kalerkantho

সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ ফাল্গুন ১৪২৬। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

লেখকের মেলা

লেখক-পাঠক প্রকাশকের ত্রিপক্ষীয় উদ্‌যাপন

শাহ্‌নাজ মুন্নী   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১০:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লেখক-পাঠক প্রকাশকের ত্রিপক্ষীয় উদ্‌যাপন

যখন সাড়ম্বরে বর্তমানের একুশে বইমেলা শুরু, ১৯৮৪ সালে, প্রায় ৩৬ বছর আগে, তখন আমি স্কুলের গণ্ডি পেরোচ্ছি মাত্র। লিখি কম, বরং সারাক্ষণ ডুবে থাকি স্কুলের পাঠবহির্ভূত বইয়ের বিচিত্র আনন্দময় জগতে। দৈনিক সংবাদপত্রের পাতায় বইমেলার খবর বেরোয়, যাওয়ার জন্য মন আকুপাকু করে। কিন্তু বয়স ফ্যাক্টর। বাড়ির বাইরে একা একা অত দূরে যাওয়ার অনুমতি নেই। পরের বছর কলেজে, আরেকটু বড় হওয়া, আরেকটু স্বাধীনতা পাওয়া।

কলেজ থেকে এলাম আরো বড় পরিসরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখন বইমেলা এসে গেল একেবারে ঘরের কাছে। প্রতিদিনই পারলে একবার মেলার ধুলা গায়ে মেখে বাড়ি আসি। নব্বইয়ের দশকে বইমেলায় এলো কবি সরকার আমিনের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত আমার প্রথম কবিতার বই, ‘রুদ্ধশ্বাস বৈঠকের পর’। পরের বছর এলো ‘ক্ষমগো শ্বেত দুগ্ধ’। বয়রাতলায় টেবিল-চেয়ার পেতে বই বিক্রি আর বন্ধুদের সঙ্গে তুমুল আড্ডা। সীমিত পরিসরে বেশ একটা আপন আপন ব্যাপার ছিল তখন, আপন আর আন্তরিক। হাতে গোনা কয়েকটি স্টল, অল্পসংখ্যক মানুষ, পরিচিত-অপরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার আন্তরিক পরিবেশ। পত্রিকার পাতায় লেখা হতো, আজ কোন কোন কবি-লেখক মেলায় এসেছেন, কার নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে, ধুলায় কেমন নাকাল হয়েছে ক্রেতা-দর্শকরা। তারপর তো চোখের সামনেই দেখলাম কিভাবে এই শিশু বইমেলা ধাই ধাই করে বাড়তে শুরু করল। বছর বছর মেলার কত রূপ-রূপান্তরও দেখলাম। কখনো সাধারণ মানুষের আকর্ষণ বাড়াতে বাহারি পণ্যের পসরায় ভরা মেলা নিল বারোয়ারি চেহারা, কখনো তার রূপ বদলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলল শুধুই বিশুদ্ধ বইয়ের মেলায়। আগে যে মেলা সীমাবদ্ধ ছিল বাংলা একাডেমির অপরিসর চত্বরে, গত পাঁচ-ছয় বছরে সেই মেলা বিস্তৃত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল প্রাঙ্গণে। মেলা বিকশিত হচ্ছে, সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংখ্যায় বাড়ছে বইয়ের প্রকাশনা, বাড়ছে প্রকাশক, লেখক, ক্রেতা ও দর্শক। শত শত লোক দল বেঁধে মেলায় আসছে, যাচ্ছে, ঘুরছে, বেড়াচ্ছে, ফুচকা খাচ্ছে—যেন এক ধুন্ধুমার উত্সব লেগে গেছে।

বলতে গেলে ফেব্রুয়ারি আর বইমেলা ঢাকাবাসী বাঙালি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের কাছে গত ৩০ বছরে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে একটা অভ্যাসের মতো। বছরের পর বছর ধরে, একুশের বইমেলা প্রকাশক তো বটেই, যাঁদের লেখালেখির অভ্যাস আছে, যাঁরা লেখেন এবং যাঁরা বই পড়তে ভালোবাসেন—তাঁদের কাছে রীতিমতো একটা বার্ষিক উত্সবের মতো। যেই উত্সব মোটা দাগে লেখক-পাঠক-প্রকাশক এই ত্রিপক্ষীয় উদ্যাপনের উপলক্ষ।

