kalerkantho

মোস্তফা কামালের ‘রাসেল বলছি’

শব্দশিল্পে শেখ রাসেলের সুপাঠ্য জীবন

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৫:২৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শব্দশিল্পে শেখ রাসেলের সুপাঠ্য জীবন

বঙ্গবন্ধুর ছোট ছেলে শেখ রাসেলের কত গল্পই আমাদের জানা। তার মলিন মুখের একটা ছবিও আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে তিনিও শহীদ হন। ঘাতকের নির্মম বুলেট বিঁধেছিল ছোট বুকেও। 

তাই পঁচাত্তরের কালরাতের কথা মনে হতেই ভেতরটা হু হু করে ওঠে। ভেসে ওঠে ছোট্ট শিশু রাসেলের সোনামুখ। তাকে ঘিরে আমাদের কত আবেগ, অনুভূতি তোলা আছে হৃদয়ে। কত অস্ফুট বেদনা ডুকরে ওঠে বুকের ভেতর। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল সেই আবেগ, অনুভূতি আর বেদনার অক্ষরে লিখেছেন কিশোরতোষ উপন্যাস ‘রাসেল বলছি’। অমর একুশে বইমেলা ২০১৯-এ বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। 

পৃথিবীতে আসার পর থেকেই রাসেল বাবাকে খুব একটা কাছে পাননি। কারাগারকে ভেবেছেন বাবার বাড়ি। আম্মা কিংবা বড়পা হাসুর কোলে চড়ে প্রায়ই বাবার বাড়িতে যেতেন। বাবা তাকে কোলে তুলে সোহাগ করতেন। বাবার কোলের উষ্ণতা ছেড়ে তার আসতেই মন চাইত না! 

‘রাসেল বলছি’ উপন্যাসে রাসেলের জীবনের সেই সব পিতৃস্নেহ বঞ্চিত দিনের কথা ওঠে এসেছে হৃদয়গ্রাহী বর্ণনায়। বাবার বুকের উষ্ণ আদরের জন্য শিশু ছেলেটির মনোজগতের হাহাকার লেখক তুলে এনেছেন সুচারুভাবে। বিশেষ করে শিশু রাসেলের মুখনিঃসৃত বর্ণনা কৌশল শেখ রাসেল আর পাঠকের মাঝে কোনো দেয়াল তুলতে দেয়নি। মনে হয়েছে, শেখ রাসেলের মুখেই শুনছি তার জীবনের কথা।

ঔপন্যাসিক মোস্তফা কামালের রচনার ভাষা সাবলীল। সুখপাঠ্য। শব্দকে তিনি গভীর মমতায় শিল্পের রূপ দেন। সহজবোধ্য ভাষা ও বয়ন কৌশল তার রচনার বড় শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সময়ে আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকেও গল্পের ছলে তুলে এনেছেন ‘রাসেল বলছি’ উপন্যাসে। 

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ছয় দফা দাবি আদায়ে অসহযোগ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাগ্রহণ ও শেষে ভয়াল ১৫ আগস্ট। সবই ধারাবাহিকভাবে ওঠে এসেছে উপন্যাসের পরতে পরতে। 

বুঝতে শেখার পর থেকে দেশ স্বাধীনের আগে রাসেল সব সময় বাবাকে কারাগারেই বেশি দেখেছেন। কদিন পর পরই পাকিস্তানি শাসকের রোষানলে পড়ে বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়েছে। দীর্ঘদিন কারাজীবনের পর হয়তো কিছুদিনের জন্য বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়েছেন। তিনি ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরে এলে শিশু রাসেলের আনন্দের সীমা থাকে না। সারাক্ষণই বাবার গায়ের সঙ্গে ঘেঁষে থাকেন। বাবার সঙ্গে খেতে বসেন। বাবা নিজ হাতে তাকে খাইয়ে দেন। বাবার হাতে না খেলে তখন যেন তার পেটই ভরে না! রাসেলের মা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী ছেলের দিকে চেয়ে থাকেন। বাবার জন্য ছেলের হৃদয়ের ভালোবাসা বুঝতে পারেন। 

বাবার অবর্তমানে মা কীভাবে পরিবারটিকে আগলে রেখেছিলেন, অন্যায়ের কাছে নতজানু না হতে কীভাবে স্বামীকে সাহস জুগিয়েছেন-তাও উঠে এসেছে শিশু রাসেলের বয়ানে। 

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে ক্যান্টনমেন্টে। পরে সেখান থেকে করাচিতে কারাগারে। এই সময়টায় ধানমন্ডি ১৮ নম্বরের একটি বাড়িতে বঙ্গবন্ধু-পরিবারকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছিল। বাইরে যেতেও সেনা সদস্যদের অনুমতি লাগত। সেই নজরবন্দি জীবনের সব বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছিল বড়পার ছেলে জয়ের পৃথিবীতে আগমন। জয়ের চাঁদমুখের দিকে তাকিয়ে তার দিন কেটে যেত। বন্দিজীবনকে তখন আর দুর্বিষহ মনে হতো না। 

শিশু রাসেল স্বপ্ন দেখতেন বাবার মতো নেতা হবেন। দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করবেন। বাবার মতো বক্তৃতা দিতেও চেষ্টা করতেন একা একা। আবার দুই ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালকে দেখে আর্মি অফিসার হওয়ার ইচ্ছেও বুকে পুষেছিলেন। একটা সময় সব উবে গিয়ে বাবার মতো নেতা হওয়ার স্বপ্নই ছিল তার চোখে। 

কিন্তু পথভ্রষ্ট কিছু মানুষের জন্য শিশু মনের সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। মাত্র এগারো বছর বয়সে জীবনে নেমে এসেছে অথই আঁধার। সেই আঁধারে আড়াল হয়েছে শিশু রাসেলের মুখ। তবে আমাদের হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। মোস্তফা কামালের ‘রাসেল বলছি’ সেই সোনামুখ মনে করিয়ে দেয় পরম মমতায়, গভীর ভালোবাসায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা