• ই-পেপার

কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম

বাগদাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
বাগদাদের হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না
সংগৃহীত ছবি

একটি জাতির মৃত্যু সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে না। অনেক জাতি পরাজিত হয়েছে তলোয়ারের আঘাতে, আবার অনেক জাতি ইতিহাস থেকে মুছে গেছে নিজেদের স্মৃতি হারিয়ে। প্রথম মৃত্যুর শব্দ শোনা যায়; দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে স্মৃতি যেমন পরিচয়ের ভিত্তি, সভ্যতার জীবনেও তেমনি স্মৃতি তার আত্মপরিচয়ের উৎস। আমরা কে, কোথা থেকে এলাম, কীভাবে চিন্তা করতে শিখলাম, কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছি—এই দীর্ঘ যাত্রার নামই সভ্যতা। আর এই যাত্রার দলিল সংরক্ষিত থাকে বইয়ে, পাণ্ডুলিপিতে, গ্রন্থাগারে। তাই কোনো গ্রন্থাগার পুড়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু বই নষ্ট হয়ে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো একটি সভ্যতার স্মৃতিভাণ্ডারে আগুন লেগে যাওয়া।

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে এমন বহু আগুনের কথা আমরা জানি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা সাধারণত আগুনের দিকে তাকাই, ছাইয়ের দিকে নয়। আমরা বাগদাদের পতনের কথা বলি, কিন্তু ভাবি না সেই পতনের পর কোন কোন প্রশ্ন হারিয়ে গেল। আমরা আন্দালুসের রাজনৈতিক পরাজয় নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু খুব কমই আলোচনা করি সেই বইগুলোর কথা, যেগুলো আর কখনো কোনো পাঠকের হাতে পৌঁছায়নি।

ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, মানুষ হত্যার চেয়ে বই হত্যা কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনে। কারণ একজন মানুষের মৃত্যু একটি জীবনের সমাপ্তি ঘটায়, কিন্তু একটি বইয়ের মৃত্যু অনেক সম্ভাব্য জীবনের চিন্তাকে অসম্পূর্ণ করে দেয়।

মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বকে আমরা প্রায়ই স্বর্ণযুগ বলে উল্লেখ করি। কিন্তু এই শব্দটির ভেতরের অর্থ নিয়ে খুব কম ভাবি। স্বর্ণযুগ মানে শুধু ক্ষমতা, সম্পদ বা সামরিক সাফল্য নয়। স্বর্ণযুগ মানে এমন এক সময়, যখন একটি সভ্যতা প্রশ্ন করতে ভয় পায় না। বাগদাদের রাস্তায় তখন একই শহরে ফকিহ, দার্শনিক, চিকিৎসক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং ভাষাবিদ হাঁটতেন। মতভেদ ছিল, বিতর্ক ছিল, এমনকি তীব্র বিরোধও ছিল। কিন্তু তার পরও জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। কারণ সভ্যতাগুলো প্রশ্নের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে, উত্তরের ভেতর দিয়ে নয়। এখানেই গ্রন্থাগারের প্রকৃত তাৎপর্য।

গ্রন্থাগার মূলত বইয়ের গুদাম নয়; এটি একটি সভ্যতার আত্মসমালোচনার স্থান। সেখানে অতীত বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে। মৃত মানুষের চিন্তা জীবিত মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ যে কথোপকথন চালিয়ে যায়, গ্রন্থাগার তারই দৃশ্যমান রূপ। সম্ভবত এ কারণেই ইতিহাসে স্বৈরতন্ত্র বইকে ভয় পেয়েছে। আগুন প্রথমে গ্রন্থাগারে যায়, কারণ ক্ষমতা জানে—একটি বইয়ের ভেতরে কখনো কখনো একটি সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি শক্তি লুকিয়ে থাকে। তবে মুসলিম বিশ্বের ট্র্যাজেডি শুধু এই নয় যে তার গ্রন্থাগারগুলো ধ্বংস হয়েছে। আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা ধীরে ধীরে গ্রন্থাগার হারানোর শোকও ভুলে গেছি।

আজ আমাদের শহরে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক বেশি শিক্ষার্থী আছে। তথ্যের প্রাচুর্যও অভূতপূর্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জ্ঞান কি সত্যিই বেড়েছে? তথ্য ও জ্ঞানের পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য মানুষকে সংবাদ দেয়, জ্ঞান মানুষকে দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। তথ্য জানায় কী ঘটেছে; জ্ঞান বুঝতে শেখায় কেন ঘটেছে। একটি সভ্যতা তখনই সংকটে পড়ে, যখন সে তথ্য সংগ্রহকে জ্ঞানচর্চা বলে ভুল করতে শুরু করে।

মুসলিম বিশ্বের বর্তমান সংকটের একটি অংশ সম্ভবত এখানেই নিহিত। আমরা আমাদের অতীতকে স্মরণ করি, কিন্তু তার সঙ্গে সংলাপ করি না। আমরা ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করি, কিন্তু তাকে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাই না। ফলে ঐতিহ্য ধীরে ধীরে জীবন্ত উত্তরাধিকার থেকে স্মারকে পরিণত হয়। কোনো সভ্যতার জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর নেই।

কারণ সভ্যতার পতন শুরু হয় না তখন, যখন তার গ্রন্থাগার পুড়ে যায়। পতন শুরু হয় তখন, যখন গ্রন্থাগার অক্ষত থাকে কিন্তু পাঠক হারিয়ে যায়; যখন বই টিকে থাকে কিন্তু প্রশ্ন হারিয়ে যায়; যখন স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে কিন্তু তার অর্থ বিস্মৃত হয়। এই অর্থে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের কান্না অতীতের কোনো বিলাপ নয়। এটি বর্তমানের প্রতিধ্বনি। সেই প্রতিধ্বনি আমাদের জিজ্ঞেস করে—আমরা কি সত্যিই আমাদের স্মৃতি রক্ষা করছি, নাকি শুধু তার ধ্বংসাবশেষ পাহারা দিচ্ছি? প্রশ্নটি ইতিহাসের নয়, ভবিষ্যতের।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মানার মহাখালী ঢাকা।

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের আগে যখন আমনতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের আগে যখন আমনতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না

হুজাইফাতুল ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) আমাদের দুটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার একটির নিদর্শন আমি দেখেছি, আর অপরটির জন্য অপেক্ষা করছি। মহানবী (সা.) আমাদের বলেছেন, নিশ্চয় আমানত মানুষের অন্তরের গভীরে নাজিল হয়েছে। এরপরে মানুষের ওপর কোরআন নাজিল হয়েছে। মানুষ কোরআন-হাদিস থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে। এরপরে মহানবী (সা.) আমাদের আমানতের ব্যাপারে বললেন, একজন মানুষ ঘুমাবে, তখন তার অন্তর থেকে আমানতকে তুলে নেওয়া হবে। তখন তার অন্তরে দাগ পড়ে যাবে। এরপরে আবার ঘুমাবে, তখন তার অন্তর থেকে আমানত উঠিয়ে নেওয়া হবে। তখন তার অন্তরে একটি ফোসকা পড়ে যাবে-কোনো ব্যক্তি অঙ্গারকে পা দিয়ে পিষলে যেমন পড়ে, তেমন। তুমি তাতে পানি আছে মনে করবে, কিন্তু আসলে তার মধ্যে কোনো কিছুই নেই। তারপর মহানবী (সা.) একটি পাথরের টুকরো নিয়ে পায়ে ঘষা দিয়ে দেখালেন। তিনি বললেন, তখন মানুষ বেচাকেনা করবে, কিন্তু তেমন কাউকে আমানতদার পাওয়া যাবে না। সবাই বলাবলি করবে যে, অমুক গোত্রে একজন আমানতদার লোক আছে। তখন তার ব্যাপারে বলা হবে, কত উত্তম, ভালো, সম্মানিত ব্যক্তি! কিন্তু তার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ইমান অবশিষ্ট থাকবে না।

হুজাইফা (রা.) বলেন, আমি এমন যুগে ছিলাম, যখন এটা পরওয়া করতাম না যে, আমি কার সাথে লেনদেন করছি। কারণ, তখন সে মুসলমান হয়ে থাকলে তার দ্বীন আমাকে তার খিয়ানতি থেকে বিরত রেখেছিল। আর সে ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান হয়ে থাকলে, শাসক আমার অধিকার ফিরিয়ে দেবে (এই বিশ্বাষ ছিল)। কিন্তু বর্তমানে আমি অমুক-অমুক ব্যক্তি ছাড়া তোমাদের কারো সাথে বেচাকেনা করতে পারব না।' (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৯৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৩৬৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ২৩২৫৫)

শিক্ষা ও বিধান 

১. আমানত শুধু কারো জিনিস গচ্ছিত রাখা নয়; বরং দায়িত্ব, কর্তব্য, প্রতিশ্রুতি, অধিকার ও বিশ্বাস রক্ষা করাও আমানতের অন্তর্ভুক্ত।

২. গুনাহ ও অবহেলার কারণে আমানত ধীরে ধীরে উঠে যায়। একবারে নয়, ধাপে ধাপে মানুষের অন্তর থেকে আমানত ও ঈমানের প্রভাব কমে যায়।

৩. আমানত উঠে যাওয়ার পর যে দাগ ও ফোসকার কথা বলা হয়েছে, তা অন্তরের কঠোরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক। বাহ্যিকভাবে মানুষ ভালো মনে হলেও অন্তর শূন্য হয়ে যেতে পারে।

৪. কিয়ামতের আগে আমানতদার লোক বিরল হয়ে যাবে। এমন সময় আসবে যখন একজন সৎ ও বিশ্বস্ত মানুষকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

৫. আল্লাহর কাছে মূল বিষয় হলো অন্তরের ঈমান ও তাকওয়া। তাই বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়।

৬. প্রকৃত মুমিন সেই, যার হাতে ও জিম্মায় মানুষ নিরাপদ থাকে। তাই মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো আমানতদারিতা।

৭. একজন মুসলমানের পরিচয় তার নাম বা পরিচয়ে নয়; বরং তার সততা ও আমানতদারিতায়। ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা, মিথ্যা ও খিয়ানত ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সুতরাং যখন মানুষের অন্তর থেকে আমানতদারিতা চলে যায়, তখন সমাজে প্রতারণা, অবিশ্বাস ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিজের ঈমান, সততা, দায়িত্ববোধ ও আমানতদারিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করা।

মসজিদে বসে থাকলেও সওয়াব লাভ হয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মসজিদে বসে থাকলেও সওয়াব লাভ হয়
সংগৃহীত ছবি

মসজিদ মুসলমানের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; বরং ঈমান, ইবাদত, জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার এক পবিত্র পরিবেশ। অনেকেই মনে করেন, মসজিদে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য শুধু নামাজ আদায় করা। তাই নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা মসজিদ ত্যাগ করেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, মসজিদে অবস্থান করা, আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকা এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় বসে থাকাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। এমনকি একজন মুমিন মসজিদে বসে থাকলেও আল্লাহর বিশেষ রহমত, ফেরেশতাদের দোয়া এবং অসংখ্য সওয়াব লাভ করতে পারেন। মহানবী (সা.)-এর বহু হাদিসে এ বিষয়ে সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে।

মসজিদে অবস্থানকারীর প্রতি আল্লাহর বিশেষ সন্তুষ্টি
মসজিদে অবস্থান করা আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। যে ব্যক্তি সালাত, জিকির ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করে, তার প্রতি আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যতক্ষণ মসজিদে সালাত ও জিকিরে রত থাকে, ততক্ষণ আল্লাহ তার প্রতি এতটা আনন্দিত হন, প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে যেরূপ আনন্দিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)

এভাবে মসজিদে অবস্থানকারী ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও সন্তুষ্টির পাত্র হয়ে যান। একজন প্রবাসী দীর্ঘদিন পর যখন আপনজনদের কাছে ফিরে আসে, তখন পরিবারের সদস্যরা যে আনন্দ অনুভব করেন, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির তুলনা তার সঙ্গে করা হয়েছে। এটি মসজিদে অবস্থানের মর্যাদা ও ফজিলতের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।

মসজিদে বসে থাকলে ফেরেশতাদের দোয়া লাভ
মসজিদে অবস্থানকারীর জন্য আরেকটি মহান সুসংবাদ হলো—ফেরেশতারা তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করতে থাকেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যতক্ষণ তার সালাতের স্থানে থাকে, তার অজু ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত তার জন্য ফেরেশতারা এই বলে দোয়া করে, ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাকে রহম করুন।’ আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির সালাত তাকে বাড়ি ফিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখে, সে সালাতরত আছে বলে পরিগণিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৯)

এ হাদিস থেকে জানা যায়, ফরজ সালাতের পর কিংবা পরবর্তী সালাতের অপেক্ষায় মসজিদে বসে থাকা ব্যক্তি যেন ইবাদতের মধ্যেই অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, আল্লাহর নিষ্পাপ ফেরেশতারা তার জন্য অবিরাম ক্ষমা ও রহমতের আবেদন করতে থাকেন। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!

এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষার বিশেষ মর্যাদা
ইসলামে এক ফরজ সালাত আদায়ের পর পরবর্তী ফরজ সালাতের অপেক্ষা করাও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। এটি মানুষের হৃদয়ে মসজিদের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহর ইবাদতের প্রতি গভীর আগ্রহের পরিচয় বহন করে। আবদুর রহমান ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম। এরপর কেউ চলে গেল, কেউ থেকে গেল। কিছুক্ষণ পর মহানবী (সা.) দ্রুতবেগে এসে বসলেন এবং বললেন, ‘তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের রব আসমানের একটি দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাদের কাছে তোমাদের সম্পর্কে গর্ব করে বলছেন, ‘তোমরা আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখ, তারা এক ফরজ আদায়ের পর পরবর্তী ফরজ আদায়ের জন্য অপেক্ষা করছে।’(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০১)

কত বড় সম্মানের বিষয়! আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ফেরেশতাদের সামনে এমন বান্দাদের প্রশংসা করছেন, যারা মসজিদে অবস্থান করে পরবর্তী নামাজের অপেক্ষা করছে। এটি প্রমাণ করে যে, মসজিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ইবাদতের পরিবেশে সময় কাটানো আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

মসজিদে সময় কাটানোর কিছু আমল
কোরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা, দরুদ শরিফ পাঠ করা, দোয়া ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকা, ইসলামি জ্ঞান অর্জন করা, নফল নামাজ আদায় করা, আত্মসমালোচনা ও তাওবা করা ইত্যাদি। এসব আমল মসজিদে কাটানো সময়কে আরো অর্থবহ ও বরকতময় করে তোলে।

সুতরাং মসজিদ হলো মুমিনের আত্মিক প্রশান্তি, ঈমানি শক্তি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ ত্যাগ না করে কিছু সময় আল্লাহর জিকির, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইবাদতে ব্যয় করা উচিত। মসজিদে অবস্থানকারী বান্দার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, ফেরেশতারা তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করেন এবং সে ব্যক্তি এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষার মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সুতরাং আমাদের উচিত মসজিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক আরো গভীর করা এবং এই মহৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর অশেষ রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

রিজিক পেয়েও তকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়ার পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
রিজিক পেয়েও তকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়ার পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

তকদির অনুযায়ী যখন কোনো কিছু সংঘটিত হয়, তখন তাকে বলা হয় তকদিরের ফয়সালা। তকদিরের ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করাকে শরয়ি ভাষায় ‘রিজা’ বলে। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার অর্থ হলো মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তকদিরের ব্যাপারে অন্তরকে প্রশান্ত রাখা, প্রফুল্লচিত্ত থাকা এবং মানসিকভাবে ব্যথিত না হওয়া। যদিও আপতিত বিপদকে সে অপছন্দ করে।

এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে যা কিছু নির্ধারণ করেছেন, সেটা ভালো হোক বা মন্দ হোক, পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনীয় হোক, সে ব্যাপারে মনের মধ্যে কোনো অভিযোগ না রাখা এবং অস্থির না হয়ে সেটাকে নির্দ্বিধায় ও প্রশান্তচিত্তে মেনে নেওয়া।

আর এটা বিশ্বাস করা যে আমাদের সার্বিক জীবনে আগত আনন্দ-বেদনা, রোগ-শোক, বিপদাপদ এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সবকিছুই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত তাকদিরের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের দিন-দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর সিদ্ধান্তই আমাদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর ও ইনসাফপূর্ণ। একই কথা রিজিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহ বান্দাদের জন্য রিজিক বণ্টন করে থাকেন। মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত রিজিকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে তার জীবিকায় বরকত লাভ হয়। 

পক্ষান্তরে ওই রিজিকের ওপর সন্তুষ্ট না হলে জীবিকার বরকত চলে যায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বান্দাকে প্রদত্ত জিনিসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে যদি সে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন এবং তা বৃদ্ধি করে দেন। আর যদি সন্তুষ্ট না থাকে, তাহলে তাতে বরকত দেন না। (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২০২৭৯; সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৬৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সর্বাবস্থায় শোকরগুজার বান্দা হিসেবে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।