রধান সূচক হ্রাস পেয়েছে ৪৫৬ পয়েন্ট। অন্যদিকে তিন দিনের উত্থানে বেড়েছে ১৫২ পয়েন্ট। এই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১৪ হাজার ৭৪৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ পুঁজিবাজারে বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটিজ বা শেয়ারের সর্বশেষ মূল্য ধরে বাজার মূলধন হিসাব করা হয়। কাজেই শেয়ারের দাম বাড়লে বাজার মূলধন বাড়ে আর দাম কমে গেলে বাজার মূলধনও হ্রাস পায়। ২২ জুলাই পর্যন্ত ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছিল ২১ হাজার ২৮৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে গত মঙ্গলবার হঠাৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে সক্রিয় হওয়ায় শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। যাতে এক দিনেই ছয় হাজার ২৮৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা বাজার মূলধন বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৮-১০টি কম্পানিতে যে বিনিয়োগ করেছি, সেটা এখন তলানিতে। যে শেয়ার ৫০ টাকায় কিনেছি, সেটা এখন ১৫-১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি শেয়ারে ৩০ টাকার বেশি লোকসান। বাজার এভাবে চলতে থাকলে মূলধন হারাতে আর বেশি সময় লাগবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘শুধু আমি একাই নই, আমার মতো লাখো বিনিয়োগকারী পুঁজি হারানোর পথে। বড় বড় বিনিয়োগকারীরাও বাজারে সক্রিয় নয়, তারা পাতানো খেলায় মেতেছে। এক দিন সক্রিয় হলে বড় উত্থান হয়, কিন্তু না কিনলে বাজার পড়ে যায়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে আস্থাহীনতা রয়েছে, বাজার ভালো করতে হলে বিনিয়োগকারীর আস্থা ফেরাতে হবে। কারণ বিনিয়োগকারী বাজারবিমুখ হয়েছে, অনেকে লোকসান হলেও শেয়ার বিক্রি করে বাজার ছাড়ছে।’

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাকিল রিজভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। বাজারের স্বাভাবিক চরিত্র হয়ে গেছে—ঊর্ধ্বমুখী হলে সবাই শেয়ার কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আর পতন হলে বিক্রি করতেও হুমড়ি খায়। এ কারণে বর্তমানে অনেক কম্পানির শেয়ারের দাম কমে গেছে।’ সবার অংশগ্রহণ বাড়লে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা