kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৬ জুলাই ২০১৯। ১ শ্রাবণ ১৪২৬। ১২ জিলকদ ১৪৪০

উন্নয়ন ঝুঁকিতে পড়বে

পার্থ সারথি দাস    

২৪ জুন, ২০১৯ ০৯:০৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অবকাঠামো উন্নয়নে এগোচ্ছে দেশ। শুধু সড়ক ও রেলপথের অবকাঠামো নির্মাণেই সরকার গত ১০ বছরে এক লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে। পদ্মা সেতু, ঢাকা উড়াল সড়ক, ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পের কাজ চলছে। পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পেই ব্যয় হবে কমপক্ষে ৭০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার অধীনে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। কিন্তু প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়িত হলে বস্তাপ্রতি সিমেন্টের দাম ৪২ টাকা বেড়ে যাবে। এতে অবকাঠামো উন্নয়নের উড়ন্ত গতি ব্যাহত হবে। সরকারের বড় বড় প্রকল্পের ব্যয় অনেক বাড়বে। এমনিতেই ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় ধাপে ধাপে বেড়েছে। তদুপরি সম্ভাব্যতা যাছাই না করে প্রকল্প নেওয়ায় দ্বিগুণের বেশি ব্যয় বেড়েছে বিভিন্ন প্রকল্পে।

ভারত, চীন ও মালেয়েশিয়ার মতো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে সড়ক ও সেতু নির্মাণে ব্যয় বেশি। এ অবস্থায় সিমেন্টের দাম বেড়ে গেলে প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরাও উদ্বিগ্ন।

সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তা ও বাস্তবায়নে জড়িত ঠিকাদাররা জানিয়েছেন, সিমেন্টের দাম বাড়লে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, ঢাকা উড়াল সড়ক ছাড়াও সড়ক উন্নয়নের দেড় শ প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহাসড়ক রক্ষার জন্য কংক্রিটের সড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকৌশলীরা বলছেন, কংক্রিটের সড়ক নির্মাণের ছোট প্রকল্পেও ব্যয় বেড়ে যাবে। কারণ কংক্রিটের সড়ক নির্মাণের অন্যতম উপকরণ হলো সিমেন্ট। সওজ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সিমেন্টের দাম বাড়লে রেট শিডিউলও পরিবর্তন করতে হবে। তাতে দেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়বে।

গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. জাকির হোসাইন বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়। সিমেন্ট ব্যবহার করতে হয় কংক্রিটের সড়কাংশ নির্মাণেও। বিশেষ করে বর্ষায় পানি জমে থাকে এমন অংশগুলোয় কংক্রিটের পেভমেন্ট (গাড়ি চলাচলের অংশ) নির্মাণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও রয়েছে। এই নির্দেশের পর আমরাও গোপালগঞ্জ সড়ক জোনের অধীন বিভিন্ন সড়কে প্রয়োজন অনুসারে কংক্রিটের সড়ক নির্মাণ করছি।’

সওজ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা জানান, অধিদপ্তরের প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় রেট শিডিউলের ওপর ভিত্তি করে। নির্মাণসামগ্রীর দরের ওপর ভিত্তি করে রেট শিডিউল তৈরি করা হয়। তা ধরেই প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ঠিকাদাররা কাজ করেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালে রেট শিডিউল নির্ধারণ করেছে সওজ অধিদপ্তর। তার আগে করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এবার সিমেন্টের দাম বাড়লে শিডিউল রেট হার আবারও নির্ধারণ করতে হবে।

ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনসহ জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৯৩ কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় ৭০ কিলোমিটার মহাসড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে। ৯টি উড়াল সেতু করা হচ্ছে। তার মধ্যে চারটির কাজ শেষ হয়েছে। আরো চারটির কাজ শেষ হবে। এ ছাড়া ৫৪টি ছোট-বড় সেতুর মধ্যে ২৫টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি আছে ২৯টির নির্মাণকাজ। এসব অবকাঠামো নির্মাণে লাগবে সিমেন্ট। প্রকল্প পরিচালক মো. ইসহাক বলেন, উড়াল সেতু ও সেতু নির্মাণে যে পরিমাণ সিমেন্ট কিনতে হবে তার দাম বাড়লে এই প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

আব্দুল মোনেম লিমিটেড পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ করেছে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পাচ্চর-ভাঙ্গা অংশ নির্মাণের কাজও করছে। এ ছাড়া জড়িত রয়েছে সরকারের বড় কয়েকটি নির্মাণ প্রকল্পে। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, দুই বছর ও তার নিচে মেয়াদ আছে এমন প্রকল্পগুলো সাধারণত দেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই করে থাকে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে লাভ করতে পারছে না। কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে কম লাভে কাজ নিয়ে শেষে দেখছে লাভ হচ্ছে না। কুড়িল উড়াল সেতু নির্মাণের বড় প্রকল্পেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ নিয়ে পরে দেখতে পায়, সিমেন্টের দাম বেড়েছে। এখন বস্তাপ্রতি সিমেন্ট ৪২ টাকা বেড়ে গেলে প্রকল্প ব্যয় বাড়বেই।

সওজ অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান বলেন, সড়ক উন্নয়নের যে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে ও হয়েছে সেগুলোর ব্যয় বেড়ে যেতে পারে সিমেন্টের দাম বাড়লে।

সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি ও উদ্যোক্তাদের হিসাবে, নির্মাণ খাতের উপকরণের মধ্যে গত বছর ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে সিমেন্ট খাতে। ২০১৭ সালে দেশের সিমেন্ট ব্যবহৃত হয় দুই কোটি ৭০ লাখ টন। ২০১৮ সালে তা বেড়ে হয় তিন কোটি ১৩ লাখ টন। দেশে ৩১টি কম্পানির ৪০টি প্লান্টে সিমেন্ট উত্পাাদত হচ্ছে। কারখানাগুলোর উত্পাদনক্ষমতা রয়েছে সাড়ে পাঁচ কোটি টন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিডাব্লিউ রিসার্চের ‘বাংলাদেশ সিমেন্ট মার্কেট রিপোর্ট ২০১৭’-এর তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নে সিমেন্টের ব্যবহার হচ্ছে ৩৫ শতাংশ। ব্যক্তি উদ্যোগে অবকাঠামো নির্মাণে তা ব্যবহৃত হচ্ছে ৪০ শতাংশ। আবাসন খাতে তার ব্যবহার ২৫ শতাংশ।

এমনিতেই ব্যয় বেশি : জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীনে নির্মিত দুই কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও তিন দশমিক এক কিলোমিটার দীর্ঘ কুড়িল উড়াল সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩০৬ কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৯০ কোটি টাকা। ৯০০ মিটার দীর্ঘ ছয় লেনের বনানী উড়াল সেতু, ৫৬১ মিটার সংযোগ সেতু ও এক দশমিক ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের মিরপুর-বিমানবন্দর সড়কে জিল্লুর রহমান উড়াল সেতুতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ১০৫ কোটি টাকা। অথচ কলকাতায় নির্মিত পরমা উড়াল সেতুর প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। সম্প্রতি চীনে ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি উড়াল সড়ক নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। মালয়েশিয়ায় ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি উড়াল সেতু নির্মাণে কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এবার সিমেন্টের দাম বাড়লে বড় প্রকল্পে ব্যয় তার তুলনায় আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

খবরটি ইউনিকোড থেকে বিজয়ে নিতে ব্যবহার করুন কালের কণ্ঠের বাংলা কনভার্টার-

https://www.kalerkantho.com/home/converter

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা