kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নওশাদ জামিলের কবিতা : প্রার্থনার আবহে প্রেমের অনুসন্ধান

নাসিম হাসান   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১২:৩৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নওশাদ জামিলের কবিতা : প্রার্থনার আবহে প্রেমের অনুসন্ধান

পৃথিবীতে পদার্পণ কিংবা প্রন্থান, নিতান্তই একা। অবিকল প্রার্থনার মতো, নৈশব্দের নিঃসঙ্গতা। উপরন্তু এই নৈশব্দের মাঝে আকস্মিক বর্ণিল ঝংকারে জীবনটা রাঙিয়ে তোলে প্রেম। একাকিত্ব, নৈশব্দ আর প্রেম-প্রার্থনার নির্যাসটুকুর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক একটি কাব্যশরীর। চিরায়ত কাব্য-জীবনের এই মিশ্র ছাঁচে গড়া বিশিষ্ট কবি ও লেখক নওশাদ জামিলের কাব্যসংকলন 'প্রার্থনার মতো একা'। তবে তার সব কবিতা কেবল প্রেম-প্রার্থনায় পূর্ণ নয়; অনেকে আবার হয়ে উঠেছে দ্রোহরসে পুষ্ট কিংবা দুঃখবাদের করুণ কণ্ঠস্বর।

প্রায় দুই দশকের কাব্যচর্চায় দক্ষ নওশাদ জামিলের কাব্য-কুশীলবের সৃজন 'প্রার্থনার মতো একা'। বিগত দুই দশকে তার কাব্যানুসন্ধানের অভিজ্ঞানকে কালো অক্ষরে সাজিয়েছেন ছন্দের মৃদুলতায়। তুলে এনেছেন বাংলার শ্যামল প্রকৃতি, ঘুটঘুটে অন্ধকারের আলোর জোনাকি, ছেঁড়া মেঘ, দলছুট পাখি। আবার দ্রোহের সুরে পঙক্তি সাজিয়ে রূপায়িত করেছেন সমকালকে।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ প্রকাশিত হয়েছে নওশাদ জামিলের কবিতার বই 'প্রার্থনার মতো একা'। বইটিতে দুইভাগে। প্রথম ভাগে দুজন অসমসাহসী নুসরাত আর আবরারে'র শিরোনামে প্রারম্ভিক দুটি কবিতা, তারপর অনুক্রমিক- অতলের বাঁশি, পথের বাঁকে, ইশারালিপি, মমির মাধুরী মাধুরী ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়েছেন বেশ কিছু কবিতা। তারপর এনেছেন আরেকটি অধ্যায়ের অবতারণা 'দশপদী দশটি কবিতা'। কবি দেখিয়েছেন ছন্দ চয়নের মুন্সিয়ানা। এমন ধাঁচের অভিনব বিন্যাস কাব্যগ্রন্থটিকে এনে দিয়েছে আলাদা এক নতুনত্ব।

জীবনানন্দের ভাষায়, "কবির সিদ্ধি তার নিজের জগতে, কাব্যসৃষ্টির ভিতর"। সেদিকের বিবেচনায়, নওশাদ জামিলের কবিতা পাঠান্তে কবিকে 'সিদ্ধি কবির' তিলক পরিয়ে দিতে তিলমাত্র বিলম্ব করবেন না পাঠক।

নওশাদ জামিলের কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়, সর্বত্র অপ্রাপ্তির বেদনা। তিক্ততায় ছুঁয়ে যায় কবিসত্তা; বিষাদে ভরিয়ে তোলে অন্তর। মনস্তাপগুলো জমতে জমতে বুকে বান্ধে দুঃখের গিরি। হাহাকার। শৈলচূড়ার সেই শূন্যতা নাশতে কবি অবলম্বন করেন আরেক শূন্যতার, নির্বাণলাভের, প্রার্থনার। একদিকে আশান্বিত কবি তিমির টুটে আশার জোনাক জ্বালান; অন্যদিকে তাঁর আত্ম-জিজ্ঞাসা:

"গহীনে তোমার বুকভরা দুঃখ নিয়ে
অন্ধকারে ফোটাও আলোর জোনাকি
ঝড়ের কবলে উড়ে যাবে ডালপালা
শেকড়ে জন্মাবে ফের— একথা জানো কি?"

(অতলের বাঁশি)

পার্থিবতার এই বিষাদ ছাপিয়ে আবার যখন আশা-রবির কিরণ ছড়িয়ে পড়ে, তখন কবির আত্ম নসিয়তের সুর তন্ময় হয়ে ওঠে।

"ও পরম, মর্মে যদি বিষাদের খনি
অসীমে বাজাও তুমি আনন্দের ধ্বনি।"

(অতলের বাঁশি)

কাব্যগ্রন্থের সর্বদীর্ঘ কবিতাটি পঞ্চশৎ পদ-বিযুক্ত- 'প্রেম ও প্রার্থনা'। ত্রিকাল পেরিয়ে একজন কবি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের চেয়ে বড়। গগনের নক্ষত্রের ন্যায় সত্যের সম্মুখে থাকেন জ্বলজ্বলে। কবির জয়গানে কবিবন্দনা মূর্ত হয়ে ওঠে।

"কবিকে প্রত্যয় দিয়ে পাঠান ঈশ্বর
তারা তো শেখায় ভালোবাসা অবিনশ্বর
সুর ও বাণীতে তারা নাচায় ত্রিকাল
কবির বিজয়রথে সাক্ষী মহাকাল"।
(প্রেম ও প্রার্থনা)

সাম্প্রতিক গদ্যরীতির বাহানায়; বাংলা কবিতার ছন্দসুষমাকে উল্লঙ্ঘন করে যথেচ্ছারে অকবিতা রচিত হচ্ছে। ঠিক তার বিপরীত মেরুতে নওশাদ জামিল ব্রতী হয়েছেন ধ্রুপদী রীতির কবিতা রচনায়। কবি তাঁর ভাব প্রকাশে ছন্দের শক্তিতে বিশ্বাসী। ছন্দ ছুঁয়ে গেছে তাঁর প্রতিটি কবিতায়। গ্রন্থের দশপদী অংশের সবগুলি কবিতা- ৪+৪+২ পদে বিন্যাস্ত। শেষ অংশে দশটি কবিতা রয়েছে, যার প্রতিটি দশ চরণের এবং অক্ষরবৃত্ত ছন্দে ১০ মাত্রায় রচিত। 

"কোনোদিন ডাকব না আর 
ছাতিমের গন্ধমাখা ভোরে
ঘুম যদি ভেঙে যায়, তবু
কোনোদিন জাগাব না তোরে।"

(রক্তধোয়া পথে)

মাত্রাবিন্যাস : ৮+২। পূর্ণ পর্ব আট মাত্রার।
অপূর্ণ পর্বটি দুই মাত্রার।
চরণটির ১ম চার পদে, ২য় ও ৪র্থ পদে মিল। মিলবিন্যাস যথাক্রমে- (ক,খ,গ,খ) আবার শেষের দুই পদের অন্ত্যমিল রক্ষিত। যার মিলবিন্যাস- (ঙ,ঙ)

"কোনোদিন বলব না তোকে
ছুটে আয় আমার এ বুকে!"

দশপদী কবিতাগুলোতে কবি নিষ্ঠার সাথে ছন্দের বৃত্তে বসত করেছেন; আবার কিছু কিছু কবিতায় ছন্দের বেড়া টপকে পুরোদস্তুর গদ্য কবিতা চয়ন করে, গ্রন্থের বৈচিত্র এনেছেন।

নওশাদ জামিল তাঁর সমকালে একজন কবিতার বনমালী, যিনি তাঁর প্রেমাকুল মোহন বাঁশিতে দুঃখবাদের সুর যেমন তুলতে পারেন; তেমনি পারেন ভালোবাসার। কবির অন্তর্জগৎ জুড়ে লুকিয়ে আছে প্রার্থনার স্বরূপ; কিন্তু চৈতন্যের অলিগলিতে মনস্তাপ ও প্রেমের আনাগোনা। 
নওশাদের কবিতার বড় গুণ এর গতিশীল চিত্রময়তা। ভাবনাগুলো বেঁধেছেন অন্ত্যমিলের অসাধারণ সব পঙক্তিতে।

"কিছু নদী ভুলভাবে এঁকেবেঁকে যায়
সব নদী সোজাভাবে সাগর কি পায়?"
কিংবা,
"পাথর বিছানো পথে কেউ কেউ যায়
কাঁটার আঘাত সয়ে ভালোবাসা পায়।"

সাহিত্য-সিন্ধুর বিশাল বেলাভূমি হতে মধুশব্দ কুড়িয়ে এনে, কবিতা-শরীর গড়ার এক প্রাতিস্বিক শব্দ কারিগর নওশাদ জামিল। পেশাজীবনের শুরু যার সাংবাদিকতায় আর শখের জীবনের শুরুটা গদ্য রচনায়। তবে সবকিছুর মূলে তার প্রেরণা জোগায় কবিতার অনুষঙ্গ। কাব্য প্রতিভার প্রাচুর্য নিয়ে সুগভীর নিষ্ঠার সাথে তাঁর যে সাহিত্য কর্মযজ্ঞ; তারই উৎকৃষ্ট ফসল 'প্রার্থনার মতো একা' কাব্যগ্রন্থ।  প্রার্থনার আবহে প্রেম, ভালোবাসা, মনস্তাপ, দুঃখবাদের প্রস্ফুটন ঘটেছে তাঁর প্রতিটি কবিতায়। একদিকে নুসরাতকে 'আগুন-নদীতে ডুবিয়ে' দেন, অন্যদিকে তার ছাইমুখ হতে 'দারুণ অনলপ্রভা' নিয়ে আধমরা দেশের দীপশিখা জ্বালান। ফাগুনের এক ঝরঝরে বিকেলে গভীর ভাবাবেগ, অনুরাগ নিয়ে একাকী নির্জনে 'প্রার্থনার মতো একা' কাব্যগ্রন্থটা মেলে ধরুন; অবাক হয়ে দেখবেন, কবিতাগুলো ক্ষণে ক্ষণে আপনার সকাশে কথা কয়ে উঠছে!


বইয়ের নাম: প্রার্থনার মতো একা
লেখক: নওশাদ জামিল
প্রকাশনী: অন্যপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য: ১৫০টাকা
ISBN: 978 984 502 611 6

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা