kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

কর্ণফুলী নদীর নিচে দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু টানেল

টানেল ঘিরে শিল্প বিপ্লবের স্বপ্ন

প্রথম বছরেই ৬৩ লাখ গাড়ি চলবে এই টানেল দিয়ে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম    

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৪:১০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টানেল ঘিরে শিল্প বিপ্লবের স্বপ্ন

ফাইল ফটো

এশিয়ার সবচেয়ে বড় খনন মেশিন (টিবিএম) দিয়ে শুরু হয়েছে দেশের প্রথম এবং স্বপ্নের টানেল নির্মাণের মূল কাজ। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ থেকে সর্বনিম্ন ১৫ মিটার গভীরে চলবে এই খননকাজ। নদীর নিচে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল হবে চার লেনের। দুটি টিউব দিয়ে চলবে এই গাড়ি। আগামী ২০২২ সালেই এই টানেল দিয়ে গাড়ি চলাচল শুরু হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল রবিবার সুইচ টিপে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বপ্রথম এই টানেল নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আর নামকরণ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল’।

এই টানেল চট্টগ্রাম নগরীর মূল শহরের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর অপর পার আনোয়ারা উপজেলাকে সরাসরি যুক্ত করবে এবং দুপারে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করবে। আর এই টানেল ঘিরে পিছিয়ে থাকা আনোয়ারা এলাকায় শিল্পায়নে বিপ্লব হবে। বর্তমানে আনোয়ারা প্রান্তে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কোরিয়ান ইপিজেড ঘিরে বিশাল বিনিয়োগ হবে।

শুধু তাই নয়; বঙ্গোপসাগর উপকূল ঘিরে পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হবে ও ব্যাপক রাজস্ব আয় বাড়বে এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।

টানেলের প্রকৌশলীরা বলছেন, নদীর এই প্রান্ত থেকে আনোয়ারা প্রান্ত পর্যন্ত সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের খননে সময় লাগবে দুই বছর। খননের পর মাটি সরিয়ে বসানো হবে সিমেন্টের তৈরি সেগমেন্ট; সেগুলো চীন থেকে এরই মধ্যে পতেঙ্গা প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। এরপর চার লেনের দুটি টিউব বসানো হবে; যেটা দিয়ে গাড়ি চলবে ৮০ কিলোমিটার গতিতে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতি মাসে কাজের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২০ শতাংশ, আমরা করছি ৩০ শতাংশ। যে গতিতে কাজ এগোচ্ছে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আগামী ২০২২ সালেই এই টানেল দিয়ে গাড়ি চলবে।

জানতে চাইলে টানেল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী পতেঙ্গায় তাঁর কার্যালয়ে বসে কালের কণ্ঠকে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রায় ১২ মিটার ব্যাসের এই টিবিএম মেশিন চালানোর জন্য চীনা প্রকৌশলীরা পুরোপুুরি প্রস্তুত। স্থলভাগ থেকে অটোমেটেড মেশিনে এই খননকাজ চালানো হবে। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার নিশ্চয়তা পেয়েছি আমরা।

তিনি বলেন, টানেলের মূল কাজ হচ্ছে নদীর নিচে খনন। দুটি টিউব খননকাজ করতে সময় লাগবে দুই বছর। খননের সঙ্গে সঙ্গেই সিমেন্টের তৈরি সেগমেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটির সঙ্গে আরেকটি সংযুক্ত করা হবে; যা নিয়ন্ত্রিত হবে কম্পিউটারের মাধ্যমে।

প্রকৌশলীরা বলছেন, নদীর নিচে মাটি খননের পর একটার সঙ্গে একটা সিমেন্টের তৈরি সেগমেন্ট বসিয়ে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল তৈরি হবে। সেই সেগমেন্ট তৈরি হচ্ছে চীনের কারখানায়। মোট ১৯ হাজার ৭০০ সেগমেন্ট বসানো হবে; এর মধ্যে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে দুই হাজার ২৪০টি।

জানা গেছে, টিবিএম মেশিনটি সোয়া ১২ মিটার ব্যাস বা গোলাকার আর চারতলা ভবনের সমান উঁচু। ২২ হাজার টন ওজনের এই বোরিং বা খনন মেশিন এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড়। চীনের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা মেশিনের মধ্যে বসেই নদীর নিচে মাটি কেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সরিয়ে স্থলভাগে নিয়ে আসবেন। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে টিবিএম মেশিনটি চীন থেকে পতেঙ্গায় পৌঁছে। চীন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আসা মেশিনটি যুক্ত করে চালু করতে সময় লেগেছে দুই মাস।

জানা গেছে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের জিটুজি মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে; যাতে চীনের এক্সিম ব্যাংক আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের বেশির ভাগই আর্থিক সহায়তা চীনের। প্রকল্পে চীনের প্রকৌশলীসহ ৫৫০ জন এবং দেশের ১২০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং বাংলাদেশে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এরপর অর্থছাড় নিয়ে নানা জটিলতা কাটিয়ে ২০১৮ সালে প্রকল্প নির্মাণে গতি পায়।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ী ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি এমন না যে শুধু চট্টগ্রাম লাভবান হবে। মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত যোগাযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এসব এলাকা ঘিরে পর্যটন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হবে। নদীর ওপারে ভারী শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। তবে সেটি রাতারাতি গড়ে উঠবে না।’

সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সাগর পার দিয়ে বিকল্প মহাসড়ক নির্মাণ এবং পরবর্তী সময় যা মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। এর ফলে চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক করিডর।

প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য জাফর আলম বলেন, মহেশখালী ঘিরে সরকার যে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তার সুফল পেতে বিকল্প মহাসড়ক দরকার। আর টানেলের মাধ্যমেই প্রথমে আনোয়ারা, বাঁশখালী পরে চকরিয়াসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোর বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা এখনো কেউ আঁচ করতে পারছে না।

টানেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীর ওপারে বিনিয়োগ সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হবে। বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর ওপারে আংশিক চালু রয়েছে কোরিয়ান ইপিজেড। এর পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। টানেল নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার আনোয়ারার একটি ইকোনমিক জোন স্থাপন করছে। এর পাশাপাশি চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ‘চায়না ইকোনমিক জোন’ বাস্তবায়িত হচ্ছে।

চট্টগ্রামে টানেল নির্মাণকাজ শুরু করায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘টানেল নির্মাণের ফলে কর্ণফুলীর ওপার ঘিরে বিনিয়োগের নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হবে। এটিকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল হবে সেখানে। আর এশিয়ান হাইওয়ে ও নতুন সিল্ক রুটে প্রবেশ করবে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক করিডর।’

টানেলের ফিজিক্যাল স্টাডি প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কম্পানি (ফোর সি) এবং হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অভি অরূপ অ্যান্ড পার্টনার্স লিমিটেড বলছে, চালুর প্রথম বছরেই ৬৩ লাখ গাড়ি চলবে এই টানেল দিয়ে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা