kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৪ জুন ২০২০। ১১ শাওয়াল ১৪৪১

লেখকের মেলা

শুধু ‘বইয়ের বাণিজ্য মেলা’ নয়

জাকির তালুকদার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১১:৪০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শুধু ‘বইয়ের বাণিজ্য মেলা’ নয়

কোনো উৎসব যখন পার্বণে পরিণত হয় তখন তা হয়ে যায় জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। আমাদের একুশের বইমেলা সেই অবস্থানে পৌঁছে গেছে। আমরা বলি যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আমাদের এই বইমেলা। এক মাস ধরে পৃথিবীর কোথাও বইমেলা চলে না। ত্রুটিবিচ্যুতি যে নেই, এমন কথা বলা যাবে না। অনেক ঘাটতি আছে। অনেক অনিয়ম আছে। অনেক অপূর্ণ প্রত্যাশা আছে। কিন্তু তার পরও এই বইমেলা আমাদের কাছে অনেক গুরুত্বের বিষয় হয়ে উঠেছে।

যতখানি চোখে দেখা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্য অর্জন করেছে আমাদের এই বইমেলা। অনেকের কাছেই বইমেলা শুধু বই বিক্রির মেলা। তা ধরলে এটিকে তো বলা যায় ‘বইয়ের বাণিজ্য মেলা’। কিন্তু বই বিক্রি করাতেই সীমাবদ্ধ নেই এই মহাযজ্ঞ।

এখানে সারা দেশ থেকে লেখক-কবিরা আসেন। পাঠক আসেন। বিদেশ থেকে প্রবাসী অনেকেই দেশে আসার সময় হিসেবে বেছে নেন এই মাসটিকে। বইমেলা ঘিরে মানুষের এই একত্র হওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খণ্ড খণ্ড আলোচনা, বিতর্ক, মতবিনিময় থেকে গড়ে ওঠে কিছু কর্মসূচি, কিছু পাঠচক্র, কিছু নতুন পত্রিকা। আলোচনা শুধু বই নিয়ে নয়; দেশ নিয়ে, জাতি নিয়ে, আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ নিয়ে, তেল-গ্যাস-সুন্দরবন নিয়ে। সর্বোপরি দেশের জন্য কার্যকর কিছু কাজে বা আন্দোলনে কিভাবে আরো ভালোভাবে ভূমিকা পালন করা যায়, তা নিয়েও। এসব আলোচনা-মতবিনিময় থেকেই একদিন সূচনা হতে পারে সত্যিকারের বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথনির্দেশক কোনো কর্মসূচি। হয়তো বইমেলার সবচেয়ে ফলপ্রসূ অবদান হয়ে উঠবে সেটিই।

আপাতত আমি এমন একটি বইমেলা চাই, যেখানে যাওয়ার ইচ্ছা সব সময় ক্রিয়াশীল থাকবে মানুষের মনে।

আর বইমেলায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তার কপাল থেকে মুছে যাবে দুশ্চিন্তার সব আঁকাবাঁকা রেখা। বইয়ের সৌরভ তাকে স্বাগত জানাবে, সব সময় সঙ্গে থাকবে তার। নিরাপত্তাহীনতার ভীতি বিন্দুমাত্র ঢোকার সুযোগ থাকবে না তার মনে। মানুষ সেখানে পরিচিত হবে অচেনা বইয়ের সঙ্গে। অচেনা মানুষের সঙ্গে। নির্ভয়ে মতবিনিময় করবে, তর্কবিতর্কও। সেই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকবে বই, নন্দনভাবনা, দর্শনচিন্তা। মতবিনিময়-বিতর্ক বই পাঠের মতোই ঋদ্ধ করবে তাদের। বিতর্কের শেষে বা মাঝপথে তারা একসঙ্গে যাবে চায়ের সন্ধানে।

আমি এমন বইমেলা চাই, যেখানে কোনো লেখককে সংকুচিত থাকতে হবে না ঘাতকের চাপাতির ভয়ে। কোনো কর্তৃত্বকারী সংস্থার রক্তচক্ষু নিয়ে ভাবনাকুল থাকতে হবে না তাঁকে। আতঙ্ক থাকবে না বই নিষিদ্ধ হওয়ার। কোনো বই-ই সব ধরনের মানুষের জন্য স্বস্তিকর হয় না। অনেকেরই লালিত সংস্কার এবং প্রচলিত চিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কোনো কোনো বই। এই প্রশ্নের অধিকারকে রুদ্ধ করে দিলে রুদ্ধ হয়ে যায় জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথ। কোনো বই কারো কাছে অস্বস্তিকর মনে হলে তিনি পাল্টা বই লিখবেন। যাবেন না থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাছারি করতে। অশালীন, নিম্নমানের বইও নিষিদ্ধ হবে না। তবে পাঠক বয়কট করবেন তাকে।

আমি এমন বইমেলা চাই, যেখানে ভিড়ের সুযোগ নিয়ে নারীর শরীরের দিকে এগিয়ে যাবে না কোনো কামুক হাত। নারী উপভোগ করতে পারবে বইমেলার নির্মল আনন্দ। কোনো শিশুর ভয় থাকবে না ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার।

হাজার হাজার দুর্বল বই প্রকাশিত হয় প্রতিবছর। তাদের বিজ্ঞাপন এবং প্রচারে বিভ্রান্ত হন পাঠক। তাই পাঠককে সঠিক বইটি চিনিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে কাউকে না কাউকে। হতে পারে সেটি আয়োজক সংস্থা, হতে পারে ঋদ্ধ পাঠকের কোনো সংগঠন। তারা প্রতি সপ্তাহে মেলায় আসা ভালো বইগুলো চিহ্নিত করে পাঠককে উদ্বুদ্ধ করবে সেসব বইয়ের সঙ্গ-উন্মুখ হতে।

জানি, এ ধরনের বইমেলা শুধু আয়োজকদের সদিচ্ছা দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। দরকার একটি সুস্থ রাষ্ট্রের। সুস্থ সমাজের। সেই কাজটিও বইমেলা থেকেই শুরু হতে পারে একদিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা