kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

আপনার শিশু

মন্তব্যে সাবধান

১৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মন্তব্যে সাবধান

—‘তুমি এত মোটা কেন?’

—‘কোন চালের ভাত খাও?’

—‘এত শুকনা, বাতাসে তো উড়ে যাবে।’

—‘পাতিলের তলার মতো কালো!’

—‘ও তো অতিরিক্ত খাটো।’

—‘বাট্টু’

—‘লম্বু’

—‘মোটু’

এই মন্তব্যগুলোর সঙ্গে সবাই কমবেশি পরিচিত। প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের কথা অন্যদের বলতে শুনি কিংবা হয়তো নিজেও বলি। ছোটবেলায় এসব শুনে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরার নজিরও আছে অনেকেরই। ছোট্ট মনের সেই ক্ষত জীবনে কখনো মোছে না। কারো কারো ক্ষেত্রে মানসিক বিপর্যয় কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাবের শুরুটা হয় এখান থেকেই। যার ফল ভোগ করতে হয় সারা জীবন। আমাদের সমাজে শারীরিক গঠন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা খুব সাধারণ বিষয়। সমাজ, পরিবারের এসব নেতিবাচক আচরণের প্রথা ভাঙতে হবে আমাদেরই। চলুন জেনে নিই কী করে নতুন মানসিকতায় গড়ে নেব ছোট্ট শিশুদের মন!

নিজের পরিবর্তন

ব্যক্তি থেকেই সমাজ। তাই প্রথম ধাপ হবে নিজের আচরণ বদল। অন্যের সঙ্গে মানবিক ব্যবহার করা। কারো শারীরিক বা সামাজিক অসমতা নিয়ে আলোচনা বা মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা। আপনার কাছ থেকেই শিখবে আপনার পরিবার ও শিশুরা। নিজের স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে হবে বুলিয়িং, রেসিজম ও সেক্সিজমের ব্যাপারে। তবেই নেতিবাচক মন্তব্য থেকে সাবধান হওয়া যাবে, অন্যদেরও সাবধান করা যাবে। গায়ের রং খারাপ কিংবা ভালো হয় না, সব গায়ের রংই সমান সুন্দর। কিংবা শারীরিক উচ্চতা, ধনী-গরিব এ বিষয়গুলো মানুষ যাচাইয়ের মাপকাঠি হতে পারে না—এই বোধ আপনার না থাকলে অন্যকে শেখাবেন কী করে?

 

আদর্শ তৈরি

শিশুদের সামনে উপযুক্ত আদর্শ হিসেবে নিজেকে তৈরি করতে হবে। সবার সঙ্গে সুন্দর, সাবলীলভাবে কথা বলতে হবে। বিরূপ মন্তব্য, অন্যদের হেয় বা ছোট করা যাবে না। পরিবারের সবাইকে অন্যের বিষয়ে অযাচিত মন্তব্য করার চর্চা বাদ দিতে হবে। মানুষকে শুধু তার কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। সাধারণত শিশুরা নিজে বুলিড হলে অন্যকেও বুলি করার প্রবণতা তৈরি হয়। তাই শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে কাউকে নিয়ে মন্তব্য করা ভালো হয়। এটি করা বা না করা সম্পূর্ণ শিশুর হাতে। অন্য কেউ তার সঙ্গে এই খারাপ কাজটি করলেও সে চাইলেই এই খারাপ বিষয়টি থেকে নিজে দূরে থাকতে পারে এবং কেউ তাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করলে সেটি উপেক্ষা করতে পারলেই একদিন এসব নেতিবাচক বিষয় সমাজ থেকে দূর হয়ে যাবে।

 

শিশুর বন্ধু হোন, বন্ধু হতে শেখান

শিশুর সঙ্গে পরিবারের সবাইকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে তারা বাইরে বাজে মন্তব্য শুনে একা একা কষ্ট পাবে না। পরিবারের নির্ভরযোগ্য কাউকে জানালে ভবিষ্যতে তার মধ্যে হীনম্মন্যতা বা আত্মবিশ্বাসের মতো ক্ষতিকর সমস্যা তৈরি হবে না। সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ভুলে শিশুকে অন্য সব বাচ্চার সঙ্গে খেলতে উত্সাহী করতে হবে। খেলাধুলা ও বন্ধুত্ব সম্পর্কের মানোন্নয়ন করে, ফলে বুলির প্রবণতা কমায়। শিশুকে খোলাখুলি কথা বলতে দিন, মতামত ও আবেগ প্রকাশের সুযোগ দিন। তার কথা মন দিয়ে শুনুন। যেসব বাচ্চার আবেগ, মনের ভাব দমিয়ে রাখা হয় তাদের বাজে ব্যবহার ও মন্তব্য করার প্রবণতা বেশি থাকে।

 

উপযুক্ত শাসন

শিশু কাউকে কটু মন্তব্য করলে তত্ক্ষণাত্ তাকে ডেকে নিন। কঠোরভাবে তাকে বোঝান কোথায়, কেন, কিভাবে কথাটিতে ভুল ছিল এবং ক্ষমা চাইতে উত্সাহ দিন। ভবিষ্যতে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে, এটিও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন। তবে অন্যের সামনে শাসন করবেন না এবং কোনোভাবেই গায়ে হাত তুলবেন না। আড়ালে ডেকে নিয়ে বোঝান। কটু মন্তব্যের প্রভাব কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে এটি বিভিন্নভাবে শিশুকে বোঝানো যেতে পারে। তাকে এ বিষয়ে শিক্ষণীয় ইউটিউব ভিডিও দেখাতে পারেন, ছোটগল্প পড়তে দিতে পারেন। বাস্তব বিভিন্ন উদাহরণও দেওয়া যেতে পারে। সময় নিয়ে শিশুর এই বিরূপ আচরণ ও অসংবেদনশীল মন্তব্যের পেছনের কারণ খুঁজে বের করুন। কোনো ব্যক্তি বা সংসর্গ তাকে উত্সাহিত করে থাকলে সেখান থেকে শিশুকে নিরাপদ দূরত্বে সরানোর ব্যবস্থা করুন। শিশুর বুলিয়িং প্রবণতা বেশি হলে এবং বোঝানোর পরও এই প্রবণতা না কমলে শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।

স্মিতা দাস

বিভাগীয় প্রধান শিক্ষক, সাইক ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড টেকনোলজি  

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা