kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

মন্ত্রীর নম্বর বিক্রিসহ আইন ভঙ্গের দায়ে গ্রামীণ রবি বাংলালিংককে জরিমানা

কাজী হাফিজ    

৯ মে, ২০১৯ ০৯:১৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মন্ত্রীর নম্বর বিক্রিসহ আইন ভঙ্গের দায়ে গ্রামীণ রবি বাংলালিংককে জরিমানা

মন্ত্রীসহ ভিআইপিদের মোবাইল ফোন নম্বর অবৈধভাবে বিক্রি করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর খবরটি গত ১ এপ্রিল কালের কণ্ঠে ছাপা হয়

মন্ত্রীর নম্বরসহ অনেকের নম্বর অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়া এবং বায়োমেট্রিক্স ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সিম নিবন্ধনের নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগে মোবাইল ফোন অপারেটর রবি ও বাংলালিংককে পাঁচ কোটি টাকা করে জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। জরিমানা করার সিদ্ধান্ত গত ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত সংস্থাটির ২২৪তম সভায়ই হয়েছিল। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করতে বেশ কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করায় গত ৩০ এপ্রিল বিটিআরসির ২২৬তম সভায় এই জরিমানার পরিমাণ চূড়ান্ত করা হয়। একই সঙ্গে এ সভায় এক গ্রাহকের নম্বর নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য গ্রাহককে দিয়ে দেওয়ার অপরাধে গ্রামীণফোনকেও একই পরিমাণ জরিমানা করা হয়েছে।

অভিযুক্ত মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক কালের কণ্ঠকে জানায়, গতকাল বুধবার পর্যন্ত তারা এ সম্পর্কে বিটিআরসির কাছ থেকে কোনো চিঠি বা দাবিনামা পায়নি।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিরুদ্ধে উদ্বেগজনক এসব অভিযোগ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি বলেছে, সরকারের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে অপারেটরগুলো এমন কিছু করছে, যা রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। অপারেটরদের কর্মকাণ্ডে অনেক গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলামও এর ভুক্তভোগী। তাঁদের ‘প্রিমিয়াম’ মোবাইল ফোন নম্বর অন্য গ্রাহককে দিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব বিষয়ে বিটিআরসি ব্যাখ্যা চাইলেও সংশ্লিষ্ট অপারেটররা গড়িমসি করে, মিথ্যারও আশ্রয় নেয়।

গত ১ এপ্রিল কালের কণ্ঠে ‘মোবাইল অপারেটররা রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তার হুমকি বাড়াচ্ছে/মন্ত্রীর নম্বরও বিক্রি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

জানা যায়, গ্রাহকদের অভিযোগ পেয়ে বিটিআরসি গত ২৭ জানুয়ারি রবির কাছে ই-মেইলে তিনটি মোবাইল ফোন নম্বরের নিবন্ধন ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চায়। রবি ওই দিনই বিটিআরসিকে ই-মেইলে এ বিষয়ে তথ্য জানালেও দুটি নম্বরের বিষয়ে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়। এই দুটি নম্বরের একটি বায়োমেট্রিকস ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে নিবন্ধন না করার কারণে ২০১৬ সালে বিটিআরসির নির্দেশনায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট গ্রাহক আবেদন করলে রবি তদন্ত না করেই নম্বরটি সচল করে দেয়। বিটিআরসির নির্দেশনা হচ্ছে, বায়োমেট্রিকস ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে নিবন্ধন না হওয়া সিম বন্ধ হলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক যদি ৫৪০ দিনের মধ্যে সঠিকভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন করেন তাঁকে ওই সিম সচল করে দেওয়া যাবে। কিন্তু এটি সচল করে দেওয়া হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ সময় পর ৯৩২ দিনের মাথায়। এ ছাড়া ওই সিমের নিবন্ধনের তথ্য সেন্ট্রাল বায়োমেট্রিকস ভেরিফিকেশন মনিটরিং প্ল্যাটফর্মে (সিবিভিএমপি) দেওয়া হয়নি। অন্য নম্বরটির বিষয়ে রবি জানায়, নম্বরটির নিবন্ধন নেই এবং সে কারণে সচল নয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পাঠানো স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ২৭ জানুয়ারি নম্বরটি সচল ছিল। এই ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য কেন দেওয়া হলো তা জানতে চাইলে গত ৩১ জানুয়ারি রবি আবারও যে জবাব দেয় তাতে তাদের আগের জবাব ভুল প্রমাণিত হয়। আগের জবাবে সিমটি সচল নয় জানানো হলেও দ্বিতীয় জবাবে নিবন্ধন বিষয়ে কোনো তথ্য ছাড়াই জানানো হয় সিমটি সচল। এ বিষয়ে বিটিআরসি বলছে, ‘এই জবাবের মাধ্যমেও তারা পুনরায় মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।’

বাংলালিংকের বিষয়ে অভিযোগ হচ্ছে—তারা প্রতিমন্ত্রী পলক ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শহিদুল ইসলামসহ বিভিন্ন গ্রাহকের প্রিমিয়াম নম্বর ‘ডুয়াল ক্লেইম’ পদ্ধতিতে তুলে নিয়ে গ্রামীণফোনে স্থানান্তর (এমএনপির মাধ্যমে পোটিং) করে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে ছয় মাস আগে বিটিআরসির কাছে অভিযোগ করা হয়। বিটিআরসি তাত্ক্ষণিক এর ব্যাখ্যা চাইলে বাংলালিংক প্রথমে জানায়, বিষয়টি সত্য এবং এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত হচ্ছে। এরপর এ বিষয়ে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও সর্বশেষ নির্ধারিত ২৯ জানুয়ারি তা জমা না দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখায় বলে বিটিআরসির ২২৪তম সভার কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়। এতে আরো বলা হয়, এরপর ৩১ জানুয়ারি যে প্রতিবেদন জমা দেয় তা অসম্পূর্ণ এবং ওই ঘটনা সংঘটনে বাংলালিংক নিজেদের সম্পৃক্ততা এড়িয়ে বাইরের দুজন প্রতারককে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করে। এর মধ্যে একজনের নাম মো. আব্দুল মোতালেব (জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর-৭২১৪৭৬৭১০৭৯৩১)।

রবি ও বাংলালিংকের এসব অপরাধ প্রসঙ্গে বিটিআরসির সভায় শাস্তির প্রস্তাব করে বলা হয়, অপারেটর দুটি তাদের প্রতি ইস্যু করা ৩জি লাইসেন্সিং গাইডলাইনের অনুচ্ছেদ-৪৯ এবং ৪-জি লাইসেন্সিং গাইডলাইনের অনুচ্ছেদ-৩৭-এর শর্তাবলি লঙ্ঘন করেছে।

এদিকে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, এ অপারেটরের একটি বিশেষ নম্বর (শেষ আটটি ডিজিট একই নম্বরের) সম্পর্কে সিবিভিএমপি সার্ভারে ২০১৬ সালের বাল্ক মাইগ্রেশন তথ্য ছাড়া আর কোনো তথ্য নেই। কিন্তু অপারেটরের তথ্য অনুসারে ওই  নম্বরটির মালিকানা ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর পরিবর্তন হয়েছে। এ বিষয়ে বিটিআরসির নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে সিবিভিএমপি সার্ভার থেকে সতর্কতামূলক বার্তা পাওয়ার পরও গ্রামীণফোন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর বিটিআরসিকে না জানিয়ে গত বছর ১ জুলাই ও ৫ নভেম্বর ওই নম্বর বা সিমটির মালিকানা পরিবর্তন করা হয়েছে। এই অপরাধের জন্য রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে বিটিআরসি গ্রামীণফোনকে পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস সৈয়দ তালাত কামাল গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, জরিমানার বিষয়ে বিটিআরসির কোনো চিঠি এখনো আমরা পায়নি। বাংলালিংক থেকেও একই তথ্য জানানো হয়। মোবাইল অপারেটর রবির কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা