kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

দেশি শিল্প সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে : এনবিআর চেয়ারম্যান

বিশেষ সাক্ষাৎকার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ জুন, ২০১৯ ০৯:২৮ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



দেশি শিল্প সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে : এনবিআর চেয়ারম্যান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে এমন কিছু রাখা হয়নি যাতে সাধারণ মানুষ চাপে পড়ে। বরং সাধারণ মানুষকে চাপমুক্ত রেখে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজীব হোম রায়

কালের কণ্ঠ : প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?

এনবিআর চেয়ারম্যান : রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আস্তে আস্তে বাড়বে। এটাই স্বাভাবিক। কেউ কেউ মনে করে অনেক বড় টার্গেট দেওয়া হয়েছে। আমাদের অফিসাররাও অনেক সময় একই কথা বলেন। কিন্তু বড় লক্ষ্য হলে অর্জনের জন্য চেষ্টা একটু বেশি থাকে। সে জন্য আমি টার্গেট বেশি দেওয়ার ব্যাপারটায় কখনো বিরোধিতা করি না। টার্গেট বেশি থাকবেই। সেটা আমরা পূরণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করব। রাজস্ব সব জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেগুলো সংগ্রহ করতে হবে। তাহলেই আদায় বাড়বে। তবে এ জন্য আমরা এবারের বাজেটে খুব বেশি চাপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিইনি। জনগণকে চাপমুক্ত রেখে আদায় বাড়ানো হবে।

কালের কণ্ঠ : এত বড় লক্ষ্য পূরণের জন্য এনবিআরের কী ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে?

এনবিআর চেয়ারম্যান : চলতি অর্থবছর এবং আগামী অর্থবছরের কর নেট বাড়ানোর জন্য আমরা এরই মধ্যে জরিপকাজ শুরু করে দিয়েছি। রাজধানী ও অন্যান্য শহরসহ জেলা পর্যায়ে জরিপ শুরু হয়ে গেছে। যারা কর দেওয়ায় সক্ষম তাদের আমরা জরিপের আওতায় নিয়েছি। আরেকটা কাজ আমরা করছি, সেটা হলো—বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করেছি। বিশেষ করে এবারের বাজেটে আয়করের অংশে আমরা বলেছি, বিদ্যুৎ বিলের গ্রাহকদের টিআইএন বাধ্যতামূলক। এভাবে অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রেও আমরা টিআইএন বাধ্যতামূলক করব। এরপর প্রশাসনিক সংস্কার, জনসংখ্যা, অফিসসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আমরা আরো বাড়াব। এতে করে বেশি লোকের কাছে আমরা পৌঁছতে পারব। আমরা দেখেছি, যে বছর আমরা লোকবল বাড়িয়েছি সে বছর রাজস্ব আহরণ অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের এখন ৪৫ লাখ টিআইএনধারী আছে। কিন্তু রিটার্ন দাখিল করছে ২০-২১ লাখ। যাদের টিআইএন আছে তারা যাতে রিটার্ন দাখিল করে সে জন্য আমাদের অফিসাররা তৎপর হবেন। এ ছাড়া কর, ভ্যাট, কাস্টমসে আমরা উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছি। এর ফলে আদায় সহজ হবে। অনেকে সামর্থ্যবান কিন্তু কর দিচ্ছেন না। তাঁরাও এর মাধ্যমে করের আওতায় আসবেন। আমাদের টার্গেট হলো—২০২১ সালের মধ্যে এক কোটি আয়করদাতার লক্ষ্য পূরণ। কর দেওয়ার ক্ষেত্রে অফিসগুলো যেন জনগণকে হয়রানি না করে সে জন্য আমরা সচেতন হয়েছি। সাধারণ মানুষ সব দ্রব্যসামগ্রীর ওপর ভ্যাট দেয়। কিন্তু তার সবটা সরকারি কোষাগারে আসে না। একশ্রেণির ব্যবসায়ী আছে সেটাকে লাভের অংশ হিসেবে ধরে নেয়। এটা যেন না হয় সে জন্য আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার করছি। আমরা এরই মধ্যে ইএফডি (ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস) বসাব বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। খুচরা, পাইকারি সব জায়গায় এগুলো বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। এতে হয়তো এক বছর সময় লাগবে। এ জন্য আমরা একটি বিধিমালা করেছি। আমরা চেষ্টা করছি আয়করের পারসেনটেজ আরো বাড়ানোর জন্য। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয়করের ফিগার অন্য অর্থবছরের তুলনায় বাড়বে। কারণ আয়করের ওপর আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। এটা ৪০ শতাংশ হতে পারে। গত বছর ছিল ৩৫ শতাংশ। আমরা ভ্যাটের ওপর গুরুত্ব দেব। আস্তে আস্তে কাস্টমস ডিউটির ওপর গুরুত্ব অনেক কমবে। আমরা কাঁচামাল, শিল্প মেশিনারিজের ওপর খুব কম শুল্ক আরোপ করেছি। আবার অনেক জায়গায় দেশি শিল্প রক্ষায় শুল্ক কম ধার্য করেছি। এতে হয়তো অনেক জায়গায় রাজস্ব কম আসবে, আবার কম নাও আসতে পারে। ব্যবসায়ীরা যদি দেখেন তাঁদের উৎপাদন ব্যয় কম হয়, উৎপাদন যদি বাড়ে তাহলে এগুলোর আমদানি কমবে না। বরং বাড়তে পারে। তাহলে আমাদের রাজস্ব বাড়বে। আরেকটি বিষয় হলো—আমাদের দেশে যদি বিনিয়োগ বাড়ে তাহলে কর্মসংস্থান হবে। তাহলে ওখান থেকে আমরা ভ্যাট, আয়কর পাব। দেশের লোকজনের কাছে টাকা-পায়সা হলে সেখান থেকেও আয় আসবে। দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম যাতে বাড়ে সে জন্য আমরা চেষ্টায় আছি। এ জন্য আমি মনে করি আমাদের টার্গেট অর্জন সম্ভব। টার্গেটের কাছাকাছি যেতে পারব।

কালের কণ্ঠ : জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হবে। এনবিআরের প্রস্তুতি কতটুক?

এনবিআর চেয়ারম্যান : ১৯৯১-৯২ সাল থেকে ভ্যাট আইন কার্যকর আছে। তাই আগে থেকেই ভ্যাট আদায়ের কার্যক্রম চালু আছে। তবে নতুন আইন যেটি কার্যকর হবে সেটিতে কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সুবিধা হবে। আবার কিছু ক্ষেত্রে আমাদের আদায়ের সুবিধা হবে। কারণ এটাতে অটোমেশন বেশি। রিপোর্টিং আছে। যারা ভ্যাট দেবে তাদের ভ্যাট জমা দিতে হবে রিটার্নের মতো। এসব করার কারণে ভ্যাট দেওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে বাড়বে। এটা ইতিবাচক দিক। আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে বেশ কিছু জায়গায় অব্যাহতি সীমা বাড়িয়েছি। ভ্যাট অব্যাহতির সীমা ৩০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ করেছি। বার্ষিক টার্নওভারের সীমা তিন কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছি। যাদের বার্ষিক টার্নওভার তিন কোটি টাকা হবে তারা নির্ধারিত ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট দেবে। আগে ৮০ লাখ টাকা টার্নওভার হলেই ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন করতে হতো। এখন এটা তিন কোটি টাকা করা হয়েছে। যারা তিন কোটি টাকা ব্যবসা করবে তারা ভ্যাট নিবন্ধন করবে না—এটা হতে পারে না। তবে বাস্তবায়নের সুবিধার্থে আমরা কয়েক স্তরের ভ্যাট করেছি। আইনে অবশ্য একটি স্তর ছিল (১৫ শতাংশ)। সাধারণভাবে চারটি স্তর করেছি—৫, ৭.৫, ১০ এবং ১৫। যারা ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেবে তারা কর রেয়াত পাবে। এ ছাড়া আরো দু-তিনটি ক্লাসিফিকেশন করেছি। যেমন—আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে আমরা এক হাজার ৬০০ বর্গফুটের নিচে বাড়ির জন্য ২ শতাংশ, আর ওপরের জন্য সাড়ে ৪ শতাংশ বলবৎ আছে। কয়েকটি সংবেদনশীল প্রডাক্ট যেমন—পেট্রোলিয়ামের জন্য ২ শতাংশ আর মেডিসিনের জন্য ২.৪ শতাংশ প্রযোজ্য হবে। আমরা ভ্যাটটাকে সহনীয় পর্যায়ে রেট করেছি। এবার যখন আমরা দ্রব্যের তালিকা করি তখন এ বিষয়গুলো আমরা খেয়াল করেছি, যাতে কারো ওপর চাপ না পড়ে। সহনীয় থাকার কারণে আমাদের আদায় আগের চেয়ে ভালো হবে বলে আমার মনে হয়। আর ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের আদায়কৃত ভ্যাট আমাদের দেবে। আর ইএফডি হয়ে গেলে মেশিনগুলো এনবিআরের সেন্ট্রাল সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। তখন আর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এবার কিছু পণ্যে ফিক্সড ভ্যাট রেখেছি। যেমন—নিউজপ্রিন্ট, ইট, রডজাতীয় দ্রব্য, সিমকার্ড। সিমকার্ড সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে ১০০ টাকার জায়গায় ২০০ টাকা করেছি। সাধারণত এ টাকাটা মোবাইল কম্পানিগুলোই দিয়ে থাকে। আয়করের দিক দিয়ে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়তো কিছু বাড়বে। যেমন—কথা বলার ক্ষেত্রে আয়কর ৫ শতাংশের জায়গায় ১০ শতাংশ করেছি। কারণ রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। সব ক্ষেত্রে কমিয়ে দিলে তো রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণ হবে না। আমাদের দেশের মানুষ যে কথা বলে সেটা কিন্তু অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। সে জন্য এখানে সামান্য বাড়িয়েছি। আমদানি শুল্কে কিন্তু অনেক ছাড় আছে। প্রধান খাদ্যদ্রব্য, বীজ, সারে আমরা আমদানি শুল্ক শূন্য রেখেছি। চালে কিছুটা বাড়িয়েছি। আমাদের দেশের কৃষকদের কথা বিবেচনা করেই এটা করেছি। কৃষি উপকরণে সব শূন্য, তবে কৃষি যন্ত্রপাতিতে রেয়াতি হারে শুল্ক ধার্য করেছি। আমাদের যা কিছু আমদানি-রপ্তানি হবে সব স্ক্যানিং মেশিনের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। ফলে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি বন্ধ হবে। অন্যদিকে অভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে যেসব পণ্য আসত তা বন্ধ হবে। এতে রাজস্ব ক্ষতি যেমন হয় তেমনি জনগণের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ত। স্ক্যানার মেশিন কেনা হচ্ছে। বিভিন্ন পোর্টে দেওয়া হবে। এসব পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের উপকার হবে। আবার অন্যদিকে আমাদের রাজস্ব সঠিকভাবে আসবে। আর বাজেট তো ভালো হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজস্ব কতটুকু বাড়বে বলে আপনি মনে করেন?

এনবিআর চেয়ারম্যান : আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আগেও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু খুব একটা সুবিধা পাওয়া যায়নি। এবার ওই সুযোগের সঙ্গে করের হারটা সামান্য কমিয়েছি বিভিন্ন জায়গা ও এলাকাভেদে। নির্দিষ্ট কর দিয়ে এখানে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে সে জন্য বলছি, যেহেতু আইনটি আমরা জাতীয় সংসদে পাস করিয়েছি, সংশোধন হয়েছে এবং অর্থ বিলে এসেছে। তাই এখানে বিনিয়োগ করলে কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। অর্থাৎ প্রশ্ন করা হবে না। একইভাবে অপ্রদর্শিত অর্থ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হাইটেক পার্কে যদি কেউ ১০ শতাংশ কর দিয়ে বিনিয়োগ করে, তাহলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। এর ফলে বিনিয়োগ বাড়বে। যাদের কাছে অপ্রদর্শিত অর্থ আছে, তারা ইচ্ছা করলে সরাসরি নিজেরা বিনিয়োগ করতে পারে অথবা জয়েন্ট ভেঞ্চারে দেশি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ করতে পারবে। এতে আমরা ভালো ফল পাওয়ার আশা রাখি; যদিও এর আগে দেওয়া সুযোগে খুব বেশি লাভ হয়নি। এবার যদি এ সুযোগের ব্যবহার না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আমরা এ সুযোগ রাখব না।

কালের কণ্ঠ : বাজেটে বন্ডের অপব্যবহার প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

এনবিআর চেয়ারম্যান : বাজেটে বন্ডের অপব্যবহার রোধে তেমন কোনো কার্যকরী বিষয় নেই। কারণ আমরা সুতা, কাপড় ও কাগজ আমদানির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন করিনি। তবে বন্ডের ক্ষেত্রে আমরা মনিটরিং বাড়িয়ে দিয়েছি। আমরা কুটির শিল্পে কোনো ভ্যাট রাখিনি। আর বন্ডে যারা কাপড় আনে তাদের যদি খুব বেশি লাভ না হয়, তাহলে বাইরে বিক্রি করবে না। আমরা বন্ড অটোমেশনে যাচ্ছি। ফলে সবাই এর সুবিধা পাবে। সবার সঙ্গে আমাদের সংযোগ স্থাপন হবে। অটোমেশন সঠিকভাবে যদি ব্যবসায়ীরা রপ্তানিতে ব্যবহার না করে, তাহলে তারা ধরা খেয়ে যাবে। আর এর ওপর অনেক বড় জরিমানা করা হবে। শুধু জরিমানা নয়, জরিমানাসহ সব শুল্ক কর তাদের পরিশোধ করতে হবে। আর ধরপাকড়ের ফলে এরই মধ্যে ১৬০টি বন্ড লাইসেন্স আমরা স্থগিত করে দিয়েছি। বেশ কয়েকটি বাতিলের প্রক্রিয়ায় আছে। তাই যারা বাইরে বিক্রি করত তারা এখন আর করছে না।

মন্তব্য