kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

প্রাণের মেলা

একুশে নিয়ে হাতে গোনা বই

আজিজুল পারভেজ    

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০৮:৩৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



একুশে নিয়ে হাতে গোনা বই

ভাষা আন্দোলন এবং একুশের মহান শহীদদের নিয়ে বাঙালির আবেগ এখনো সমুজ্জ্বল। শহীদ মিনার কিংবা বইমেলা অভিমুখে মানুষের ঢল অন্তত সে কথা প্রমাণ করে। বরাবরই মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সর্বাধিক জনসমাগম হয় একুশে ফেব্রুয়ারিতে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে সকাল ৭টা থেকে বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানমালা শুরু হয়। আর বইমেলার দ্বার খোলে সকাল ৮টায়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কিংবা আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের স্রোত মেশে বইমেলায়। ফলে গতকাল শুক্রবার শুরু থেকে জমজমাট হয়ে ওঠে বইমেলা। সন্ধ্যায় তা জনসমুদ্রে রূপ নেয়।

বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে সাড়ে সাত লাখ বর্গফুট এলাকার কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ভিড়ের চাপে দুই প্রবেশপথে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড জটলার।

গতকাল পরিবার-পরিজন, তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে হাজির হয়েছিল বইমেলায়। সাদাকালো শাড়ি, পাঞ্জাবি আর সালোয়ার-কামিজ পরা নারী-পুরুষ-শিশুর পোশাক-পরিচ্ছদে ছিল অমর একুশের চেতনার ছাপ। গালে, কপালে বর্ণমালা, শহীদ মিনার এঁকে তারা স্মরণ করেছে শহীদদের। বাবার কাঁধে চড়ে শিশুরাও এসেছিল সংস্কৃতির মেলা, জ্ঞানের মেলা, ভাষার মেলায়। এত ভিড়ে বই বিক্রিও নেহাত কম হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রকাশকরা। প্রকাশক-পাঠক-লেখকের এই সর্ববৃহৎ মিলনমেলায় শামিল হয়েছিলেন অনেক লেখকও। তবে ভিড়ের চাপে তাঁদের উপস্থিতি আলাদা করে বোঝার উপায় ছিল না।

কেমন হলো একুশের দিনের মেলা—এর জবাবে প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন বলেন, একুশের দিন সময় যত গড়িয়েছে ভিড় তত বেড়েছে। ভিড়ের তুলনায় বিক্রি তেমন হয়নি। যত মানুষ এসেছে, প্রত্যেকে একটি করে বই কিনলে সবগুলো স্টল ফাঁকা হয়ে যেত। এর পরও একুশের চেতনাকে শাণিত করতে মানুষ আসছে, বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, এটা কম কথা না।

যে ভাষা আন্দোলন ও শহীদদের নিয়ে এত আবেগ, সেই আন্দোলন ও শহীদদের নিয়ে এবার প্রকাশকদের কী আয়োজন তা জানার চেষ্টা করি আমরা। তবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে নতুন বই পাওয়া গেল হাতে গোনা।

গতকাল পর্যন্ত মেলার ২০ দিনে নতুন বই এসেছে তিন হাজার ৩৮৯টি। এর মধ্যে একুশে নিয়ে বই পাওয়া গেল মাত্র ১৩টি। এর মধ্যে আবার কয়েকটি বই আসার কথা থাকলেও গতকাল পর্যন্ত মেলায় আসেনি।

যেগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে সেগুলো আবার সংকলনধর্মী। নতুন মাত্রিকতার সন্ধান মেলে না এসব বইয়ে।

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের ‘বিচিত্র একুশে বিচিত্র তার চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য’ প্রকাশ করেছে আলোঘর প্রকাশনা।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এম আবদুল আলীমের কয়েকটি বই এসেছে এবারের মেলায়। তাঁর সম্পাদিত ‘ভাষা আন্দোলন কোষ’ ও ‘ভাষাসংগ্রামী এম এ ওয়াদুদ’ প্রকাশ করেছে কথা প্রকাশ। বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ গ্রন্থমালার অংশ হিসেবে এ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। গতকাল বাংলা একাডেমির সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিক্রয়কেন্দ্র দুটিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বইয়ের প্রথম মুদ্রণ এরই মধ্যে ফুরিয়ে গেছে।

এম আবদুল আলীমের ‘ভাষাসংগ্রামী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’ এনেছে আগামী প্রকাশনী। এ প্রকাশনী থেকে তাঁর ‘আওয়ামী লীগ ও ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থটিও প্রকাশিত হওয়ার কথা।

কথা প্রকাশ থেকে আরো বেরিয়েছে সুপা সাদিয়া গ্রন্থিত ‘বায়ান্নের বায়ান্ন নারী’।

অন্যপ্রকাশ এনেছে বিশ্বজিৎ ঘোষের ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু’।

সাহিদা বেগমের ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও দলিলপত্র’ প্রকাশ করেছে অনন্যা।

আনিসুল হক সম্পাদিত ‘একুশের শহীদ : ছয় ভাষাশহীদের জীবনকথা’ এনেছে প্রথমা। একুশের স্মৃতিস্মারক নিয়ে দীপন নন্দীর প্রতিবেদন সংকলন ‘একুশের স্মৃতি’ প্রকাশ করেছে অন্বেষা।

সাইফ আবেদীনের ‘ভাষা আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু’ প্রকাশ করেছে রাবেয়া বুকস। সোহেল মল্লিক সম্পাদিত ‘ভাষা আন্দোলনের নির্বাচিত ৫০ কিশোর গল্প’ বইটি প্রকাশ করেছে নালন্দা।

একুশে নিয়ে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্য থেকে চারটি নির্বাচিত বইয়ের তথ্য তুলে ধরা হলো।

‘বিচিত্র একুশে বিচিত্র তার চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য’ : ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, চরিত্র বৈশিষ্ট্য, শ্রেণি চরিত্র, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের লেখা প্রবন্ধের সংকলন এটি। এতে একুশের নানা মাত্রিক ভাষ্য ও নানা মাত্রিক রূপচরিত্র প্রকাশ পেয়েছে, যা পড়ে পাঠক ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। বইটি প্রকাশ করেছে আলোঘর প্রকাশনা। মূল্য ৩০০ টাকা।

‘ভাষা-আন্দোলন-কোষ’ : এ আন্দোলনের দীর্ঘ সময় অতিক্রম হলেও এ নিয়ে কোনো কোষগ্রন্থ রচিত হয়নি। ঐতিহাসিক এ দায়িত্ব পালন করলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. এম আবদুল আলীম। বৃহৎ কলেবরের এ গ্রন্থে ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ, ভাষাশহীদদের সামগ্রিক পরিচয়, ভাষাসংগ্রামীদের অবদান, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের ভাষা আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-সংগঠন ও পত্রপত্রিকার ভূমিকা সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় স্থান পেয়েছে এ গ্রন্থে। তিন খণ্ডে বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। মূল্য ১৫০০ টাকা।

‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন’ : ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য অবদান থাকলেও এত দিন তা যথাযথভাবে গ্রন্থিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক অজানা তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পূর্বাপর সম্পৃক্ততা এবং পরবর্তীকালে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে তাঁর ভূমিকার অনুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরেছেন এম আবদুল আলীম এ গ্রন্থে। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। মূল্য ৩০০ টাকা।

‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও দলিলপত্র’ : গ্রন্থটি রচনা করেছেন সাহিদা বেগম। তিনি পেশায় আইনজীবী হলেও বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ তাঁর আগ্রহ ও মনোযোগের বিষয়। এ গ্রন্থে তিনি ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর ইতিহাস ও দলিলপত্র সন্বিবেশ করেছেন। বইটি প্রকাশ করেছে অনন্যা। মূল্য ১০০০ টাকা।

গতকালের বইমেলা : গতকাল শুক্রবার বইমেলায় নতুন বই এসেছে ৫০৮টি। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বক্তৃতা। ‘বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ ও সাম্প্রতিক উন্নয়ন প্রসঙ্গ’ শীর্ষক একুশে বক্তৃতা প্রদান করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন জি এইচ হাবীব, শাহেদ কায়েস, শিল্পী রহমান ও সুহান রিজওয়ান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা