kalerkantho

বুধবার । ৬ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

লেখকের মেলা

আমার বইমেলা

ইমদাদুল হক মিলন   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১১:৪০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার বইমেলা

কোনো কোনো দিন নিজেকে নানা রকম প্রশ্ন করি। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ করে মনে হয় এই জীবন ও জগতের কী কী আমার ভালো লাগে। কয়েক দিন আগে এ রকম একটি সকালবেলায় নিজেকে প্রশ্ন করেছি, তোমার সবচেয়ে আনন্দের জায়গা কোনটি? মনের ভেতর থেকে উত্তর এলো—বইয়ের দোকান, বইয়ের মেলা। যখন যে দেশে গেছি, যে শহরে গেছি—সেই শহরের বইয়ের দোকানে গেছি প্রথম। নেড়েচেড়ে বই দেখেছি, বইয়ের ঘ্রাণ নিয়েছি। যতক্ষণ দোকানে থেকেছি, বইয়ের মন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে থেকেছি। পৃথিবীর কত কত বইমেলায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেকেছি। বই লেখক আর পাঠক দেখে মন আলোকিত হয়েছে। ঢাকার কোনো কোনো বইয়ের দোকানে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছি। আর সারা বছর অপেক্ষা করি আমাদের প্রিয় বইমেলাটির জন্য। বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এই মেলার চেয়ে প্রিয় জায়গা আমার আর কোথাও নেই। এই বয়সেও কেউ যদি আমাকে বলে বসুন্ধরা থেকে তোমাকে হেঁটে যেতে হবে বাংলা একাডেমির বইমেলায়, তাহলে আমি হেঁটে চলে যাব। এমন সময়ও তো গেছে, পকেটে পয়সা নেই, গেণ্ডারিয়া থেকে হেঁটে এসেছি বাংলা একাডেমির বইমেলায়। হেঁটে ফিরে গেছি। আমার লেখালেখির বয়স ৪৮। মাঝে দুই বছর দেশে ছিলাম না। বাকি বছরগুলোতে আমার মনে পড়ে না কোনো বছর বইমেলায় না গেছি। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরবেলা থেকে একটানা থেকেছি বইমেলায়। চা-শিঙাড়া খেয়ে কাটিয়েছি সারা দিন।

কত ঘটনা বইমেলা নিয়ে, কত স্মৃতি। দুটি ঘটনার কথা বলি। ১৯৯৩ সালের কথা। ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ নামের বইটি নিয়ে তুলকালাম চলছে। বিনোদন নামে একটি স্টলে শুধুই আমার বই। দুপুর থেকে রাত অবধি সেই স্টলে বসে অটোগ্রাফ দিয়ে বই বিক্রি করি। স্টলটি ছিল বাংলা একাডেমির পুকুর পারে। লোকজনের চাপে স্টলটি ভেঙে পুকুরে পড়ে গেল। চারজন পুলিশ সদস্য আমাকে পাহারা দিতেন, তাঁরা টেনে তুললেন। মাথা নিচু করে অটোগ্রাফের পর অটোগ্রাফ দিয়ে যাচ্ছি। এক মেয়ে বই কিনেছে, বই টেনে নিয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছি, মেয়েটি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, একি, আপনি আমার বইতে লিখছেন কেন? এমন লজ্জা পেলাম! সেই মেয়ে লেখক বোঝেনি, ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ বুঝতে চেয়েছিল। সেই বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শুধু বিনোদন স্টল থেকেই এক হাজার ১০০ কপি বই বিক্রি হয়েছিল। এখনকার পাঠকদের কাছে ব্যাপারটি বিস্ময়কর মনে হবে।

ওই বছরই আরেক দিন বই বিক্রি হচ্ছে, অটোগ্রাফের পর অটোগ্রাফ দিচ্ছি। বছর চল্লিশেক বয়সের এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন স্টলের এক পাশে। ভেবেছি ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ বইটিতে অটোগ্রাফ নেবেন। বই হাতে নিয়ে বললাম, কী নাম লিখব? ভদ্রমহিলা কঠিন গলায় বললেন, “আমি আপনার বই নিতে আসিনি। আপনি শুরু করেছিলেন ‘যাবজ্জীবন’ বা ‘নিরন্নের কাল’-এর মতো বই দিয়ে। এখন এই সব কী লিখছেন। ছেলে ভোলানো প্রেমের গল্প। আমি আপনার কাছে ‘যাবজ্জীবন’-এর মতো লেখা আশা করি। ‘টোপ’-এর মতো লেখা আশা করি।” আমি খুবই চিন্তিত হলাম। মনটা খুব ভার হয়ে গেল। তখন রিকশা ভাড়ার পয়সা-টয়সা পকেটে থাকে, তার পরও একা একা হেঁটে গেণ্ডারিয়ার বাসায় গেলাম। সপ্তাহখানেক পর লিখতে শুরু করলাম ‘নূরজাহান’। ‘নূরজাহান’ বইটি লিখতে পেরেছি এ জন্য আমি সেই মহান পাঠিকার কাছে কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে বড় একটা ধাক্কা দিয়েছিলেন। সেই ধাক্কায় ১৮ বছর ধরে লিখলাম ‘নূরজাহান’। এবারের মেলায় অনন্যার স্টলে এসে এক ভদ্রমহিলা বেছে বেছে আমার অনেক বই নিলেন। আমি সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার দিকে ফিরেও তাকাননি প্রথমে। একসময় খেয়াল করে বললেন, “কিছুদিন আগে ‘নূরজাহান’ পড়ে শেষ করেছি। এ জন্য অন্য বইগুলো নিলাম।” প্রশংসাসূচক অনেক কথা বললেন, সেসব লিখতে চাই না। বাংলা একাডেমির বইমেলা আমাকে অনেক দিয়েছে, অনেক। এই বইমেলা আমাকে তৈরি করেছে। বাংলা একাডেমির বইমেলার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা-পরিসীমা নেই।

এবারের বইমেলা এককথায় অসাধারণ, অপূর্ব। মেলার পরিসর, নান্দনিক সৌন্দর্য, সুপরিকল্পিত বিন্যাস—সব মিলিয়ে এত সুশৃঙ্খল বইমেলা আগে কখনো হয়নি। জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে মেলা। ফলে এবারের বইমেলা চলে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধায় মেলা পূর্ণতা পেয়েছে। আর বিখ্যাত স্থপতি এনামুল করিম নির্ঝরের মেধায় দৃষ্টিনন্দন ও ঝলমলে হয়েছে মেলা। চারদিকে সুপরিকল্পনার ছাপ। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের সমন্বয়ে বইমেলা হয়ে উঠেছে পূর্ণাঙ্গ মিলনমেলা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা