kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

ব্যাংকে চড়া সুদের ধাক্কা পুঁজিবাজারে

রফিকুল ইসলাম    

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ১০:৪২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্যাংকে চড়া সুদের ধাক্কা পুঁজিবাজারে

ব্যাংকঋণে চড়া সুদের কারণে হিমশিম খাচ্ছে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। এবার এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারেও। সঞ্চয়ী আমানতে সুদহার বেড়ে যাওয়ায় পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ বেরিয়ে যাচ্ছে। মূলধন তুলতে অব্যাহত শেয়ার বিক্রিতে অস্থির হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার। আর বিনিয়োগ বেরিয়ে যাওয়ায় প্রতিদিনই কমছে বাজার মূলধন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতায় অন্য অনেক কারণের অন্যতম একটি হলো ব্যাংকের উচ্চ সুদহার। তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ ও ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়ের চাপে উচ্চ হারে আমানত সংগ্রহ করছে ব্যাংক। সঞ্চয়কারীরাও উচ্চ হারে সুদ পাওয়ায় পুঁজিবাজার ছেড়ে ব্যাংকের সঞ্চয়ে ফিরছে। অনেকে কিনছে সঞ্চয়পত্র।

সূত্র জানায়, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কম সুদে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে সরকার উদ্যোগ নেয়। সুদহার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কয়েকটি সুবিধা আদায় করে  নিয়েছেন ব্যাংক মালিকরা। এর মধ্যে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা, বাণিজ্যিক ব্যাংকের নগদ জমা বা সিআরআর কমানো ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ধারে রেপোর সুদহার কমিয়ে নেওয়া অন্যতম। অথচ ব্যাংকগুলো সেই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি। দু-একটি ব্যাংক এক অঙ্কে সুদহার বাস্তবায়ন শুরু করলেও বড় অংশই সেটা করতে পারেনি। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশন সংরক্ষণ, আশানুরূপ আমানত না আসা ও এডিআর সমন্বয়ে চাপ থাকায় ব্যাংকে তারল্য সংকট চলছে। এর জন্য ৬ শতাংশ হারে আমানত সংগ্রহ ও ৯ শতাংশ হারে ঋণ বিতরণ কার্যকর হচ্ছে না।

পুঁজিবাজার সূত্র জানায়, ব্যাংকে সঞ্চয়ের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারে অনেক বিনিয়োগ আসে। বিশেষ করে ব্যাংকে সঞ্চয়ে সুদহার কম হলে পুঁজিবাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। ব্যাংকের সঞ্চয় উঠিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের শেয়ার কেনে অনেক বিনিয়োগকারী। কারণ বছর শেষে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক কমপক্ষে ১০ শতাংশ আবার কোনো ব্যাংক ২০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি লভ্যাংশ দেয়। নগদ লভ্যাংশে বিনিয়োগকারী সরাসরি মুনাফা পায়। বোনাস লভ্যাংশ শেয়ার বরাদ্দ তো আছেই।

স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে (১০ মার্চ-১০ এপ্রিল) পুঁজিবাজার থেকে ২২ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই মূলধনের বড় অংশই ব্যাংকের সঞ্চয়ে বিনিয়োগ হয়েছে। আবার কেউ কেউ শেয়ার বিক্রি করে মূলধন জমা রেখে বাজার পর্যবেক্ষণ করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, তারল্য সংকট কাটাতে চড়া সুদে আমানত সংগ্রহ করছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। ৬ শতাংশ হারে আমানত সংগ্রহ আর ৯ শতাংশে বিতরণের ঘোষণাকে পাত্তা না দিয়ে কেউ কেউ ৯ শতাংশের বেশিতে আমানত সংগ্রহ করছে। আর ঋণ বিতরণ করছে ১৫-১৮ শতাংশে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মার্চ মাসের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৪১টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে ১১টি গত মাসের চেয়ে আমানত সংগ্রহের হার বাড়িয়েছে। মেয়াদি আমানতে ৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০.২৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত সংগ্রহ করছে তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৩১টি ব্যাংক তাদের ঋণের গড় সুদহার বাড়িয়েছে। আগের মাসে ঋণের সুদহার বাড়িয়েছিল ২৮টি ব্যাংক। আর ডিসেম্বরে বাড়ায় ২৭টি ব্যাংক। সর্বশেষ মার্চ মাসেও ছয়টি ব্যাংক তাদের ঋণের সুদহার বাড়িয়েছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, ‘দুর্বল আইপিও এবং তালিকাভুক্তির পর আশানুরূপ লভ্যাংশ না পাওয়ায় পুঁজিবাজারে আস্থা হারিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। ওদিকে তারল্য সংকটে ব্যাংকগুলো বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে ভালো মুনাফা না পাওয়ায় ব্যাংকের সঞ্চয়ে ফিরছে।’

ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন অ্যান্ড সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, ‘আমানতে সুদের হার বাড়লে পুঁজিবাজারে আঁটসাঁট অবস্থার সৃষ্টি হয়। ব্যাংকে সঞ্চয়ে ১০-১২ শতাংশ সুদ পাওয়ায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে পুঁজিবাজারের মূলধন বেরিয়ে যাচ্ছে। কারণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে কিছুটা ঝুঁকি থাকে, যেটা ব্যাংক সঞ্চয়ে থাকে না।’

মন্তব্য