kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওনা, সালিস আইনে নিষ্পত্তি চায় গ্রামীণফোন

বিটিআরসি বলছে আইন সংশোধন ছাড়া সে সুযোগ নেই

বিশেষ প্রতিনিধি   

৮ জুলাই, ২০১৯ ০৮:২১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওনা, সালিস আইনে নিষ্পত্তি চায় গ্রামীণফোন

১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাওনার বিষয়টিকে এখনো অমীমাংসিতই বলছে গ্রামীণফোন। একই সঙ্গে এ মোবাইল ফোন অপারেটরের দাবি, এই পাওনা আদায়ে তাদের ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ বেআইনি ও অযৌক্তিক। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির এই সিদ্ধান্তের কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রামীণফোনের পক্ষে বলা হয়েছে, এ পদক্ষেপ স্থানীয় ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাবে বলেও জানিয়েছে গ্রামীণফোন। একই সঙ্গে বিষয়টি সালিস আইন, ২০০১-এর অধীনে নিষ্পত্তিতে সহযোগিতা করার জন্য বিটিআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা এসব কথা বলেন।

অন্যদিকে গতকাল বিকেলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশের টেলিযোগাযোগ আইনে আরবিট্রেশন বা সালিসের কোনো সুযোগ নেই। এ জন্য আইন সংশোধন করতে হবে। এটা করতে পারে জাতীয় সংসদ।’

বিটিআরসির চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘সরকারের পাওনা টাকা গ্রামীণফোনকে দিতেই হবে। টাকা না দিলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় গ্রামীণফোনের লাইসেন্স বন্ধসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছে। সেই ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই তাদের ব্যান্ডইউডথও কমানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গ্রামীণফোনকে এই বার্তা দেওয়া  হয়েছে যে—বিটিআরসি বসে নেই, বিটিআরসি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। আমরা আশা করি, গ্রামীণফোন পাওনা টাকা দিয়ে দেবে।’

গ্রামীণফোন দ্রুত টাকা না পরিশোধ করলে এই সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি দিতে হবে উল্লেখ করে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জানান, গ্রামীণফোনের কাছে পাওনার বেশি অংশই বিলম্ব ফি।

ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ কমিয়ে দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপে গ্রাহকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কার বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাধারণ গ্রাহকের যাতে ভোগান্তি না হয়, সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের কর্মকর্তারা জানান, বিটিআরসির এই ব্যবস্থার ফলে গ্রাহকদের কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে তা জানতে তাঁদের পর্যবেক্ষণ চলছে। তাঁদের ধারণা—পিক আওয়ারে ইন্টারনেট ব্যবহারে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।

প্রসঙ্গত, বিটিআরসি গত বৃহস্পতিবার গ্রামীণফোনের পাশাপাশি রবির বিরুদ্ধেও একই ধরনের অপারেশনাল ব্যবস্থা গ্রহণ করে। রবির কাছে সরকার বা বিটিআরসির পাওনার পরিমাণ ৮৬৭ কোটি ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৭৬ টাকা। বৃহস্পতিবার বিটিআরসি দেশের সব ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের এই নির্দেশনা দেয় যে বরাদ্দকৃত সর্বমোট ক্যাপাসিটির মধ্যে গ্রামীণফোনের ৩০ শতাংশ আর রবির ১৫ শতাংশ ব্যান্ডউইডথ কমিয়ে দিতে হবে।

এর আগে গত ২২ মে অনুষ্ঠিত বিটিআরসির ২২৭তম সভায় এ দুই মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে আট ধরনের অপারেশনাল ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। ব্যান্ডউইডথ বন্ধ বা সীমিত করা ছাড়াও সম্ভাব্য অন্য ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে—এ দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অনাপত্তি বা অনুমোদনপত্র জারি বন্ধ করে দেওয়া, এমএনপি পোর্ট ইন বন্ধ বা সীমিত করা, নতুন গ্রাহক নেওয়া বন্ধ বা সীমিত করে দেওয়া, ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে বা আইজিডাব্লিউ প্রান্ত থেকে অন্তর্গামী বা বহির্গামী কল বন্ধ বা সীমিত করা, আইসিএক্স বা ইন্টার কানেকশন এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে স্থানীয় কল বন্ধ বা সীমিত করে দেওয়া এবং নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এসএমএসের মাধ্যমে সারা দেশ বা নির্দিষ্ট এলাকায় ৩জি ও ৪জি সেবা বন্ধ করে দেওয়া।

এদিকে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোনের সিইও মাইকেল ফোলি বলেন, ‘ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ কমিয়ে দেওয়ার এ নির্দেশনা বাংলাদেশের মানুষ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। আমরা বিটিআরসিকে এ নির্দেশনা তুলে নেওয়ার অনুরোধ করছি এবং সেই সঙ্গে সালিস আইন, ২০০১-এর অধীনে অমীমাংসিত অডিট দাবির নিষ্পত্তিতে সহযোগিতার অনুরোধ করছি।’

সংবাদ সম্মেলনে মাইকেল ফোলির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন গ্রামীণফোনের হেড অব অপারেশন সাজ্জাদ হাসিব ও হেড অব রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স হোসেন সাদাত। তাঁরা জানান, এর আগে অমীমাংসিত অডিট দাবির গঠনমূলক নিষ্পত্তির জন্য গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে বিটিআরসিকে একটি সালিস নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশের বিষয়ে এখন পর্যন্ত নীরব ভূমিকা পালন করছে বিটিআরসি। এ ছাড়া গ্রামীণফোনের পক্ষে বলা হয়, ‘আমাদের আইনজীবীরা বলেছেন, সালিস আইনে বিষয়টি নিষ্পত্তির সুযোগ আছে।’

এদিকে মোবাইল অপারেটর রবির পক্ষ থেকেও গতকাল এক বিবৃতিতে সালিস আইনের মাধ্যমেই বিষয়টি নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘একটি বিতর্কিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লিখিত দাবিনামা সমাধানের জন্য সব দিক বিবেচনায় সালিস বা আরবিট্রেশনই সর্বোত্তম উপায়। এর জন্য আরবিট্রেশন বা সালিস নিষ্পত্তি আইন আছে। আর টেলিযোগাযোগ আইনে সালিস নিষ্পত্তি করা যাবে না এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। আমরা আশা করি, সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বিটিআরসি সালিস নিষ্পত্তির বিষয়ে আগ্রহী হবে। আর ব্যান্ডউইডথ কমানোর মতো ব্যবস্থা সাধারণ মোবাইল গ্রাহকদের জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা