kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

হালদা বাঁচাতে কিবরিয়ার লড়াই

হালদা হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যেখান থেকে রুই, কাতল, মৃগেল, কালোবাউশ ইত্যাদি কার্পজাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম আহরণ করা হয়। প্রাকৃতিকভাবে কার্পজাতীয় মাছের ডিম আহরণের সুযোগ সারা বিশ্বেই আর কোথাও নেই

অনলাইন ডেস্ক   

১৪ জানুয়ারি, ২০২২ ১২:০৯ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



হালদা বাঁচাতে কিবরিয়ার লড়াই

গবেষণাগারে কালোবাউশ নিয়ে কাজ করছেন অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া

হালদাপারের পশ্চিম সুয়াবিল গ্রামে জন্ম মো. মনজুরুল কিবরিয়ার। ছোটবেলা কেটেছে এই নদীর সঙ্গে। বড় হতে হতে দেখেছেন শৈশবের স্বচ্ছতোয়া নদীকে দখলে-দূষণে ক্লিষ্ট হতে। ২০০১ সালে ব্রিটিশ সাহায্য সংস্থার (ডিএফআইডি) একটি প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে সরেজমিন দেখে তাগিদ বোধ করেন নদীটি রক্ষা করার। তখন থেকেই এ নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। ২০০৭ সালে গড়ে তোলেন হালদা নদী রক্ষা কমিটি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে যুক্ত করে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া ছিল লক্ষ্য। হালদা নদী রক্ষায় দেড় দশক ধরে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে আসছে এই সংগঠন।

হালদা হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যেখান থেকে রুই, কাতল, মৃগেল, কালোবাউশ ইত্যাদি কার্পজাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম আহরণ করা হয়। প্রাকৃতিকভাবে কার্পজাতীয় মাছের ডিম আহরণের সুযোগ সারা বিশ্বেই আর কোথাও নেই। এ কথাটি বিশ্বের বিভিন্ন সম্মেলনে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের লেখালেখিতে উল্লেখ করেছেন বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মনজুরুল কিবরিয়া। তাঁর বক্তব্য এ পর্যন্ত কেউ খণ্ডন করেননি।

বিরল গাঙ্গেয় ডলফিনও পাওয়া যায় হালদায়। ২০১৭ সালে প্রায় ২০টি ডলফিন মারা গেলে হালদা রক্ষা কমিটির প্রচারণায় প্রবল জনমত তৈরি হয়, প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। মা মাছ শিকার, বালু তোলার ড্রেজার চলাচল, অবৈধ মাছ ধরা ইত্যাদি বন্ধের জন্য পাহারার ব্যবস্থা করা হয় তখন। স্থানীয় লোকজন, জনপ্রতিনিধি সবাইকে এ কাজে যুক্ত করার পরামর্শ দেন কিবরিয়া। পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় স্থানীয় কিছু লোককে স্পিডবোট দিয়ে সার্বক্ষণিক পাহারায় নিযুক্ত করা হয়। মাত্র তিন মাসে এক লাখ মিটার অবৈধ জাল উদ্ধার করে তারা। নজরদারি বাড়াতে নদীর কয়েকটি স্থানে বসানো হয় সিসিটিভিও। মোতায়েন করা হয় পুলিশের একটি ইউনিট। অবৈধ জাল পেতে মা মাছ ধরা, ইঞ্জিনচালিত নৌকার চলাচল ও বালু উত্তোলন বন্ধে বেশ কাজে দিয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। ২০১৬ সালে ডিম আহরণের পরিমাণ নেমে এসেছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়। ২০১৮ সালে পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ হাজার ৬৮০ কেজি! আর ২০২০ সালে ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি, যা একটি রেকর্ড। আহূত ডিম থেকে উৎপাদিত রেণু প্রতি কেজির দাম এক লাখ টাকা।

অধ্যাপক কিবরিয়া পিকেএসএফ ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (আইডিএফ) সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি। উদ্দেশ্য সরকার এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করা। দেশে এটাই প্রথম কোনো একক নদীভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। কমিটির বহুমুখী সচেতনতা কার্যক্রমের আরেকটি সাফল্য, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির জীববিজ্ঞান প্রথম পত্রে হালদা নদীকে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্তি।

সম্প্রতি হালদার গাঙ্গেয় ডলফিন এবং মৃগেল ও কালোবাউশের জীবনরহস্যও উন্মোচন করেছেন অধ্যাপক কিবরিয়া এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ এম জে জোনায়েদ সিদ্দিকী। ফলে ডলফিন ও মাছগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এখন জানা-বোঝা সম্ভব হবে, যার সুফল মিলবে এর উৎপাদনেও।

♦ সুমন কায়সার



সাতদিনের সেরা