kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

ব্যাংক খাতে আমূল সংস্কারে আসছে আইএমএফ

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভা

আরিফুর রহমান, ওয়াশিংটন থেকে    

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০৮:১৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্যাংক খাতে আমূল সংস্কারে আসছে আইএমএফ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে বসন্তকালীন সভার প্রথম দিনে অর্থনীতিবিদরা যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতি-কৌশল নিয়ে আলোচনা করছিলেন, সামনে তখন চলছিল ব্যাপক বিক্ষোভ। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পরিবেশকর্মীরা স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ বন্ধ করা হোক’ বলে। বিক্ষোভকারীদের বিশেষ দাবি, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জাপান সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করছে, পরিবেশের জন্য যা মারাত্মক হুমকি। ওই সব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। এই দুর্বলতা কাটাতে আমরা আইএমএফের সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আমাদের ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে। তারা একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে পাঠাবে। এ ছাড়া এ বছর আইএমএফের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে যাবেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। আমাদের ব্যাংক খাতে যেসব সমস্যা আছে সেসব সমাধানে তাঁরা কাজ করবেন। আর্থিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে তাঁদের সহযোগিতা নেওয়া হবে। মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যাংকের আধুনিকায়নে কোন জায়গা থেকে সফটওয়্যার নেব, তাঁরা তা বলে দেবেন। সফটওয়্যার ব্যবহারে দক্ষ জনবল তৈরিতে তাঁরা সহযোগিতা করবেন।’

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বসন্তকালীন সভার প্রথম দিনে ব্যস্ত সময় পার করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির, অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মনোয়ার আহমেদ, বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা। দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে ভ্যাটের একক হার বসাতে আইএমএফের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভ্যাটের একক হার ১৫ শতাংশ বাস্তবায়ন কঠিন। বিষয়টি আমরা আইএমএফকে জানিয়েছি, এক স্তর হার ভ্যাট বসালে তা কার্যকর করা কঠিন হবে। আমরা তিন স্তরবিশিষ্ট ভ্যাটের হার করতে যাচ্ছি, যা হবে ৫ শতাংশ, সাড়ে সাত শতাংশ এবং ১০ শতাংশ। আমাদের যুক্তি আইএমএফ মেনে নিয়েছে। আমরা আইএমএফকে বলেছি, এক স্তরবিশিষ্ট ভ্যাট কেবল উন্নত বিশ্বে বাস্তবায়ন সম্ভব। আমাদের মতো উদীয়মান দেশগুলোয় এখনই বাস্তবায়ন করা যাবে না। জনগণ এই হার মানবে না। আমাদের কথা শোনার পর আইএমএফ জানিয়েছে, আমাদের প্রস্তাবে তারা রাজি।’

২০১২ সালে যে ভ্যাট আইনটি করা হয়েছিল, সেটি আইএমএফের তৈরি করে দেওয়া।

আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ব্যাংকিং খাত পুরোপুরি অনলাইনে চলে গেলে অপরাধ অনেক কমে যাবে। এক জায়গায় বসে সব ধরনের তথ্য পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, যারা ঋণখেলাপি তাদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা থাকবে না। তারা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারবে না। কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যাঁরা ঠিকমতো পরিশোধ করেন, ভালো ব্যবসায়ী তাঁরা সব ব্যাংক থেকেই ঋণ নিতে পারবেন। ব্যাংকিং খাত অটোমেশনে গেলে এসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এতে করে ব্যাংকিং খাতে অপরাধ কমে যাবে। খেলাপি ঋণের হারও কমে যাবে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ হ্যান্স টিমার। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যেভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে সেইভাবে রপ্তানি হচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের বিদ্যমান অবকাঠামোতেই দুই-তৃতীয়াংশ রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। হ্যান্স টিমার বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কত শতাংশ হলো, সেদিকে নজর না দিয়ে বরং প্রবৃদ্ধির উেসর দিকে নজর দেওয়া দরকার। বিশেষ করে টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি রপ্তানি খাতকে বেশি গুরুত্ব্ব দেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখতে হলে রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, মুদ্রার মান কমে যাবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বিরূপ প্রভাব পড়বে। ফলে প্রবৃদ্ধি টেকসইভাবে ধরে রাখা কঠিন হবে। প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে নানা বিতর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, অনুমান সব সময় মিলবে—এমনটি নয়। প্রবৃদ্ধি ৮ নাকি ৭ শতাংশ হলো সেটি গুরুত্ব্বপূর্ণ নয়, গুরুত্ব্বপূর্ণ হলো এই প্রবৃদ্ধি কিভাবে অর্জন হচ্ছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।

দেশের রপ্তানি বাড়াতে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব্ব দিয়ে হ্যান্স টিমার বলেন, বাণিজ্য উদারীকরণ ও বাজারভিত্তিক মুদ্রাবিনিময় হার প্রবর্তন করতে হবে এবং বাণিজ্যের করহার কমিয়ে আনতে হবে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ফ্রেন্ডস ফর দি আর্থের প্রতিনিধি ক্যাট দি অ্যাঞ্জেলিস বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিভিন্ন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে সদস্যভুক্ত দেশগুলোয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়ন বন্ধ করেছে। আমরা চাই, জাপান সরকার যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন না করে।’

অয়েল চেঞ্জের সিনিয়র ক্যাম্পেইনার অ্যালেক্স দোকাস বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। সেখানে বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছে, যেসব প্রকল্পে জাপান, ভারতসহ কয়েকটি দেশ অর্থায়ন করছে। আমরা চাই, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য এসব বিনিয়োগ বন্ধ হোক।’

মন্তব্য