kalerkantho

সোমবার । ২২ জুলাই ২০১৯। ৭ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৮ জিলকদ ১৪৪০

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রণীত অর্থবিল

গুলশানে ফ্ল্যাট কিনলে বর্গমিটারে ৪০০০ টাকা কর

ফারজানা লাবনী    

১৫ জুন, ২০১৯ ১০:০১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গুলশানে ফ্ল্যাট কিনলে বর্গমিটারে ৪০০০ টাকা কর

আগামী অর্থবছরের জন্য এলাকাভেদে আবাসন খাতের কর হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া, ভার্চুয়াল বিজনেস ভ্যাটের আওতায় রাখা হয়েছে। সয়াবিন তেল, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ইন্টারনেট সংস্থার সেবায় ভ্যাট বহাল থাকছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রণীত অর্থবিল-২০১৯-এ ভ্যাটযোগ্য পণ্যের তালিকায় থাকা প্রায় হাজারের বেশি পণ্য ও সেবার তালিকায় এসব নাম আছে। ভ্যাট আইন-২০১২ বাস্তবায়নের শর্ত হিসেবে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত, ভ্যাটের আওতায় থাকা এবং সম্পূরক শুল্ক আরোপযোগ্য পণ্যের তালিকা স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সঙ্গে সম্পদশালীদের ওপর আরোপিত সারচার্জের হার বাড়িয়ে সীমায় ছাড়ের কথা, করমুক্ত আয়সীমা ও করপোরেট করহারের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখার কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধীদের কাজের সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার কথাও অর্থবিলে বলা হয়েছে। উেস করের আওতা বাড়ানো হয়েছে। করজালের বিস্তারে বিভিন্ন খাতে ই-টিআইএন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা উল্লেখ আছে।

অর্থবিলে উল্লেখ আছে, রাজধানী ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতি বর্গমিটার ভবন বা ফ্ল্যাট কিনতে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং জমি কিনতে ১৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা, ডিওএইচএস, মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইট, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওরান বাজার, বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা, ঢাকার নিকুঞ্জ, চট্টগ্রামের খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা এবং জমি কিনতে ১০ হাজার টাকা কর দিতে হবে।

যেকোনো সিটি করপোরেশনে ফ্ল্যাট ও ভবন কিনতে ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা এবং জমি কিনতে পাঁচ হাজার টাকা কর দিতে হবে। জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় ফ্ল্যাট ও ভবন কিনতে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং জমি কিনতে এক হাজার ৭০০ টাকা কর দিতে হবে। এর বাইরে অন্য এলাকার জন্য ফ্ল্যাট ও ভবন কিনতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং জমি কিনতে ৫০০ টাকা কর দিতে হবে।

সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ি থাকলে অন্য এলাকার ধার্যকৃত করের বাইরে আরো ২০ শতাংশ গুনতে হবে। তবে ফ্ল্যাট, ভবন ও জমি কেনার অর্থ কোন উৎস থেকে আয় করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা না হলেও এসব অর্থ কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অবৈধ ব্যবসা থেকে আয় করা যাবে না।

অর্থবিলে ব্যাংকিং লেনদেন, বিদ্যুৎ সংযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে ই-টিআইএন সরবরাহের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কর অবকাশ সুবিধা ২০২৪ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম বিভাগ, নারায়ণগঞ্জ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি জেলায় ছয় বছরের প্রথম বছর ৯০ শতাংশ, দ্বিতীয় বছর ৮০ শতাংশ, তৃতীয় বছর ৬০ শতাংশ, চতুর্থ বছর ৪০ শতাংশ এবং পঞ্চম বছর ২০ শতাংশ কর অবকাশ সুবিধা বহাল থাকবে। অন্যদিকে রাজধাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর বিভাগে এ হার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ থেকে পর্যায়ক্রমে কমিয়ে ১০ বছরে ১০ শতাংশ হারে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হবে। এভাবে এলাকাভেদে এ সুবিধার কমবেশি করা হয়েছে। কর অবকাশ সুবিধাপ্রাপ্ত খাতের মধ্যে ওষুধ, কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল, জৈব সার, টেক্সটাইল যন্ত্রসহ ২৬টি খাতে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

অর্থবিল বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এবার ভ্যাট অব্যাহতির তালিকায় থাকা বেশির ভাগ পণ্য আগামীতেও অব্যাহতি পাচ্ছে। নিত্যপণ্য এবং অধিক ব্যবহৃত পণ্যেও অব্যাহতিতে রাখা হয়েছে। তবে অনেক অপ্রচলিত পণ্যও ভ্যাট অব্যাহতি পাচ্ছে।

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আরো অধিকসংখ্যক প্রয়োজনীয় পণ্য এবং ভোগ্যপণ্যকে ভ্যাটের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন ছিল। অল্প ব্যবহৃত পণ্য এ তালিকায় রাখা হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়বে না।

অর্থবিল অনুসারে ভ্যাটের আওতায় থাকছে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি তৈজসপত্র, পাম অয়েল, সানফ্লাওয়ার, সরিষার তেল, টিভি ও অনলাইনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সরবরাহকারী, জ্যোতিষী ও ঘটকালি। নতুন ভ্যাট আইনের কারণে সম্পূরক শুল্ক আরোপ হওয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে গাড়ির নিবন্ধন ফি, রুট পারমিট, ফিটনেস, মালিকানা সনদ, হেলিকপ্টার ও চার্টার্ড বিমান ভ্রমণ, বিদেশি আইসক্রিম, মোবাইল ফোনে কথা বলায় ও সিগারেটে। এ ছাড়া তরল দুধ থেকে গুঁড়া দুধ উৎপাদন, মেশিনে প্রস্তুত বিস্কুট, প্রতি কেজি ১৫০ টাকার বেশি দামের হাতে বানানো কেক, আচার, চাটনি, টমেটো কেচাপ, আম, আনারসসহ ফলের পেস্ট, ফলের জুস, আমসত্ত্ব, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি প্রকল্পে উৎপাদিত কয়লা, এলপি গাস, কিচেনওয়্যার, গৃহস্থালি সামগ্রী, টয়লেট টিস্যু, কিচেন টাওয়েল, স্ক্যাপ।

ভ্যাটের আওতায় থাকা সেবা ইন্ডেটিং সংস্থা, আসবাবপত্রের বিপণনকেন্দ্র, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চ সার্ভিস, তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, ডুপ্লেক্স বোর্ড, সেল্ক কপি পেপার, বিড়ি, সিগারেট, নন-এসি হোটেল ও রেস্তোরাঁ, নির্মাণ সংস্থা, আসবাবপত্রের উৎপাদক, নিজস্ব ব্র্যান্ডের তৈরি পোশাক, নিজস্ব ব্র্যান্ডের নয়, এমন তৈরি পোশাক, মোটরগাড়ির গ্যারেজ, ডক ইয়ার্ড, ছাপাখানা, নিলামকারী সংস্থা, যান্ত্রিক লন্ড্রি, সিম কার্ড ব্যবহারকারী।

ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্যের মধ্যে জীবনধারণের জন্য মৌলিক সেবার মধ্যে কৃষি সম্পর্কিত কাজ, মৎস্য পালন সম্পর্কিত কাজ, সমাজকল্যাণমূলক কাজের মধ্যে সরকারি চিকিৎসার পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসা, পুনর্বাসন কাজ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আমানত ও সঞ্চয়, জীবন বীমা পলিসি, স্টক সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ, পরিবহন সেবার মধ্যে যাত্রী পরিবহন সেবা, পণ্য পরিবহন সেবা, এয়ারলাইনস, অ্যাম্বুল্যান্স সেবা। ব্যক্তিগত সেবার মধ্যে সাংবাদিক, গায়ক, অভিনেতা, বেতার ও টেলিভিশনের পারফরমারের সেবা, ইলেকট্রিক্যাল মিস্ত্রির সেবা ভ্যাটের আওতামুক্ত। জমি উন্নয়ন সংস্থা ও ভবন নির্মাণ সংস্থা ব্যতীত জমি বিক্রয় বা হস্তান্তর এবং এর নিবন্ধনের সেবা ভ্যাটের আওতার বাইরে। রেডিও-টেলিভিশন সম্প্রচার, পুস্তক, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনের ছাপাখানা, শিল্পকর্ম, অপেশাদার খেলাধুলা, লাইব্রেরির আয় ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। কৃষিপণ্য, উদ্যান, খামার, ডেকোরেটরস, হেলথ ক্লাব, ভিডিও অডিও রেকর্ডিংয়ের দোকান ভ্যাটের আওতার বাইরে আছে।

সরকারি শিক্ষা, পরিবেশদূষণ প্রতিরোধে কার্যক্রম, গবাদি পশুর মাংস, হাঁস-মুরগির মাংস, আড়াই  কেজি পর্যন্ত মোড়কের বা হিমায়িত মাছ, খোলা তরল দুধ, শূকরের মাংস, খোলা মধু, হাতির দাঁত, হরিণের শিং, ভাজা বা ঠাণ্ডা আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, লেটুস, গাজর, শালগমসহ বিভিন্ন সবজি, গোলামরিচ, দারচিনি, জায়ফল, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলা, ভুট্টা, ধান, চীনাবাদাম ভ্যাটের আওতার বাইরে আছে।

পাউরুটি, বনরুটি, প্রতি কেজি ১৫০ টাকা মূল্যের হাতে তৈরি বিস্কুট ও কেক, নারী উদ্যোক্তা পরিচালিত শোরুমের বিক্রি, বাংলাদেশ হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জোগানদার ও বিদ্যুৎ বিতরণকারীর সেবা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস জোগানদার ও বিদ্যুৎ বিতরণকারীর সেবা, পাবলিক-পার্টনারশিপ প্রকল্পে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্মাণ সংস্থা, কনসালট্যান্সি ও সুপারভাইজরি ফার্ম জোগানদার ও আইন পরামর্শক সেবার ওপর, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে ফ্রেইট ফরোয়ার্ড ক্লিয়ারিং, বীমা কম্পানি, জোগানদার ও ব্যাংকিং সেবার ওপর ভ্যাট থাকছে না।

ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত অপ্রচলিত পণ্যের মধ্যে আছে জীবন্ত শূকর, পাখির পালক, অ্যাররুটসহ প্রায় শতাধিক পণ্য।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা