kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

অন্য কোনোখানে

বর্মণপাড়ার খেজুর ভাঙা উত্সবে

ফখরে আলম   

১৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বর্মণপাড়ার খেজুর

ভাঙা উত্সবে

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। শত শত মানুষ চাঁচড়া বর্মণপাড়ার দিকে ছুটছে। গ্রামের ইট বিছানো রাস্তায় মানুষের পাশাপাশি ইজিবাইক, সাইকেল ও মোটরসাইকেল ছুটছে। গন্তব্য বর্মণপাড়ার হরিতলা। হরিতলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ক্ষীণধারার মুক্তেশ্বর নদী। বিকেল ৪টা। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। এর মধ্যে শুরু হলো খেজুর ভাঙা উত্সব। উলুধ্বনি ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই।

চৈত্রসংক্রান্তির দিন এই খেজুর ভাঙা উত্সবে যশোরের চাঁচড়া বর্মণপাড়া গ্রাম নতুনরূপে সাজে। মাতোয়ারা হয় বর্মণপাড়া। বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ দিন পড়ন্ত বিকেলে একদল সন্ন্যাসী খালি পায়ে খেজুর গাছের মাথায় উঠে কাঁটাযুক্ত পাতার ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করে। নতুন বছরের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনায় মত্ত হয়। সন্ন্যাসীদের ছুড়ে দেওয়া কচি খেজুর ফল ভোগ হিসেবে পেয়ে আত্মহারা হয়ে ওঠে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। নারীদের উলুধ্বনিতে খেজুর ভাঙা উত্সব আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়।

শত শত বছর ধরে যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া বর্মণপাড়াসহ শেখহাটি, মণিরামপুর ও বাঘারপাড়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামে খেজুর ভাঙা উত্সব জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাংলা বর্ষের শেষ দিন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। খেজুর ভাঙা উত্সবে অংশগ্রহণকারী প্রবীণ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চৈত্র মাসের শেষ দিন শিবভক্ত বানরাজা তাঁর সঙ্গী-সাথি নিয়ে নাচে-গানে আত্মহারা হয়ে শরীরের রক্ত বের করে ছেলের উদ্দেশে সমর্পণ করেন। বানরাজার রক্ত উপহার পেয়ে শিব খুব খুশি হয়েছিলেন। এ ঘটনার পর থেকেই শিবকে তুষ্ট করার জন্য চৈত্রসংক্রান্তির দিন চড়ক উত্সব, খেজুর ভাঙা উত্সবে ভক্তরা আত্মহারা হয়।

কয়েকটি গ্রামে খেজুর ভাঙা উত্সব ঘুরে দেখা গেছে, নারীরা নির্দিষ্ট একটি খেজুর গাছের গোড়ায় দুধ ও ডাবের জল ঢেলে পূজা করে। এরপর সন্ন্যাসী দলনেতা নতুন একটি গামছা শরীরে জড়িয়ে খেজুর গাছকে প্রণাম জানিয়ে খালি পায়ে গাছে ওঠেন। সন্ন্যাসীর দল গাছের মাথায় উঠে কাঁটাযুক্ত খেজুর পাতার ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করতে থাকেন। কিন্তু পায়ে কাঁটা ফোটে না। শত শত মানুষ খেজুর গাছের নিচে ভিড় জমায়। সন্ন্যাসীদের ছুড়ে দেওয়া খেজুর ভোগ হিসেবে খাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। তারপর আরো কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় খেজুর ভাঙা উত্সব।

চাঁচড়া বর্মণপাড়ার হরিতলায় খেজুর ভাঙা উত্সব উপলক্ষে মেলা বসে। সন্ধ্যার পর থেকে চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই গ্রামের খেজুর ভাঙা উত্সবে অংশ নেন সন্ন্যাসী সুনীল, পরিতোষ, বাসুদেব, উজ্জ্বল, শিমুলসহ আরো কয়েকজন। সন্ন্যাসী সুনীল বললেন, ‘আমি ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে খেজুর ভাঙায় অংশ নিচ্ছি। এক দিন আগে থেকে উপোস থাকি। তারপর খেজুর গাছে উঠি। গাছে কাঁটা তো কী হয়েছে? ভগবান আমার পা অক্ষত রাখে।’ গ্রামের তাপস কুমার বর্মণ বললেন, ‘শত বছর ধরে আমাদের গ্রামে চৈত্র মাসের শেষ দিন খেজুর ভাঙা উত্সব হচ্ছে। এটি আসলে শিব পূজা। শিবকে তুষ্ট করার জন্যই আমাদের এই আয়োজন। গ্রামে মেলা বসে। আত্মীয়-স্বজন, মেয়ে-জামাই আসে। সবাই খেজুর ভাঙা উত্সবে মাতোয়ারা হয়।’

ছবি : ফিরোজ গাজী

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে যশোর, ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। শহরের জিরো পয়েন্ট দড়াটানা থেকে বর্মণপাড়া ইজিবাইক ভাড়া ১০০ টাকা।

মন্তব্য