kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

নির্বাচনী সহিংসতার জের

রাজাপুরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ ৩ গ্রামের মানুষ অবরুদ্ধ

মেহেদী হাসান জসীম, রাজাপুর (ঝালকাঠি)   

৩০ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পাঁচ দিন ধরে রিকশা নিয়ে রাজাপুরে যেতে পারছেন না বৃদ্ধ রিকশাচালক হেদায়েত আলী হিদু। পথে কিছু যুবক রিকশা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। তাই তাঁর আয়-রোজগার বন্ধ। পরিবার-পরিজন নিয়ে দারুণ কষ্টে দিন পার করছেন। এভাবে চলতে থাকলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের না খেয়ে মরতে হবে।

আতঙ্কিত মুখে কথাগুলো বলছিলেন হেদায়েত আলী হিদু। উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে তিন গ্রামের পাঁচ সহস্রাধিক মানুষকে। তারা সবাই ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। ধানসিঁড়ি নদীর কোলঘেঁষে ছোট্টগ্রাম হাইলাকাঠি, পাড়েরহাট ও পূর্ব ইন্দ্রপাশা। এই তিনটি গ্রাম নিয়ে ২ নম্বর ওয়ার্ড গঠিত। সদ্য সমাপ্ত উপজেলা নির্বাচনের সময় ঘটে যাওয়া সহিংসতার জের ধরে ওই তিন গ্রামের মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে জানিয়েও কোনো ফল পায়নি গ্রামবাসী। আর মাত্র কয়েক দিন পর এইচএসসি পরীক্ষা। এই অবরুদ্ধ অবস্থার শিকার বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থীও। এই অবস্থা চলতে থাকলে পরীক্ষার্থীরাও বিপাকে পড়বে।

জানা যায়, গত ২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাইলাকাঠি ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান ও বিদ্রোহী প্রার্থী মিলন মাহমুদ বাচ্চুর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাতে পশ্চিম ইন্দ্রপাশা গ্রামের নৌকার চার সমর্থক আহত হয়। অবরুদ্ধ ওই তিন গ্রামের মানুষদের পশ্চিম ইন্দ্রপাশা অথবা সাউথপুর হয়ে উপজেলা সদরে আসতে হয়। কিন্তু সংঘর্ষে আহত ও তাদের স্বজনরা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ওই তিন গ্রামের মানুষদের উপজেলা সদরে আসতে বাধা দিচ্ছে। সরেজমিন গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই তিন গ্রামের মানুষের একত্র হওয়ার জায়গা পাড়েরহাটে গেলে শত শত সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষোভের কথা জানায়।

বৃদ্ধ মোবাশ্বের আলী ব্যাপারী বলেন, ‘নির্বাচনে পক্ষ-বিপক্ষ থাকতেই পারে। তাই বলে সারা বছর কি মারামারি করতে হবে? আমরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। হাট-বাজারে না যেতে পারলে আয়-দায়, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আমার বাড়ি হাইলাকাঠি গ্রামে হওয়ায় রাজাপুর থেকে আসার সময় পিটিয়ে আমার হাত ভেঙে দিয়েছে। আমাদের মঠবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক ছিলেন। তাই তিনিও বিপদে পড়েছেন এবং আমাদেরও কোনো সহায়তা করতে পারছেন না। এখন আমরা কার কাছে যাব!’

রাজাপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মো. রাসেল হাওলাদার এ বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার কলেজ থেকে প্রবেশপত্র নিয়ে ফেরার পথে তাঁকে মারধর করা হয়। রাসেল বলেন, ‘আমাদের তিনটি গ্রাম থেকে এ বছর ১২-১৫ জন শিক্ষার্থীর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা। তাঁরা কেউ কলেজে যেতে পারছে না। কিছু দিন পরই পরীক্ষা। তাই আমরা খুব চিন্তায় আছি।’

একই কলেজের শিক্ষার্থী মো. এনামুল হোসেন খানকেও বৃহস্পতিবার মারধর করে স্থানীয় কিছু যুবক। এনামুলের বাবা নুর মুহাম্মদ বলেন, ‘গত মঙ্গলবার রাজাপুর থানা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ তিনজন এসেছিলেন পাড়েরহাটে। তাঁরা আমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে গেলে ছেলেকে কলেজে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ছেলেটাকে মারধর করা হলো। এভাবে চলতে থাকলে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে।’

রাজাপুর মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সোহেল রানা নিরাপত্তাহীনতার কারণে পাঁচ দিন ধরে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে না।

পাড়েরহাট গ্রামের বাউলশিল্পী আব্দুস ছালাম বলেন, ‘আমরা একটা শান্তিপূর্ণ সমাজের প্রত্যাশা করি। যেখানে সবাই মিলেমিশে আনন্দে থাকব। কারো মধ্যে কোনো বিভেদ থাকবে না। তাই প্রশাসনের কাছে দ্রুত এর সমাধান আশা করছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এমনটা হয়ে থাকলে তা খুবই অন্যায়। আমি খোঁজ নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

রাজাপুর থানার ওসি মো. জাহিদ হোসেন বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীকে সর্বাত্মক সহায়তা করা হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা