kalerkantho

রবিবার । ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৩ জুন ২০২১। ১ জিলকদ ১৪৪২

গ্রন্থমেলায় সাব্বির খানের কবিতার বই ’একদা যুবকের ফিরে না আসার গল্প’

অনলাইন ডেস্ক   

২৯ মার্চ, ২০২১ ২১:২৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গ্রন্থমেলায় সাব্বির খানের কবিতার বই ’একদা যুবকের ফিরে না আসার গল্প’

গ্রন্থমেলা-২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে লেখক ও সাংবাদিক সাব্বির খানের কবিতার বই ‘একদা যুবকের ফিরে না আসার গল্প’। বইটি প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি প্রকাশনা সংস্থা। প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী মিস্ত্রি এবং অলংকরণ করেছেন সঞ্জিব সাহা। ৬৪ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত কবিতার বইটির দাম ১৩৫ টাকা। বইটি গ্রন্থমেলার ১৬ নম্বর প্যাভিলিয়নে পাওয়া যাচ্ছে। 

কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে প্রকাশিত কবিতার বইয়ের ব্যাপারে সাব্বির খান বলেন, ’প্রথম কবিতা অথবা কবিতার প্রথম লাইনটি কবে লিখেছিলাম, মনে করতে পারছি না। কেন লিখেছিলাম? তা অবশ্য মনে আছে। সেদিকে না-ই বা গেলাম। কথা হচ্ছে, এটা আমার প্রথম কবিতার বই যা মলাটবদ্ধ হচ্ছে। এর আগে অবশ্য আমার আরো চারটি বই মলাটবদ্ধ হয়েছিল। তিনটি প্রবন্ধ আর একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক বই। আগের বইগুলোর সঙ্গে এবারের কবিতার বইয়ের প্রকাশ সম্ভবত আমার পাঠকরা মেলাতে পারবেন না। না পারারই কথা। অনেকদিন থেকে এই ভাবনাটি আমাকেও ভাবিয়েছে। নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার অদম্য ইচ্ছে বার বার আমাকে থমকে দিয়েছে। প্রশ্ন করেছি, নিজেকে আমি কিভাবে দেখতে চাই? প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, সাংবাদিক, বিশ্লেষক, গবেষক অথবা কবি? অনেক আত্মসমালোচনা, নিজের সঙ্গে নিজের তর্ক-বিতর্ক আর বিশ্লেষণ শেষে সিদ্ধান্ত পেলাম- আমি তো শুধুই একজন লেখক। লেখালেখি যার পথ্য, আর কলম যার অস্ত্র, তাকে তো লেখকই বলে। কলম থেকে কখনো বের হয় প্রবন্ধ, কখনো রিপোর্ট, কখনো বিশ্লেষণ অথবা কবিতা। কি লিখবো তা সব সময় পূর্ব নির্ধারিত নয় বলেই হয়ত সেগুলো কখনো হয় প্রবন্ধ, কখনো কলাম-বিশ্লেষণ অথবা কবিতারূপে প্রকাশ পেয়েছে। আর লেখালেখির সে পথ ধরেই বাছাইকৃত কিছু লেখাকে মলাটবদ্ধ করার প্রয়াস, যাকে বলা যায় ’কবিতার বই’।’ 

বই প্রসঙ্গে সাব্বির খান আরো বলেন, ’একদা যুবকের ফিরে না আসার গল্প’ আমার কবিতাগুলোর মধ্যে একটা বিশেষ কবিতার নাম বা শিরোনাম। কবিতাটি লিখেছিলাম আশির দশকের শেষের দিকে, যার প্রেক্ষাপট আমার এখনো চোখে ভাসে। অস্ত্রের মুখে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ৯টি বছর দাপিয়ে বেড়িয়েছিল ‘এরশাদ’ নামের হিংস্র একটা দানব। ছাত্র হত্যা করত গুলি করে, জেলে অত্যাচার করে, মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে। জাতির একটা প্রজন্মের ৯টি বছর নির্বিচারে নষ্ট করেছিল ঘৃণ্য সেই সামরিক শাসকের অপচ্ছায়াটি। সেই প্রজন্মটি কখনো দুচোখ এক করতে পারেনি; ঘুমোতে পারেনি ৯টি বছর। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থেকেছে মাসের পর মাস। শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষার দিনরাতগুলো একাকার হয়েছে দুঃস্বপ্নের বেড়াজালে। একটা প্রজন্মকে দিকহীন করা হয়েছে বারবার, যখন-তখন, উর্দির খেয়াল খুশিতে। স্কুল-কলেজগুলো বিতণ্ডতায় বন্ধ হলেই আমরা তখন বলতাম, ‘এরশাদ ভ্যাকেশন’। কেবলমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সেই ৯টি বছর প্রবেশাধিকার ছিল না তার। আমরা তার নাম রেখেছিলাম ‘স্বৈরাচার’। শুধু সে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতি তার ছিল আজন্মের ঘৃণা আর আক্রোশ। সেই ঘৃণা থেকেই ছাত্রদের দিকে রাইফেল তাক করে নির্বিচারে গুলি চালাতে তার বুক কাঁপত না কখনো। আমি সেই প্রজন্মেরই সন্তান। সে সময়ে লেখা ‘একদা যুবকের ফিরে না আসার গল্প’ কবিতাটির শিরোনামেই শয্যা পাতার প্রয়াস পেয়েছি এই বইয়ের মলাটে!

‘একদা যুবকের ফিরে না আসার গল্প’ বইয়ের ফ্ল্যাপে কবি মো. নুরুল হুদা মন্তব্য করেছেন-, ‘‘বিশ্ববাঙালি কবি সাব্বির খান কবিতায় এক না ফেরা যুবকের গল্প বলেছেন। কবির প্রথম কাজ প্রার্থিত শব্দটি আয়ত্ব করা। সেই শব্দের জন্য তার ধ্যান ও ধারণা প্রায়শ নীরবতায় পর্যবসিত হয়ে যায়। তাই তিনি একটি শব্দের জন্য বহুদিন নীরব ছিলেন। তারপর সেই শব্দ দিয়েই তাতে বুনলেন সেই লেখালেখির জন্য শাড়ি যার আঁচলে কমলার ঠোঁট আর শরীর ও মনে সুখ-দুঃখের নিবিড় নিসিথ যা তার দেহবীণার তন্ত্রে তন্ত্রে শিশিরের সুর হয়ে বেজে চলেছে। কবিতার মূল উপদান, বিষয় শৈলী সুন্দর, সত্য ও সৃষ্টিকুশলতা তা তিনি আয়ত্ব করেছেন শ্রেষ্ঠ শব্দের শ্রেষ্ঠ বিন্যাসের মাধ্যমে। ব্যাকরণের ছন্দের চেয়েও মুক্ত কথনে তিনি অনেক পারঙ্গম। তবে উপমার যে কবিত্ব, তা এই জীবনানন্দীয় সত্য তার কবিতায় আরেকবার সুপ্রতিষ্ঠিত। আমি এ কারণে বিশ্ববাঙালি কবির শৈল্পিক সাফাল্য কামনা করি”। 

সাব্বির খান ১৯৬৬ সালে ৩০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস গোপালগঞ্জে। ১৯৮৪ সালে নারায়নগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৬ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে নজরুল সংগীতের ছাত্র ছিলেন। স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়তার কারণে তিনি এরশাদ সরকারের কোপানলে পড়ে ১৯৮৯ সালে দেশত্যাগে বাধ্য হন এবং সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন। ২০০২ সালে সুইডেনের ওরেব্রু ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ডিগ্রি লাভ করেন। 

পদাতিক নাট্য সংসদ ছাড়াও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে আশির দশকে স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে গণসংগীত ও পথ নাটককর্মী হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সহায়ক শক্তি হিসেবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য করতে এবং বিদেশে জামায়াত-বিএনপির দেশবিরোধী চক্রান্ত প্রতিরোধে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় ‘সাব্বির খান’ অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে নজরুল সংগীত শেখার পাশাপাশি তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতে দীর্ঘদিন তালিম নেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক ও কলামিস্ট হিসেবে পাঠক মহলের গ্রহণযোগ্যতায়ও তিনি সমৃদ্ধ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘দ্য হাফিংটন পোস্ট’ ও ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা ছাড়াও বাংলাদেশের জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ অবজারভার, দ্য এশিয়ান এইজ এবং অনলাইনের বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। সুইডেন পরারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত সাংবাদিক হিসেবে ‘দ্য ফরেন প্রেস এসোশিয়েশন-সুইডেন’ ছাড়াও ‘সুইডিশ পেন’র একজন সদস্যও তিনি।

২০১৭ সালের একুশে গ্রন্থমেলায় তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণাত্মক কলাম সংকলণ ‘পোড়া মৃতদেহের রাজনীতি ও সময়ের গল্প’ বইটি অনিন্দ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হয়। ২০১৯ ও ২০২০ সালের বইমেলায় বর্ষাদুপুর প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হয় তাঁর তিনটি বই, ‘ইউরোপের চিঠি’, ‘মানচিত্র যখন দাবার ঘর’ এবং ‘রাজনীতির গ্যাড়াকলে ধর্ম’।



সাতদিনের সেরা