kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

প্রণোদনায়ও নির্জীব পুঁজিবাজার

স্টক এক্সচেঞ্জকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট ভাঙার পরামর্শ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৭ জুলাই, ২০১৯ ০৮:৩৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রণোদনায়ও নির্জীব পুঁজিবাজার

তারল্য সংকট কাটাতে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমায় (এক্সপোজার) ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এর ফলে পুঁজিবাজারে নতুন করে ১০ হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান এসেছে। পুঁজিবাজারের উৎকর্ষে ও কারিগরি উন্নয়নে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের শেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জও যুক্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট হবে। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে একগুচ্ছ প্রণোদনাও পেয়েছে পুঁজিবাজার। এত কিছুর পরও নির্জীব পুঁজিবাজার আরো ঝিমিয়ে পড়েছে। ইতিবাচক পরিবর্তনের বিপরীতে নেতিবাচক পথে হাঁটছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। যোগসাজশ করে প্লেসমেন্ট বাণিজ্য, ফাঁকফোকর দিয়ে দুর্বল কম্পানির মূলধন উত্তোলন ও বোনাস লভ্যাংশে বিনিয়োগকারীকে ঠকানোর ঘটনাও ঘটেছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় এই অনাস্থা সৃষ্টি। ইক্যুইটিনির্ভর বাজারে বন্ড বা অন্যান্য পণ্যে বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নেই পুঁজিবাজারে।

২০০৯ সালে গ্রামীণফোনের পর আর কোনো বহুজাতিক কম্পানি পুঁজিবাজারে আসেনি। মুনাফায় থাকা সরকারি কম্পানিও পুঁজিবাজারে আসেনি। ২০০৮ সালে ৩৪টি সরকারি কম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সরকারি কম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসতে নির্দেশ দেন, কিন্তু গত আট বছরে সেই নির্দেশনার বাস্তবায়ন নেই। পুঁজিবাজার গতিশীল করতে ভালো শেয়ারের জোগান দিতে সরকারি ও বহুজাতিক কম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতেই হবে, এমন পরামর্শ বিশ্লেষকদের।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজারে শুধু প্রণোদনা দিলেই হবে না, স্টক এক্সচেঞ্জকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। এ সিন্ডিকেট না ভাঙলে প্রণোদনাতেও কাজ হবে না।

পুঁজিবাজারে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট, কম্পানি মুনাফায় কারসাজি, বিনিয়োগকারী লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত এবং সেকেন্ডারি মার্কেটে মূলধন উত্তোলন, শেয়ার দাম নির্ধারণে কাট অব প্রাইসে কারসাজি এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকের শেয়ারে লক-ইন নিয়ে অরাজক ঘটনা ঘটেছে। বছর বছর মুনাফা করলেও বোনাস লভ্যাংশ দিয়ে অবস্থা ঠিক রেখেছে কম্পানি, এতে ঠকেছে বিনিয়োগকারী। তবে বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষায় বাজেটে একগুচ্ছ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।

তারল্য সংকট কাটাতে চলতি বছরের ১৬ মে পুঁজিবাজারে দেশের তফসিলি ব্যাংকের বিনিয়োগসীমায় বড় ছাড় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক, যাতে তালিকাভুক্ত নন এমন ইক্যুইটি শেয়ার, প্রেফারেন্স শেয়ার, বন্ড, ডিবেঞ্চার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগ এক্সপোজারের বাইরে রাখা হয়। এতে দেশের পুঁজিবাজারে তফসিলি ব্যাংকের বিনিয়োগের পথ সুগম হয়। ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্যের জোগানও এসেছে। তবে তফসিলি ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ায় এক্সপোজার সীমায় ছাড়েও পুঁজিবাজারে তার প্রভাব পড়েনি।

২০১৮ সালে চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত অংশীদার হয়েছে, যাতে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারী আসার সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু পুঁজিবাজারের বর্তমান মন্দাবস্থায় বিদেশি  বিনিয়োগকারী আসেনি।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু পরিবর্তন এনে চূড়ান্ত করা হয়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কম্পানি যে পরিমাণ স্টক ডিভিডেন্ড দেবে, একই পরিমাণ নগদ ডিভিডেন্ডও দেবে। স্টক ডিভিডেন্ড যদি নগদ ডিভিডেন্ডের চেয়ে বেশি দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে সব স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রদান করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে এটি ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রণোদনা দিলেও পুঁজিবাজারের কিছুই হবে না। এখানে মূল সমস্যা স্টক এক্সচেঞ্জে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা। স্টক এক্সচেঞ্জের ২৫০ জন সদস্যের একটি অংশ এ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। আমার পরমার্শ, মেম্বারশিপ উন্মুক্ত করে দেওয়া, যেন এক হাজারের ওপর মেম্বারশিপ থাকে। এতে সিন্ডিকেশন হবে না।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক রকিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আইন-কানুনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাও আইন প্রয়োগে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। ভালো কম্পানির শেয়ারও আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারকে নেতিবাচক চোখে দেখেছে। প্রণোদনা দেওয়ার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারকে যেসব বিষয় শক্তিশালী করবে সেসবে বাধা দিয়েছে।’

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারে ভালো কম্পানির শেয়ারের জোগান দিতে হবে। দেশীয় সরকারি বা বহুজাতিক কম্পানিকে আনতে হবে। ভালো কম্পানিকে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন হয়নি। ভালো শেয়ার থাকলে বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারমুখী হবে। সূচকও বাড়বে, বাড়বে আস্থাও। নতুন বিনিয়োগও আসবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা