kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

সুন্দর হোক সন্ধিক্ষণ

একজন শিশু বড় হয়ে কেমন মানুষ হবে, তার চরিত্র, নৈতিকতা, মনন, সামাজিকতা—সব কিছুই নির্দিষ্ট হয়ে যায় টিনেজ সময়ে। এই সময়ের জটিলতা ও সমাধান নিয়ে লিখেছেন সাইক ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড টেকনোলজির বিভাগীয় প্রধান শিক্ষক স্মিতা দাস

৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুন্দর হোক সন্ধিক্ষণ

১৩ থেকে ১৯—কৈশোরের এই সাতটি বছরের সময়কালকে ইংরেজিতে বলা হয় টিনেজ। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক পরিপক্বতাভেদে টিনেজ সময় ১১-১২ বছরেও শুরু হতে পারে। এই সময়ে শরীরে, মনে আসে পরিবর্তন। সবাই সেটা সমানভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। এই সমস্যাগুলো বোঝার, নিয়ন্ত্রণ করার গুরুদায়িত্ব কিশোর-কিশোরীর অভিভাবকের। তাই এ নিয়ে জানাশোনাটাও জরুরি।

 

হীনম্মন্যতা

শরীরের হঠাত্ পরিবর্তন ও হরমোনের প্রভাবে এ সময় দুশ্চিন্তা ও হীনম্মন্যতা প্রকট হয়ে ওঠে। নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে, শরীরের পরিবর্তন—এসব নিয়ে টিনেজরা খুব মনোযোগী হয়ে ওঠে। নিজেকে নিয়ে পরিবার, বন্ধু বা আশপাশের যেকোনো সমালোচনা এই সময় মনোজগতে বেশ প্রভাব ফেলে। পরিবার ও কাছের মানুষদের এই সময় টিনেজদের প্রশংসা বা উত্সাহ দেওয়া উচিত। সময় দেওয়া, মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনা এই হীনম্মন্যতাবোধ দূর করে অনেকখানি।

 

স্ট্রেস ও ডিপ্রেশন

হরমোনের প্রভাবে এ সময় অল্পতেই উদ্বেগ ও অবসাদ তৈরি হয়। কিশোর-কিশোরীদের আস্থার একটা জায়গা মা-বাবার তৈরি করে দেওয়া জরুরি। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কষ্টগুলো খুব ছোট বা তুচ্ছ মনে হলেও তাদের দৃষ্টিতে সেগুলো পাহাড়সম। তাই তাদের চোখ দিয়েই তাদের মনোজগত্ জানতে বা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। অভিভাবক নয়; বরং সহমর্মী হয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। অনেক সময় টিনেজরা স্কুলে, বন্ধুমহলে বাহ্যিক সৌন্দর্য, মেধা, সামাজিক অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হেনস্তার (টিজ বা বুলিং) শিকার হতে পারে। এমন কোনো বিষয় ঘটছে কি না অভিভাবকদের খোঁজ রাখতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

আচরণগত সমস্যা

মূলত স্ট্রেস, ডিপ্রেশন ও একাকিত্ব, বন্ধুর অভাব থেকেই কিশোর বয়সে আচরণগত সমস্যা তৈরি হয়। অযথা দুর্ব্যবহার, হঠাত্ রেগে যাওয়া, উত্তর না দেওয়া এমন সমস্যা প্রকট হয় কিংবা সামান্য কারণে কেঁদে ফেলে অনেকে। এসবের পেছনে হরমোনের প্রভাবও থাকে। যত্ন করে, আদর দিয়ে, ধৈর্যের সঙ্গে আস্তে আস্তে ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে হবে, সংশোধন করতে হবে। প্রয়োজনে শাসনও করা যায় অল্পবিস্তর। তবে মেজাজ হারানো চলবে না। কোনো কিছু নিষেধ করতেও বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো বিষয়ে নিরুত্সাহিত করার আগে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে তাকে বোঝাতে হবে, কেন বিষয়টি তার জন্য খারাপ। বোঝানোর পর সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার টিনেজারদেরই দিতে হবে।

 

নেশার ফাঁদ

টিনেজ জীবনের সবচেয়ে বড় মরণফাঁদ ড্রাগ আসক্তি। ডিপ্রেশন, কৌতূহল, কুসঙ্গ নেশার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া সিগারেট আসক্তি তো রয়েছেই। পারিবারিক জীবনে সমস্যা, অবহেলাও একটি বড় কারণ। এ ক্ষেত্রে টিনেজদের সঙ্গে পারিবারিক দৃঢ় বন্ধন তৈরির বিকল্প নেই। তাদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রাখতে হবে, কখন বাসায় আসছে- যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন।

তবে ব্যাপারটা যেন কিশোর বা কিশোরীটির জন্য অস্বস্তিকর হয়ে না দাঁড়ায় তাও মাথায় রাখতে হবে। তাদের সুন্দরভাবে আসক্তির খারাপ দিকগুলো বোঝাতে হবে, সচেতন করতে হবে।

 

স্ক্রিন ও সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি

আজকাল ইন্টারনেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সহজলভ্যতার  কারণে সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইনে দিনের একটা বিশাল সময় কাটায় টিনেজরা। রাতের ঘুম বাদ দিয়ে এসবে সময় কাটানো একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এর প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যে, পড়াশোনায়। তা ছাড়া শো-অফ আর ইমেজ রক্ষার চাপে পড়ে টিনেজরা অনেক সময় অবিবেচক বা আপত্তিকর কাজও করে বসে। স্ক্রিনে অযথা সময় অপচয় করায় মনোযোগ ও সময়ের ঘাটতি দেখা যায় প্রচুর। সম্ভব হলে স্ক্রিন সময় নির্দিষ্ট করে দিতে হবে ও রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে স্ক্রিন বন্ধ করতে হবে। যদিও বর্তমান যুগে কাজটা কঠিন, তবু কঠোর হতে হবে এ বিষয়ে।

 

যৌনতার প্রতি কৌতূহল

টিনেজে যৌনতার প্রতি কৌতূহল একটা অতি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আমাদের মতো অবরুদ্ধ সমাজে বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার সুযোগ নেই। বড়রাও এ বিষয়টি সযত্নে এড়িয়ে যান। ফলে টিনেজরা নানা রকম ভুল মাধ্যম থেকে বিকৃত ও অসত্য, অপূর্ণাঙ্গ তথ্য শেখে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলেও তা ভুলভাবে প্রকাশ করে। মেয়েদের ক্ষেত্রে যা হয় অনেক বেশি অবদমিত, ছেলেদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি উগ্র। এর অনেকটাই আমাদের সমাজের মানসিকতার প্রভাব।

যেহেতু স্বাভাবিক শিক্ষার জায়গাটি সংকুচিত এবং প্রযুক্তির অবাধ যুগে পর্নের রয়েছে সহজপ্রাপ্যতা, তাই টিনেজদের বিশেষ করে কিশোরদের পর্ন আসক্তি একটি ব্যাপক সমস্যা। বাইরের দেশেও এ সমস্যা প্রকট, তবে ওই সব দেশে স্কুলে, বাড়িতে, বইপত্রে যৌন সচেতনতামূলক প্রচারণার ব্যবস্থা  রয়েছে, যা এ দেশেও আশু চালু করা জরুরি। পরিবারের বড়দেরও এ বিষয়ে দ্বিধা, গোপনীয়তার বেড়া ভেঙে ছোটদের সঙ্গে সহজভাবে আলাপ করতে হবে, যৌন সচেতনতামূলক বই পড়াতে হবে, মানবিকতা ও নীতিবোধ শিক্ষা দিতে হবে।

টিনেজারটি যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। এমনকি না বুঝে সম্মতিতেই কারো হাতে যৌন নিপীড়ন হচ্ছে কি না, সেটিও দেখা জরুরি। অনেক সময় মেয়েদের দিকে বেশি নজরদারি করা হয়, যাতে তারা অস্বস্তিবোধ করে, আবার ছেলেদের দিকে একেবারেই দৃষ্টি দেওয়া হয় না। দুটিই বদলানো দরকার। মেয়েদের স্বস্তির জায়গাটা তৈরি করে দিতে হবে, নজর দিতে হবে ছেলেদের দিকেও।

পড়ার চাপ

এ বয়সে আমাদের দেশের বাচ্চারা অনেক পাবলিক পরীক্ষায় বসে। জেএসসি হোক বা ও লেভেল—পড়াশোনার চাপের সঙ্গে যুক্ত হয় মা-বাবা ও অন্যদের প্রত্যাশা পূরণের চাপ, তা সেটা বইবার সামর্থ্য শিক্ষার্থীর থাক বা না থাক। এ থেকে বেরিয়ে এসে অভিভাবকদের আরেকটু সমঝদার হতে হবে, বাচ্চার সামর্থ্য জানতে হবে, তার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে ডিপ্রেশন থেকে শুরু করে আত্মহত্যা পর্যন্তও গড়াতে পারে।

মূল কথা হচ্ছে, আপনার পরিবারের টিনেজ সন্তানটিকে জানুন, বুঝুন, গুরুত্ব দিন, দায়িত্ব দিন। মাথায় রাখুন, সে এখন আর ছোট্টটি নেই, তার সঙ্গে তার বয়স উপযোগী ব্যবহার করুন। সুফল অবশ্যই আসবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা