kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

গ্রীষ্মের রোজায় জীবন যেমন

এই গরমে রোজায় স্বস্তি পেতে করণীয় কী— জানিয়েছেন এ্যাপোলো হসপিটালসের প্রধান পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মকর্তা চিকিত্সক ইশরাত শর্মী। লিখেছেন আতিফ আতাউর

৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গ্রীষ্মের রোজায় জীবন যেমন

মডেল : মৌসুম ছবি : কাকলী প্রধান

রমজান আমাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক রুটিন অন্য সময়ের চেয়ে বদলে যায়। খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে রাতের ঘুমেও দেখা দেয় পরিবর্তন। তার ওপর এবার তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই আগে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করলে শারীরিক অসুস্থতাসহ অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়িয়ে চলা যাবে। খাবারদাবার, জীবনযাপন, বাইরে চলাফেরা, ফিটনেস রুটিনে পরিবর্তনের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবেও প্রস্তুতি নিতে হবে রোজার জন্য।

কী খাবেন

রোজা সংযমের মাস। তাই খাবারদাবারে সংযমী হওয়া উচিত। ইফতারের শুরুতেই খেজুর অথবা খোরমা খাবেন। এটি খুব তাড়াতাড়ি শরীরে শক্তি জোগায়। রোজায় যেহেতু দিনে পানি পানের সুযোগ নেই। তাই ইফতার থেকে ঘুমের আগ পর্যন্ত বেশি করে পানি পান করুন। শরবত ও বিভিন্ন মৌসুমি ফলের জুসে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করার পাশাপাশি পাওয়া যাবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল। সাহরিতেও পর্যাপ্ত পানি পান করে নেওয়া ভালো। ইফতার ও সাহরি মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ গ্লাস পানি ও পানীয় পান করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ইফতারে ভাজাপোড়ার বদলে দই-চিঁড়া, কাঁচা ছোলা, সালাদ ও স্যুপের মতো সহজপাচ্য খাবার খান। রাতের খাবারে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ জাতীয় খাবার খেতে হবে। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন সবুজ শাক-সবজি খেতে হবে। সাহরিতে বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার যেমন—লাল আটা, শিম, বাদাম, ছোলা, ডালসহ সবজির মেন্যু বেশি খান। এগুলো হজম হয় ধীরে ধীরে। তাই অনেক সময় পর খিদে ভাব হয়। সারা দিন না খেয়ে থাকতে হবে ভেবে সাহরিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়। আবার ঘুম কম হবে ভেবে সাহরি না খেয়ে রোজা রাখাও ঠিক নয়। সাহরির সময় শেষ হওয়ার কিছু আগেই খাওয়া শেষ করা ভালো। রোজা রেখে শরীর বেশি দুর্বল লাগলে ইফতারের পর ডাবের পানি বা খাবার স্যালাইন খেতে পারেন।

কী খাবেন না

ইফতারিতে ভাজাপোড়া খাবার একেবারেই বাদ দিন। এ ধরনের খাবার স্বাস্থ্যের জন্য মোটেই ভালো নয়। খুব ইচ্ছা হলে বাড়িতে কম তেলে ভাজা দু-একটি মেন্যু থাকতে পারে। এতে স্বাদ কম হলেও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। রোজায় চিনিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব কম খান। এতে রক্তে চিনির মাত্রা তারাতাড়ি বেড়ে যায়, ওজন বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া চা, কফি ও কোমল পানীয় পান যথাসম্ভব বাদ দিন। না হলে পানিশূন্যতা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে। বাইরের কেনা শরবত, বোতলজাত কৃত্তিম জুস, খাওয়া পরিহার করতে হবে। গরু, খাসি বা অন্য কোনো লাল মাংস না খাওয়া নিরাপদ। ইফতারে একসঙ্গে বেশি খাবার খাওয়া যাবে না। ইফতারের পর রাতের খাবার খাওয়াটাও জরুরি।   

গর্ভবতী ও রোগীদের রোজা

রোজার সময় গর্ভবতী মায়েরা রোজা রাখবেন কি না এ নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। গর্ভধারণ থেকে ডেলিভারির পর দেড় মাস পর্যন্ত একজন মাকে নিয়মিত পরামর্শ ও চেকআপের মধ্যে রাখতে হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নীরিক্ষা শেষে চিকিত্সকের পরামর্শ মেনে অবশ্যই একজন গর্ভবতী মা রোজা রাখতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে গর্ভস্থ শিশুর পুষ্টির জন্য দিনের বিভিন্ন সময় যেসব খাবার খেতে হয় সেগুলোই ইফতারে, ইফতারের এক ঘণ্টা পরে, রাতের খাবারে এবং সাহরিতে অল্প অল্প করে খেতে হবে। গর্ভবতী মায়েদের খেজুর, কলা, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, আয়রন, ফাইবার ও ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার খেতে হবে। যাঁরা ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসুখে ভুগছেন, তাঁরাও রোজা রাখতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের অবশ্যই চিকিত্সকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী চলতে হবে। ডায়াবেটিক রোগীদের ইনসুলিনের সঙ্গে ডায়েট ব্যালান্স করতে হবে। বয়স্কদের ফলের জুস না খেয়ে সরাসরি ফল খাওয়া ভালো। আবার বিভিন্ন বাহারি শরবতের চেয়ে ডাবের পানি, ইসবগুলের ভুসির শরবত বয়স্ক ও রোগীদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। 

রোজায় জীবনযাপন

রোজার সময় কর্মজীবীদের রুটিনে পরিবর্তন দেখা দেয়। ভোর রাতে সাহরির জন্য উঠতে হয়। এ জন্য অনেকের ঘুমে ঘাটতি দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে কর্মক্ষেত্রে। ক্লান্তি ও মনোযোগের অভাবসহ বিভিন্ন শারীরির সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ জন্য রাতে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শুয়ে পড়ুন। গরমের দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে শরীরের পিএইচের পরিবর্তন ঘটে। এতে স্বাভাবিক বিপাক ক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। শরীর ঘেমে লবণ ও মিনারেল বের হয়ে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, চোখে ঝাপসা দেখা, কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ নষ্ট হওয়া সমস্যা হতে পারে। তাই যথাসম্ভব ঠাণ্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে থাকতে চেষ্টা করুন। রোদে বাইরে যেতে হলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করুন। ঠাণ্ডার সমস্যা না থাকলে দিনে দুবার গোসল করতে পারেন। এ ছাড়া দিনে কয়েকবার মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিন। গরমে আরাম পেতে সুতির পোশাক পরুন। এ সময় টেনশনমুক্ত থাকার চেষ্টা করাও জরুরি। কারণ দুশ্চিন্তা থেকে শরীরে নানা বিরূপ প্রভাব পড়ে। সব কিছু ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করুন। মুড নষ্ট হয়—এমন কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মন ভালো থাকার ওপর শরীরের সুস্থতার অনেক কিছু নির্ভর করে।

শরীরচর্চা

রোজায় শরীরচর্চা করবেন কী করবেন না এ নিয়েও অনেকের দ্বিধা থাকে। এটা নির্ভর করে শরীরের ফিটনেসের ওপর। কেউ নিয়মিত তারাবি নামাজ পড়লে এ সময় সুস্থতার জন্য শরীরচর্চার কাজটুকু হয়ে যায়। এ ছাড়া কেউ চাইলে অন্যান্য সময়ের মতোই রোজার দিনে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটতে পারেন। তবে রোজা রেখে না হেঁটে ইফতারের পর এক ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে হাঁটতে বের হওয়া ভালো। আর যাঁরা তারাবি নামাজ পড়তে যাবেন, তাঁদের আর আলাদা করে হাঁটতে যাওয়ার দরকার নেই।

গবেষণায় দেখা গেছে, বছরে এক মাস দিনের বেলা উপোস থাকার অনেক উপকারিতা। এ ছাড়া সংযমের এই মাসে দিনের বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। ফলে অনেক ক্ষতিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস এই মাসে ত্যাগ করা সম্ভব হয়। অনেক শৃঙ্খলা শেখার অভ্যাস তৈরি হয় রোজার মধ্যে দিয়ে।

মন্তব্য