kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

বন্ড দুর্নীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, মামলা হলেও গ্রেপ্তার নেই

► ৬৩৭ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি ১২৬ প্রতিষ্ঠানের ► অস্তিত্বহীন কম্পানিও পায় বন্ড সুবিধা ► ৪৩৯ ‘পরিচালকের’ অনেকেরই ব্যবসা নেই

ফারজানা লাবনী    

২৭ জুন, ২০১৯ ০৮:৫২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বন্ড দুর্নীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, মামলা হলেও গ্রেপ্তার নেই

ফাইল ফটো

হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম করলেও বিদ্যমান কাস্টমস আইনে বিধান না থাকায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারী একজনকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা যায়নি। আইন অনুসারে শাস্তি হিসেবে জরিমানাসহ পাওনা রাজস্ব আদায়েই বেশির ভাগ সময়ে সীমাবদ্ধ থাকতে হয় এনবিআর সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র জোগাড় করে মামলা করতেই লেগে যায় দেড় থেকে দুই বছর। এরপর শুনানি, কর আপিল ট্রাইব্যুনাল, উচ্চ আদালত হয়ে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ‘অনন্তকালে’ গড়ায়। উচ্চ আদালতে পড়ে আছে এমন প্রায় ২৮ হাজার মামলা।

শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহারের শর্তে বিনা শুল্কে আনা কাপড়, কাগজসহ অন্যান্য কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে যারা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে এনবিআর নিয়মিত অভিযান চালায়। ধরা পড়ে চালানের পর চালান, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানবোঝাই মালামাল জব্দ হয়, ফাঁকি দেওয়া শুল্ক হিসাব করে তা আদায়ে নোটিশ পাঠায় শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। তালিকা তৈরি হয়। বেশির ভাগ সময়ই ভুয়া ঠিকানা দেওয়া থাকে। ফলে অপরাধীদের হদিস পাওয়া যায় না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ তালিকায় এ রকম ১২৬টি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে, যারা বিনা শুল্কে আমদানীকৃত কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পরিচয়ে রয়েছে ৪৩৯ ব্যক্তির নাম, যাঁদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে এনবিআর। এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬৩৭ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। পরিচালক হিসেবে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের অনেকে একই পরিবারের সদস্য, অনেকেরই আদৌ কোনো ব্যবসা নেই।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাস্তবে অস্তিত্বহীন অথচ কাগজ-কলমে ৫৪ কারখানার নাম-ঠিকানা দেখিয়ে বিনা শুল্কে কাঁচামাল এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে। একসময়ে উৎপাদনে থাকলেও এখন নেই, এমন দুটি  প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা দেখিয়ে একই অপরাধ করা হয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে কারখানায় সামান্য কিছু ব্যবহার করে অবশিষ্ট অংশ খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে। ১২৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্লাস্টিক খাতের একটি, ইলেকট্রিক খাতে তিনটি, কাগজ খাতে একটি এবং বাকিগুলো তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাস্তবে অস্তিত্ব নেই, কিন্তু কাগজ-কলমে ভেগা গার্মেন্ট লিমিটেড নাম দেখিয়ে ৪৫ কোটি ৫৩ লাখ ৫১ হাজার ১৩১ টাকার পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে বন্ড দুর্নীতি করা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পরিচয়ে মাশহুল মতিন, রওশন আকতার মতিন এবং মাইনুল মতিন রয়েছেন। এঁরা একই পরিবারের সদস্য। একইভাবে অকিল ডিজাইন লিমিটেডের পরিচালক পরিচয়ে নূর ই আলম সুমন, সাহাদাত হোসাইন ও আবু মুসা এক কোটি ৫২ লাখ ৩০ হাজার ৫২৩ টাকার পণ্য এনে বন্ড দুর্নীতি করেছেন।

একইভাবে কাগজ-কলমে থাকা ম্যাজিস্টিক অ্যাপারেল লিমিটেডের পরিচালক পরিচয়ে মো. নাসিম, ইব্রাহিম খান, জসিম আহমেদ ও ফজলুল হক শরিফ দুই কোটি ৬৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৫ টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছেন। উৎপাদনে থাকা আনু ফ্যাশান লিমিটেডের পক্ষে দুই কোটি ৭৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৪৭ টাকার বন্ড দুর্নীতি করেছেন বেলাল আহমেদ এবং ইলমুন নাহার। তাঁরা বর্তমান বসবাসের একই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।

উৎপাদনে থাকা আরেক কারখানা মাসুদ প্যাকেজিং লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে আসমা দেওয়ান ও এনামুল হক ২৬ কোটি ছয় লাখ ৯৮ হাজার ১১৮ টাকার শুল্ক মুক্ত পণ্য এনে খোলাবাজারে বিক্রি করেছেন। এঁরাও একই পরিবারের সদস্য। উৎপাদনে থাকা রাইয়ান প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজের নামে বন্ড সুবিধায় ১৩৩ কোটি ২০ লাখ ৪২ হাজার ৩৬ টাকার কাঁচামাল এনে লায়লা আফরোজা ইউসুফ, মোজাম্মেল হক, ইউসুফ হাসান, লিয়াকত হোসেন খোলাবাজারে বিক্রি করায় হিসাব জব্দ করা হয়।

উৎপাদনে থাকা মিসিল কম্পানির পরিচালক মো. ইমতিয়াজ করিম ১১ কোটি ৮৫ লাখ ২৯ হাজার ১২৭ টাকার বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করেছেন। অস্তিত্বহীন মিম প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক পরিচয়ে ২১ কোটি ২০ লাখ ৯ হাজার ৮৭৪ টাকার বন্ড দুর্নীতি করেছে মিজানুর রহমান সিদ্দিক। অস্তিত্বহীন ওয়ারম্যাচ বিডি (প্রাইভেট) লিমিটেড নাম ব্যবহার করে ৪৩ কোটি ৬৬ লাখ ৭৩ হাজার ৯৯৩ টাকা বন্ড দুর্নীতি করেছেন দীপঙ্কর সাহা, সান্তনু সাহা, সঞ্জিবা জাইন। এভাবে দুর্নীতি করেছেন অস্তিত্বহীন ১২৬ প্রতিষ্ঠানের ৪৩৯ জন।         

বন্ড দুর্নীতি চিহ্নিত করতে প্রিভেন্টিভ, নিয়মিত ও বিশেষ অডিট করা হয়। এসব অডিটে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করার পর চূড়ান্ত তদন্ত করা হয়। এতে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সুবিধামতো সময় নিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, যে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলেছে সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ, জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদ ইত্যাদিতে দুই মাস থেকে দু-তিন বছরও পার হয়ে যায়। এরপর শুনানির জন্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের তলব করা হয়। এখানে বাদী (এনবিআর) এবং অভিযুক্ত উভয় পক্ষ এক মত না হলে যেকোনো পক্ষ এনবিআরের আপিল ট্রাইব্যুনালে গিয়ে মামলা করে। এ মামলা ঠিক কত দিনে নিষ্পত্তি হবে তার সময়সীমা কেউ বলতে পারে না। ছয় মাস থেকে বছরের পর বছরও লাগতে পারে। আপিল ট্রাইব্যুন্যালের রায় বের হওয়ার পর যেকোনো পক্ষ উচ্চ আদালতে যেতে পারে। এ পর্যন্ত হাইকোর্টে আটকে থাকা রাজস্ব মামলার সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার বলে জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। মামলা নিষ্পত্তিতে লেগে যায় বছরের পর বছর। এখানে নিষ্পত্তি হওয়ার পর যেকোনো পক্ষ আপিল বিভাগে যেতে পারে।

বিদ্যমান কাস্টমস আইনে স্থায়ীভাবে বন্ড সুবিধা বাতিল, ব্যবসা চিহ্নিতকরণ নম্বর (বিআইএন), নম্বর লক (অকার্যকর) এবং ব্যবসায়ের লাইসেন্স স্থগিত করার কথা থাকলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর সম্ভব হয় না। অন্যদিকে জরিমানাসহ পাওনা পরিশোধ না করলে কাস্টমস আইনের ২০২ ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের জমি ক্রোক করে নিলামে তোলার বিধান থাকলেও জমির দলিল খুঁজে বের করা, প্রতিষ্ঠানের সব মালিককে একমতে আনাসহ সব প্রক্রিয়া পার হয়ে পাওনা আদায়েও তৈরি হয় দীর্ঘসূত্রতা। এর মধ্যে জমির দলিলে কোনো সমসা থাকলে তা সমাধান করে আসতে হয়। এতে দীর্ঘ সময় লাগে।

এ ছাড়া বন্ড দুর্নীতিবাজদের তালিকা করে এ পর্যন্ত কয়েক দফা ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে সামান্যই টাকা পাওয়া গেছে। এভাবে বন্ড দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছে বারবার।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণে বন্ড দুর্নীতি করতে সাহস পাচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এতে দুর্নীতি বাড়ছে।  বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা