kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

অন্য কোনোখানে

আভিজাত্যের শহর সৈয়দপুর

আবু আফজাল সালেহ   

২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আভিজাত্যের শহর সৈয়দপুর

সৈয়দপুর। ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা এক শহর। সৈয়দপুর জেলা শহর নয়। তার পরও দেশের শীর্ষ ব্যবসাকেন্দ্রের একটি। দেশের সর্ববৃহত্ রেলওয়ে কারখানাও এখানে। সাদা চামড়ার লোকেরা এখানে রেল কারখানা স্থাপন করে। মূলত এ রেল কারখানাই সৈয়দপুরের ভরকেন্দ্র। এর বদৌলতে পরবর্তী সময়ে ব্যবসাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। রংপুর বিভাগের একমাত্র বিমানবন্দরও এখানে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যস্ততম পোর্ট। ঐতিহ্যবাহী চীনা মসজিদ রেলস্টেশনের কাছেই, স্টেশন-ওয়াবদা রোডে। মাঝেখানে এ অঞ্চলের শীর্ষ গির্জা। আছে মর্তুজা ইনস্টিটিউট, ইউরোপিয়ান ক্লাবসহ লাল লাল সব স্থাপত্য। এ যেন আভিজাত্যে ভরপুর এক শহর।

 

রেল কারখানা

কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়কের (ডিএস) অফিসে গিয়ে অনুমতি নিলাম ঘুরে দেখার জন্য। ১৮৭০ সালে নির্মিত হয়েছে এটি। ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত এ কারখানার ২৪টি শপে (উপকারখানা) শ্রমিকরা কাজ করে। নাট-বল্টু থেকে শুরু করে রেলওয়ের ব্রড গেজ ও মিটার গেজ লাইনের বগি মেরামতসহ সব কাজ করা হয়। আশপাশে লাল লাল বিল্ডিং। রেলের জায়গা। সবই ইংরেজরা স্থাপন করেছে। কারখানাটি সৈয়দপুর রেলস্টেশনের পাশেই; সাহেববাজারে।

 

গির্জা

সৈয়দপুরের বহুল পরিচিত চীনা মসজিদে যাওয়ার পথে চোখে পড়বে সিমেট্রি বা খ্রিস্টানদের কবর। চারদিকে ঘেরা। পাশ দিয়ে সরু রাস্তা। রেল কারখানায় বাঙালি-বিহারির সঙ্গে কাজ করত বহু ব্রিটিশ, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান। তাদের বসবাসের জন্য গড়ে তোলা হয় বেশ কটি আবাসিক এলাকা। এর মধ্যে সাব-অর্ডিনেট কলোনি, সাহেবপাড়া ও অফিসার্স ক্লাব অন্যতম। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে তাদের ধর্মীয় উপাসনার জন্য ব্রিটিশ সরকার সাহেবপাড়ার দুই প্রান্তে দুটি গির্জা নির্মাণ করে। এর একটি ছিল রোমান ক্যাথলিক, অপরটি প্রটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের। গির্জা দুটি উত্তরাঞ্চলের সর্বপ্রথম ও প্রাচীনতম গির্জা।

 

চীনা মসজিদ

গির্জা দেখার পর একটু সামনে চোখে পড়ল অন্য রকম এক মসজিদ। জানা যায়, ১৮৬৩ সালে সংগৃহীত চাল বিক্রির টাকা দিয়ে একসময় মসজিদটি দালানে পরিণত করা হয়। মসজিদটি নির্মাণ করেন শইখ নামের এক হিন্দু মিস্ত্রি। সে সময় কোনো সিমেন্ট ছিল না। তাই চুন ও সুরকি দিয়ে গাঁথুনি দেওয়া হয়। পরে চীনামাটি দিয়ে তৈরি থালা-বাসনের ভাঙা টুকরা মসজিদের দেয়ালে লাগানো হয়। দেয়ালের চীনামাটির জন্যই এর নামকরণ করা হয় চীনা মসজিদ। মসজিদের প্রথম ভাগের মেঝেতে মরমর পাথর। চীনা মসজিদের গোটা অবয়ব উজ্জ্বল রঙিন চীনা পাথর দ্বারা আবৃত। নয়নাভিরাম এ মসজিদে ৩২টি মিনার ও পাঁচটি গম্বুজ। আগত পর্যটকদের থাকার জন্য মসজিদের দোতলায় একটি কক্ষ। প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি বহু পর্যটক মসজিদটি দেখতে আসেন। শুক্রবার দূর থেকে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে আসেন।

 

বিমানবন্দর ও সেনানিবাস

সৈয়দপুর বাজার মাঝামাঝি রেখে এক পাশে স্টেশন-কারখানা, অন্যদিকে বিমানবন্দর ও সেনানিবাস। বিমানবন্দরে সপ্তাহের সাত দিনই বিমান ওঠানামা করে। বিমানবন্দরটি দেখার জন্য প্রতিদিন লোকজন ভিড় করে। পাশেই সৈয়দপুর সেনানিবাস, ইএমই সেন্টার অ্যান্ড স্কুল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল। এখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ সংরক্ষিত। এই সড়কেই ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব, বেশ কিছু রেলওয়ে অফিসারদের সুদৃশ্য বাংলো ও সরকারি ডাকবাংলো।

 

মুর্তজা ইনস্টিটিউট

সে সময় রেলওয়ে কারখানার বেশির ভাগ কর্মকর্তা ছিলেন ব্রিটিশ। ইংরেজরা নিম্নশ্রেণির কর্মচারীদের চিত্তবিনোদনের জন্য ১৮৭০ সালে নির্মাণ করেন ‘দি ইউরোপিয়ান ক্লাব’। কারখানার কাজ শেষে কর্মচারীরা প্রতিদিন সমবেত হতো ক্লাবে। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলত আনন্দ, ফুর্তি, নাচ-গান। এটির পরিবর্তিত নাম ‘মুর্তজা ইনস্টিটিউট’। স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী নান্দনিক। এখানকার হোটেলগুলোতে মাংসের চপ-পুরি, বট-পুরি পাওয়া যায়। বেশির ভাগ মালিক অবাঙালি, উর্দুভাষী। মহররমে এখানে বড়সড় শোক মিছিল হয়। কারবালার প্রান্তর তৈরি হয়। ইয়াজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্র সাজানো হয়।

 

আশপাশের ভ্রমণ স্পট

সৈয়দপুর শহরে রয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের এসপি অফিস, রেলওয়ের বিভাগীয় হাসপাতাল, ফাইলেরিয়া হাসপাতাল, হরেক কুটির শিল্প, টায়ার জ্বালিয়ে তেল তৈরি, জুট মিল, বেনারসি পল্লী,  রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব, শত বছরের পুরনো শিল্প-সাহিত্য সংসদ। উপজেলা শহরটি বাঙালি-বিহারির এক বৈচিত্র্যময় শহর। সৈয়দপুর থেকে জেলা শহর নীলফামারী ১৪-১৫ কিলোমিটার দূরে। নীলফামারী থেকে ১২-১৩ কিলোমিটার দূরে নীলসাগর দিঘি। এটিও দেখতে পারেন।

 

কিভাবে যাবেন

বাস, ট্রেন, বিমান—তিন ধরনের বাহনেই সৈয়দপুর আসা যায়। সকালে কমলাপুর থেকে ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ সৈয়দপুর আসে। এখানে থাকার জন্য আছে রেলের রেস্ট হাউস ও ছোট-বড় নানা হোটেল। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা