kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

কাজের মানুষ

কাজ বাড়ে, বেতন বাড়ে না

দিন দিন অফিসে আপনার কাজের দায়িত্ব বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও পদোন্নতির কোনো খবর নেই। এদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়েই আজকের লেখা।

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কাজ বাড়ে, বেতন বাড়ে না

সৈয়দ আখতারুজ্জামান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিয়ন্ড ইনস্টিটিউট অব ট্রেনিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক লেখক ও প্রশিক্ষক

যে কারণে সমস্যার সৃষ্টি

মূলত ব্যক্তির দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ নীতি সম্পর্কে উভয়ের ভুল-বোঝাবুঝি থেকে এ সমস্যার সূত্রপাত। কর্মী ও প্রতিষ্ঠান (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা মানবসম্পদ বিভাগ) দুটি ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে বিষয়টিকে দেখে। প্রতিষ্ঠান মনে করছে, কর্মী এখনো পদোন্নতির অযোগ্য। কর্মী ভাবছেন, তার চেয়ে দক্ষ কে আছে! অথচ দক্ষতার সংজ্ঞা একেক প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন। কর্মী জানেন না প্রতিষ্ঠানের ‘দক্ষতা মূল্যায়ন পদ্ধতি’ কী, কোন বিষয়কে ‘দক্ষতা নিরূপণ চাবিকাঠি’ বা ‘কেপিআই’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘এসিআর’ বা ‘বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন’-এ কী বিষয়ে কর্মীকে সতর্ক থাকতে হবে। দক্ষতা বাড়ার ধাপগুলো কিভাবে সাজানো হয়। দক্ষতা বাড়লে কর্মী কী সুবিধা পাবেন, প্রতিষ্ঠানের পদোন্নতির নীতিমালা কী ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠানও অনেক সময় এসব বিষয়ে কর্মীকে জানায় না। ফলে কর্মীর মনে এক ধরনের মনগড়া স্বপ্ন বাসা বাঁধে। যার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার হয়তো কোনো মিলই নেই। ফলে এমন ভুল-বোঝাবুঝি। অথচ কর্মীর মানসিক অবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তরিকভাবে তাকে বুঝিয়ে বললে বা পরামর্শ দিলে হয়তো উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট থাকবে।

 

যাঁরা সমস্যায় পড়েন

কর্মজীবনে অনেকেই এমন সমস্যার মুখোমুখি হন। অনেকেই মনে করেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁকে পছন্দ করেন না। কিংবা তার চেয়ে অমুককে বেশি পছন্দ করেন। তাই তাঁর ওপর কাজের দায়িত্ব বাড়ানো হচ্ছে শাস্তিস্বরূপ। অমুকের পদোন্নতি হলো, আমার হলো না কেন? আমি কি কম যোগ্য? প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি কমবেশি সর্বত্রই বিদ্যমান। আপনি হয়তো আসলেই পরিস্থিতির শিকার, তার পরও এ ধরনের অবস্থায় এমনটি ভাবার আগে নিরপেক্ষভাবে নিজেকে কিছু প্রশ্ন করুন।

 

যে প্রশ্নগুলোর নিরপেক্ষ উত্তর জরুরি

কেন দায়িত্ব বেড়ে চলে? দায়িত্ব বাড়লে আপনার কী কী লাভ বা ক্ষতি হয়? কে দায়িত্ব বাড়ায়? কেন বাড়ায়? এতে প্রতিষ্ঠানেরই বা লাভ বা ক্ষতি কী? দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার বেতন বাড়ছে না কেন? কী কী কারণে বেতন বাড়ে? বেতন বাড়ানো বা না বাড়ানো কার ওপর নির্ভরশীল? আপনার খুশি-অখুশিতে প্রতিষ্ঠানের কী যায়-আসে? আছে এমন হাজারও প্রশ্ন! সবার সম্ভাব্য উত্তর আপনার জানা দরকার।

 

বাস্তবে যা হয়

সাধারণত যিনি যে কাজটি ভালো করতে পারেন তাঁকেই সে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কে কোন কাজটি ভালো করতে পারেন সেটি আবিষ্কার করা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি পরীক্ষাসাপেক্ষ ব্যাপার। বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কোনো দক্ষতা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই তার নিজস্ব উপায়ে যাচাই করতে হয়। সাক্ষাত্কার গ্রহণ করে কর্মী নির্বাচন করার পর তার দক্ষতার মাত্রা কাজ চলাকালে নির্ধারণ করা হয়। ধীরে ধীরে একজন অদক্ষ কর্মী দক্ষ হয়ে ওঠেন। একসময় পুরো বিভাগের প্রধান হয়ে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত হন। এটাই প্রচলিত পদ্ধতি। এই পুরো সময়ে যেমন প্রতিষ্ঠানকে অপেক্ষা করতে হয়, তেমনি কর্মীকেও ধৈর্য ধরতে হয়। কর্মী যেমন ভালো বেতনের পাশাপাশি পেশার উন্নতি চান, প্রতিষ্ঠানও তেমনি চায় অনুগত ও দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে। আমরা দুটি দিকই আলোচনা করব—

 

আপনার ভাবনার বিপক্ষে

আপনি কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন এবং নিজেই ভাবুন পুরো ব্যাপারটি নিরপেক্ষভাবে দেখতে পারছেন কি না। 

১.   আপনাকে যে দায়িত্বের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল, শুরু থেকেই তার পুরো ভার আপনার ওপর চাপানো হয়েছিল কি না? সাধারণত একজন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়ামাত্রই প্রতিষ্ঠান সংগত কারণেই পুরো দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে পারে না। দিন দিন আপনার আসল দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আসলে কাজ বাড়িয়ে দেওয়া হয়নি, এত দিন আপনার কাজ কমিয়ে রাখা হয়েছিল।

২.   আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপনাকে অনেক কাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মতো দক্ষ বলে মনে করছেন। অথবা অনেক দায়িত্ব পালনের জন্য আপনি যথেষ্ট দক্ষ হয়েছেন কি না তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। পদোন্নতি দেওয়ার আগে প্রায়ই কর্মীর অজান্তে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। অনেকেই এ সময় ধৈর্য হারান, আবার অনেকে বুঝতে পারেন, একাগ্রতার সঙ্গে এগিয়ে চলেন।

৩.   আপনার দায়িত্ব আসলে বাড়েনি, আপনার সহকর্মীদের ওপর আপনার চেয়ে দায়িত্ব কম। ফলে আপনার দায়িত্ব বেশি বলে মনে হচ্ছে।

৪.   আপনি যেকোনো কারণেই হোক, আপনার দায়িত্ব পালনে ক্লান্ত বোধ করছেন। উত্সাহ পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে কাজের চাপ বেশি। ফলে প্রতিটি কাজই আপনার কাছে বোঝা মনে হচ্ছে।

আপনার ভাবনার পক্ষে পরামর্শ

আপনার ভাবনা যদি সত্যিই হয়, তাহলে আপনার জন্য আছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ—

১.   সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হচ্ছে, কোনোভাবে হাল ছেড়ে দিয়ে প্রথমেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না। চাকরি ছেড়ে দেওয়াই প্রধান সমাধান নয়। আপনার চাকরি আপনার মূল্যবান সম্পদ। অন্য কারো রাজনীতির শিকার হয়ে বা ভুল-বোঝাবুঝির কারণে আপনি চাকরি ছাড়বেন কেন?

২.   আপনিই আপনার সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। নিজেকে আরো ধৈর্যশীল করে তুলুন। কেন এমন হচ্ছে আরো মনোযোগ দিয়ে ইতিবাচকভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।

৩.   মানবসম্পদ বিভাগে যোগযোগ করে ‘পদোন্নতি বিষয়ক নীতিমালা’ কিংবা ‘কর্মী মূল্যায়ন পদ্ধতি’ বিষয়ক নীতিমালা সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করুন। মাঝেমধ্যে এ বিষয়ক তথ্য পাওয়া জটিল হতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নীতিমালাই নেই। আবার যাদের আছে, তাদের কোনো বাস্তবায়ন নেই। সে ক্ষেত্রে কার সঙ্গে পরামর্শ করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে তা আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। ধৈর্য হারালে চলবে না।

৪.   যাঁর হাতে আপনার পদোন্নতি নির্ভর করে তাঁকে পাঠ করা জরুরি। মানতে না চাইলেও এটা সত্য যে অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভালোলাগা বা মন্দলাগার ওপর শত শত জুনিয়রের ক্যারিয়ার নির্ভর করে।

৫.   আপনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন। আপনি যা ভাবছেন তার পক্ষের যুক্তিগুলো তুলে ধরুন। আপনার ভাবনায় ভুল থাকলে তিনি শুধরে দিতে পারবেন। তবে শুরুতেই আপনার বসকে ডিঙিয়ে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত না করাই ভালো। হিতেবিপরীত হতে পারে।

৬.   দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না। সময় নিন। বোঝার চেষ্টা করুন, দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে আপনার নিজস্ব দক্ষতার উন্নতি হচ্ছে কি না। মনে রাখবেন, আপনার নিজস্ব দক্ষতা আপনার চিরস্থায়ী সম্পদ। এ সম্পদ কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

৭.   বিচক্ষণ ও নির্ভরযোগ্য সহকর্মীর পরামর্শ নিন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রয়োজনবোধে ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের আরো ওপরস্থ কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে দেখা করে আলোচনা করতে পারেন। অবস্থা ও পরিপ্রেক্ষিত এখানে বড় বিবেচ্য বিষয়।

৮.   প্রতিদিনের কাজের প্রতিবেদন বা ‘ডেইলি অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট’ তৈরি করুন। আপনার কাজের প্রতিবেদন একসময় আপনার অবস্থানকে অনেক শক্তিশালী করবে। প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা করতে সুবিধা হবে, আপনি প্রতিষ্ঠানের জন্য কী করেছেন।

৯.   আপনার মানসিক অবস্থা অন্য কাউকে বুঝতে না দেওয়া ভালো। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি পুরো বিষয়টি না বুঝছেন, ততক্ষণ সব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন। কোনো রকম অবেহেলা না করে উদ্দীপ্তভাবে আপনার দায়িত্ব পালন করে যান। আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে তা আপনার স্বাভাবিক দক্ষতাকেও ম্লান করে দেবে।

১০.  সব চেষ্টার পরও যদি আপনার মনে হয় আপনি চক্রান্তের শিকার, তখন সমস্যার সামধান না হলে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি যথাযথ কর্তাব্যক্তিকে জানান। এ সময় সাধারণত তিন বছরের বেশি হওয়া উচিত নয়। মনে রাখবেন, অতি দীর্ঘ সময় একই পদে একই বেতনে এবং একই দায়িত্ব পালন করে যাওয়া আপনার ক্যারিয়ারের জন্য জটিল সমস্যা। এতে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি দুই-ই সুফল থেকে বঞ্চিত হয়।

মন্তব্য