kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

পাট খাত দাঁড়াচ্ছে না দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনায়

এম সায়েম টিপু    

১০ এপ্রিল, ২০১৯ ১০:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পাট খাত দাঁড়াচ্ছে না দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনায়

৬০ দেশে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে

দেশে-বিদেশে পাটজাত পণ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় থমকে পড়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই খাত। ফলে এ খাতের উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনা বা প্রণোদনাও কাজে লাগছে না। অসাধু কর্মকর্তারা লোকসান দেখিয়ে অল্প দামে পাটকল ও এর জমি বিক্রির টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা আরো জানান, দেশের পাটশিল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সরকারের প্রণোদনায় ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না এই খাত। তাই পাটকল শ্রমিকদের মজুরি বাড়ালে মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এমন অজুহাতে শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত মজুরিও বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত পে কমিশনের মজুরি এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। ফলে গত ২ এপ্রিল থেকে সারা দেশের ২৬টি পাটকলের প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ ৯ দফা দাবিতে মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছে।

মাত্র কয়েক দশক আগেও পাটশিল্প বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় খাত ছিল। তবে বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকের চাহিদা বাড়ার ফলে পাটের চাহিদা কমতে থাকে। বর্তমানে এর চাহিদা আবারও বাড়ছে। বিশ্বের ৬০টি দেশে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের রপ্তানি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের বেশি।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশ বিশ্বের মোট পাটের ৫০ শতাংশ উৎপাদন করে। বিশ্বের মোট কাঁচা পাট রপ্তানির ৭৮.৫৪ শতাংশই হয় বাংলাদেশ থেকে। অন্যদিকে ভারত ৪৯ শতাংশ কাঁচা পাট উৎপাদন করলেও তারা কাঁচা পাট রপ্তানি করে না। অর্থাৎ ভারত স্থানীয়ভাবে পাটের ব্যবহার ও বহুমুখীকরণে জোর দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রেজাকুজ্জামান রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পাটক্রয়ের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ঠেকানো না গেলে দেশের সম্ভাবনাময় এই শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ কম। তিনি বলেন, সরকারের আমলাদের এই অব্যবস্থাপনার ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। কোনো কোনো শ্রমিক ৮-১০ সপ্তাহ পর্যন্ত বকেয়া মজুরি পান না। সঠিক সময়ে কাঁচা পাটের অভাবে মিলগুলো উৎপাদনে যেতে পারে না।

শ্রমিক নেতা রতন আরো বলেন, দেশে ৭৮টি বেসরকারি পাটকল লাভজনকভাবে চলতে পারলে ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা সরকারকে চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কেন। কারণ জুলাই মাসে পাট কেনার মৌসুম হলেও সরকারের কর্মকর্তারা টাকা ছাড়ে দেরির অজুহাতে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে গিয়ে পাট কেনেন। ফলে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় যে পাট কেনা যায়; তা শতভাগ বেশি দিয়ে ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকায় ক্রয় করেন। এতে লোকসান দেখিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বন্ধ করে দেওয়া যাবে। আর বন্ধ কারখানার বিশাল জমি কম দামে বিক্রি করে ওই টাকা হাতিয়ে নিতে পরিকল্পিতভাবে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করা হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।

এদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের উদ্যোক্তারা পাট খাত থেকে ২৩৫ ধরনের পাট পণ্য উৎপাদন করছে, যা আরো বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে পাট থেকে তৈরি কার্পেটের বিপুল চাহিদা রয়েছে। পাটের জিও টেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ৭১৬ কোটি টাকার পাট থেকে তৈরি জিও টেক্সটাইলে ব্যবহার হতে পারে। পাল্প, পেপার ও রেয়নভিত্তিক পাট শিল্পের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। একই সঙ্গে সোনালি আঁশের ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

ডিসিসিআইয়ের পরিচালক রাশেদুল করিম মুন্না কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের পাটশিল্পের এখনো বিপুল সম্ভাবনা আছে। পরিকল্পিতভাবে সরকারি পাটকলগুলোতে উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা সমন্বয় করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যে চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া সারা বিশ্বে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের উল্লেখ করে মুন্না জানান, ভোগ্য পণ্যের বাজারে প্রতিবছর ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে ন্যাচারাল প্রডাক্টের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া চলতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৮০ শতাংশ প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারে নিরুৎসাহিতকরণে আইন পাস করেছে। ২০২০ সাল থেকে সারা ইউরোপে একযোগে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে। সেখানে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার হয়। এর বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশে পাটের ব্যাগের বিপুল সম্ভাবনা আছে বলে তিনি মনে করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স দেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান সঞ্চালকের কাজ করছে। কিন্তু শতভাগ মূল্যে সংযোজন হয় দেশের পাট খাত থেকে। তাই এই খাতের উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় প্রণোদনা এবং নজরদারি বাড়ানো গেলে পোশাক খাতের পর দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পাট খাত।

মন্তব্য