তবে যে প্রশ্নগুলো বইমেলা ঘিরে কয়েক বছর ধরে ঘুরেফিরে উচ্চারিত হচ্ছে, সেগুলো হলো, মেলার আয়তন বাড়লেও বইয়ের প্রকৃত পাঠকের সংখ্যা কি বেড়েছে? বইয়ের প্রকাশনা বাড়লেও মেলায় কি উন্নত ও মানসম্পন্ন বই প্রকাশিত হচ্ছে? বইয়ের বাজার কি আদৌ বড় হয়েছে? প্রকৃত অর্থে এই বইমেলায় কি ভাষা-সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে? বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন ও উত্কর্ষ বাড়াতে এই মেলা কি আসলেই কোনো ভূমিকা রাখছে?   

কেউ কেউ বলেন, যাঁরা বই কেনেন বা যাঁরা শুধু কাগজের বই পাঠ করেন, শুধু তাঁরাই যে পাঠক—তা তো নয়। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে মানুষ অনলাইনেও প্রচুর পড়েন (যদিও সাইবার নেশায় নেশাগ্রস্ত ও ইন্টারনেট আসক্ত তরুণ প্রজন্মের রুচি ও পাঠ কনটেন্ট নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে), সেই সব পাঠককে আপনি গোনায় ধরবেন না কেন? আর যদি গোনায় ধরেন তাহলে তো পাঠকসংখ্যা বেড়েছে বৈ কমেনি। 

তবে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশে বইয়ের মান যাচাইয়ের চিন্তা খুব কমসংখ্যক প্রকাশকই করেন। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেরই নেই কোনো সম্পাদনা পরিষদ। নেই পাণ্ডুলিপির গুণগত মান যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জনের ন্যূনতম ব্যবস্থা। প্রকাশকরা বলেন, সে জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয়, সেই পরিমাণ পুঁজি নেই তাঁদের। ফলে মান নির্ণয়ের ভার আসলে পাঠকদের বিবেচনার ওপরই ফেলে রাখতে হচ্ছে। 

এখানেও আবার প্রশ্ন, হাজার বইয়ের ভিড়ে পাঠক তাঁর পছন্দের বইটি খুঁজে পান তো? কিংবা ভালো বইটি হাতে নেন তো? অনেকেরই অভিযোগ, মেলায় আসা গড়পড়তা দর্শকদের ভালো বইয়ে চোখ নেই। বরং মুখচেনা পরিচিত লোকদের বইয়েরই বেচাকেনা চলতে থাকে। আর কিছু শৌখিন খ্যাতি কাঙাল ‘হঠাত্ গজিয়ে ওঠা’ লেখককে করুণভাবে ঘুরতে দেখা যায় মিডিয়ার উন্নাসিক ক্যামেরার পিছু পিছু।        

এটা এখন সবাই জানেন একুশের বইমেলাকে কেন্দ্র করে আমাদের প্রকাশনা শিল্প হয়ে গেছে শুধুই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। শুধু এই একটি মাসেই যেন আমাদের যত বইপ্রেম, যত গ্রন্থ অনুরাগ, যত ভাষাপ্রেম উপচে পড়ে। বাকি ১১ মাস আর বইয়ের খবর নেই। এমনকি মেলায় প্রকাশিত বইগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আর সারা বছর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তা ছাড়া প্রকাশকরাও ফেব্রুয়ারি ছাড়া বই প্রকাশের ঝুঁকি নিতে চান না। তাঁদের কথা হলো, বইমেলা উপলক্ষে যেভাবে বইয়ের খানিকটা প্রচার-প্রচারণা হয়, সারা বছর তো সেটা হয় না। যদিও অনেকে মনে করেন, বইমেলাকেন্দ্রিক প্রকাশনা ও বিপণনকে সারা বছরের প্রকাশনায় রূপান্তর না করলে বইয়ের বাজার ছোট থেকে আরো ছোট হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা