• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের আগে যখন আমনতদার খুঁজে পাওয়া যাবে না

কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কন্যাসন্তান : আল্লাহর রহমত, ঘরের বরকত ও জান্নাত লাভের মাধ্যম
সংগৃহীত ছবি

এক সময় পৃথিবীর বহু সমাজে কন্যাসন্তান ছিল অবহেলা, অপমান ও বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে জাহেলি আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জা ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো। এমনকি অনেক নিষ্ঠুর পিতা নিজের নবজাতক কন্যাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিতেও দ্বিধা করত না। মানবতার ইতিহাসে এটি ছিল এক কলঙ্কিত অধ্যায়। ঠিক সেই অন্ধকার যুগেই ইসলাম এসে কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য বিপ্লব ঘটায়। যে কন্যাসন্তানকে সমাজ বোঝা মনে করত, ইসলাম তাকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত, ঘরের বরকত এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৪৯)

লক্ষ্য করার বিষয় হলো, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে কন্যাসন্তানের কথা উল্লেখ করেছেন। মুফাসসিরগণ বলেন, এর মধ্যে কন্যাসন্তানের মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ যে সমাজ কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞা করত, আল্লাহ তাআলা সেই সমাজের ভুল ধারণাকে ভেঙে দিয়ে কন্যাসন্তানকে সম্মানিত করেছেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যাসন্তান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি মূল্যবান আমানত। তার সঠিক লালন-পালন, শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের দায়িত্ব পালন করলে তা পিতা-মাতার জন্য জান্নাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করবে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এভাবে একসঙ্গে থাকব।’ এরপর তিনি নিজের দুই আঙুল একত্র করে দেখালেন।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত : ২৬৩১)

একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের সংবাদ আর কী হতে পারে! কন্যাসন্তানের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে কিয়ামতের দিন সে মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করবে। অন্য এক হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যার ঘরে কন্যাসন্তান আসে এবং সে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৪১৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৬২৯)

এ হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, কন্যাসন্তান আল্লাহর রহমত এবং তাদের যথাযথ প্রতিপালন মহান সওয়াবের কাজ। অথচ জাহেলি যুগের মানুষ কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদ শুনে লজ্জা ও দুঃখে ভেঙে পড়ত। আল্লাহ তাআলা তাদের সেই মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে দুঃখে কাতর থাকত।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৫৮)

দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক যুগেও অনেক সমাজে সেই জাহেলি মানসিকতার কিছু না কিছু ছাপ রয়ে গেছে। কোথাও কন্যাসন্তানের জন্মে আনন্দের পরিবর্তে হতাশা দেখা যায়, কোথাও তাকে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, কোথাও আবার উত্তরাধিকার ও সম্পদের ন্যায্য অধিকার থেকেও দূরে রাখা হয়। এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মহানবী (সা.) নিজের জীবনে কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তিনি দাঁড়িয়ে যেতেন, তাকে সাদরে গ্রহণ করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় বসাতেন।’ (আবু দাউদ, আয়াত : ৫২১৭)

এটি শুধু একজন পিতার ভালোবাসা ছিল না; বরং সমগ্র উম্মতের জন্য একটি বাস্তব শিক্ষা ছিল যে, কন্যাসন্তান সম্মান, মর্যাদা ও ভালোবাসার পূর্ণ অধিকারী। তবে কন্যাসন্তানের হক আদায় শুধু খাদ্য, পোশাক ও আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, উত্তম চরিত্র গঠনে সহায়তা করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করা এবং সমাজের উপকারী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলাও পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব।

প্রখ্যাত ইসলামী মনীষী ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। তার হৃদয় নিষ্পাপ ও নির্মল ভূমির মতো; তাকে যেভাবে গড়ে তোলা হবে, সে সেভাবেই বেড়ে উঠবে।

প্রকৃতপক্ষে একজন কন্যাসন্তানকে সৎ, শিক্ষিত, আদর্শবান ও দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা মানে শুধু একজন মানুষকে গড়ে তোলা নয়; বরং একটি সুন্দর পরিবার, একটি আদর্শ সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা। কারণ একজন মা-ই একটি জাতির প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

আজ যখন বিশ্বজুড়ে নারী নির্যাতন, বৈষম্য, অবমূল্যায়ন ও নৈতিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে, তখন ইসলামের এই মহান শিক্ষাগুলো নতুন করে স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি। ইসলাম কন্যাসন্তানের প্রতি করুণা দেখায়নি; বরং তাকে মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

তাই কন্যাসন্তানের জন্মে হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক মূল্যবান নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তাকে ভালোবাসা, স্নেহ, শিক্ষা ও মর্যাদার মাধ্যমে বড় করে তোলা উচিত। কারণ যে ঘরে কন্যাসন্তানকে সম্মান করা হয়, যে ঘরে তার অধিকার রক্ষা করা হয়, যে ঘরে তাকে আল্লাহর আমানত হিসেবে লালন করা হয়—সেই ঘরেই নেমে আসে রহমত, শান্তি ও বরকতের অবারিত ধারা। অতএব, কন্যাসন্তান বোঝা নয়, সে আল্লাহর উপহার; অবহেলার নয়, সম্মানের; হতাশার নয়, বরং জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক মহামূল্যবান সুযোগ।

মসজিদে বসে থাকলেও সওয়াব লাভ হয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মসজিদে বসে থাকলেও সওয়াব লাভ হয়
সংগৃহীত ছবি

মসজিদ মুসলমানের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; বরং ঈমান, ইবাদত, জ্ঞানচর্চা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকার এক পবিত্র পরিবেশ। অনেকেই মনে করেন, মসজিদে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য শুধু নামাজ আদায় করা। তাই নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা মসজিদ ত্যাগ করেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, মসজিদে অবস্থান করা, আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকা এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষায় বসে থাকাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। এমনকি একজন মুমিন মসজিদে বসে থাকলেও আল্লাহর বিশেষ রহমত, ফেরেশতাদের দোয়া এবং অসংখ্য সওয়াব লাভ করতে পারেন। মহানবী (সা.)-এর বহু হাদিসে এ বিষয়ে সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে।

মসজিদে অবস্থানকারীর প্রতি আল্লাহর বিশেষ সন্তুষ্টি
মসজিদে অবস্থান করা আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত প্রিয় একটি আমল। যে ব্যক্তি সালাত, জিকির ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করে, তার প্রতি আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যতক্ষণ মসজিদে সালাত ও জিকিরে রত থাকে, ততক্ষণ আল্লাহ তার প্রতি এতটা আনন্দিত হন, প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে যেরূপ আনন্দিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)

এভাবে মসজিদে অবস্থানকারী ব্যক্তি আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও সন্তুষ্টির পাত্র হয়ে যান। একজন প্রবাসী দীর্ঘদিন পর যখন আপনজনদের কাছে ফিরে আসে, তখন পরিবারের সদস্যরা যে আনন্দ অনুভব করেন, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির তুলনা তার সঙ্গে করা হয়েছে। এটি মসজিদে অবস্থানের মর্যাদা ও ফজিলতের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।

মসজিদে বসে থাকলে ফেরেশতাদের দোয়া লাভ
মসজিদে অবস্থানকারীর জন্য আরেকটি মহান সুসংবাদ হলো—ফেরেশতারা তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করতে থাকেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যতক্ষণ তার সালাতের স্থানে থাকে, তার অজু ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত তার জন্য ফেরেশতারা এই বলে দোয়া করে, ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনি তাকে রহম করুন।’ আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির সালাত তাকে বাড়ি ফিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখে, সে সালাতরত আছে বলে পরিগণিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৯)

এ হাদিস থেকে জানা যায়, ফরজ সালাতের পর কিংবা পরবর্তী সালাতের অপেক্ষায় মসজিদে বসে থাকা ব্যক্তি যেন ইবাদতের মধ্যেই অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, আল্লাহর নিষ্পাপ ফেরেশতারা তার জন্য অবিরাম ক্ষমা ও রহমতের আবেদন করতে থাকেন। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!

এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষার বিশেষ মর্যাদা
ইসলামে এক ফরজ সালাত আদায়ের পর পরবর্তী ফরজ সালাতের অপেক্ষা করাও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। এটি মানুষের হৃদয়ে মসজিদের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহর ইবাদতের প্রতি গভীর আগ্রহের পরিচয় বহন করে। আবদুর রহমান ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম। এরপর কেউ চলে গেল, কেউ থেকে গেল। কিছুক্ষণ পর মহানবী (সা.) দ্রুতবেগে এসে বসলেন এবং বললেন, ‘তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের রব আসমানের একটি দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতাদের কাছে তোমাদের সম্পর্কে গর্ব করে বলছেন, ‘তোমরা আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখ, তারা এক ফরজ আদায়ের পর পরবর্তী ফরজ আদায়ের জন্য অপেক্ষা করছে।’(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০১)

কত বড় সম্মানের বিষয়! আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ফেরেশতাদের সামনে এমন বান্দাদের প্রশংসা করছেন, যারা মসজিদে অবস্থান করে পরবর্তী নামাজের অপেক্ষা করছে। এটি প্রমাণ করে যে, মসজিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ইবাদতের পরিবেশে সময় কাটানো আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

মসজিদে সময় কাটানোর কিছু আমল
কোরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা, দরুদ শরিফ পাঠ করা, দোয়া ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকা, ইসলামি জ্ঞান অর্জন করা, নফল নামাজ আদায় করা, আত্মসমালোচনা ও তাওবা করা ইত্যাদি। এসব আমল মসজিদে কাটানো সময়কে আরো অর্থবহ ও বরকতময় করে তোলে।

সুতরাং মসজিদ হলো মুমিনের আত্মিক প্রশান্তি, ঈমানি শক্তি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। তাই নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ ত্যাগ না করে কিছু সময় আল্লাহর জিকির, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও ইবাদতে ব্যয় করা উচিত। মসজিদে অবস্থানকারী বান্দার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, ফেরেশতারা তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করেন এবং সে ব্যক্তি এক নামাজের পর আরেক নামাজের অপেক্ষার মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সুতরাং আমাদের উচিত মসজিদের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক আরো গভীর করা এবং এই মহৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর অশেষ রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

রিজিক পেয়েও তকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়ার পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
রিজিক পেয়েও তকদিরের প্রতি সন্তুষ্ট না হওয়ার পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

তকদির অনুযায়ী যখন কোনো কিছু সংঘটিত হয়, তখন তাকে বলা হয় তকদিরের ফয়সালা। তকদিরের ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করাকে শরয়ি ভাষায় ‘রিজা’ বলে। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকার অর্থ হলো মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তকদিরের ব্যাপারে অন্তরকে প্রশান্ত রাখা, প্রফুল্লচিত্ত থাকা এবং মানসিকভাবে ব্যথিত না হওয়া। যদিও আপতিত বিপদকে সে অপছন্দ করে।

এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে যা কিছু নির্ধারণ করেছেন, সেটা ভালো হোক বা মন্দ হোক, পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনীয় হোক, সে ব্যাপারে মনের মধ্যে কোনো অভিযোগ না রাখা এবং অস্থির না হয়ে সেটাকে নির্দ্বিধায় ও প্রশান্তচিত্তে মেনে নেওয়া।

আর এটা বিশ্বাস করা যে আমাদের সার্বিক জীবনে আগত আনন্দ-বেদনা, রোগ-শোক, বিপদাপদ এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সবকিছুই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত তাকদিরের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের দিন-দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর সিদ্ধান্তই আমাদের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর ও ইনসাফপূর্ণ। একই কথা রিজিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহ বান্দাদের জন্য রিজিক বণ্টন করে থাকেন। মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত রিজিকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে তার জীবিকায় বরকত লাভ হয়। 

পক্ষান্তরে ওই রিজিকের ওপর সন্তুষ্ট না হলে জীবিকার বরকত চলে যায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বান্দাকে প্রদত্ত জিনিসের মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে যদি সে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন এবং তা বৃদ্ধি করে দেন। আর যদি সন্তুষ্ট না থাকে, তাহলে তাতে বরকত দেন না। (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২০২৭৯; সহিহুল জামে, হাদিস : ১৮৬৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সর্বাবস্থায় শোকরগুজার বান্দা হিসেবে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
 

স্বামী-স্ত্রীর প্রতি ১০টি বিশেষ পরামর্শ

মুফতি উমায়ের কোব্বাদী
স্বামী-স্ত্রীর প্রতি ১০টি বিশেষ পরামর্শ
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীর প্রথম সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। সুখময় দাম্পত্য জীবন সবার কাম্য। নিম্নে সুখয়ম দাম্পত্য জীবন গড়তে ১০টি বিশেষ পরামর্শ উল্লেখ করা হলো—

১. একে অপরের প্রতি শারীরিক বা মানসিক ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা : হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আলিঙ্গন, চুম্বন ইত্যাদি করতেন। (জাদুল মাআদ : ৪/২৫৩)
তা ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক ঘনিষ্ঠতা অন্তরের খারাপ চিন্তা দূর করে দেয়।

২. একে অপরকে সিক্রেট নামে ডাকা : একে অপরের জন্য এমন কোনো নাম ঠিক করুন, যেটা হবে সুইট, রোমান্টিক ও সিক্রেট। যে নাম সঙ্গীর কানে গেলে রাগের সময়ও অন্তরে ভালোবাসার ঝংকার সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালোবেসে কখনো কখনো আমার নাম হুমায়রা বা লাল গোলাপ বলে ডাকতেন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪)

তবে এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে আপনাদের এই একান্ত বিষয়টা যেন অন্যদের সামনে প্রকাশ না পায়। কারণ, তখন এই সুন্দর বিষয়টাই হয়ে যাবে নির্লজ্জতা।

৩. একে অপরকে বিশ্বাস রাখুন : সঙ্গীর প্রতি আপনার বিশ্বাস খুবই জরুরি একটি বিষয়। এটা না থাকলে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া সুখময় হয় না। যে পরিবারে সন্দেহের রোগ বাসা বাঁধে সেখানে সুখের আশা করা বৃথা। কাতাদাহ (রহ.) বলেন, না দেখে, দেখেছি বলো না। না শুনে, শুনেছি বলো না। না জেনে, জেনেছি বলো না। কেননা এসব বিষয় সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। (ইবনু কাসির : ৫/৭৫)

৪. তৃতীয় পক্ষকে নাক গলানোর সুযোগ দেবেন না : বেশির ভাগ সময় স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হয় তৃতীয় পক্ষের কারণে। আর যদি এই ঝগড়ার মাঝে আপনি নিজের ভাই-বোন প্রমুখদের টেনে আনেন, তাহলে ঝামেলা গুরুতর আকার নেবে। যদি বন্ধুবান্ধবকে টানেন, তাহলে সম্পর্কের ‘ইন্নালিল্লাহ’ হয়ে যাবে। তা ছাড়া একটু আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম, আপনাদের দাম্পত্য জীবনে আপনার বোনের কিংবা আপনার মায়ের মাধ্যমে আপনার স্ত্রীর বিচারক হয়ে উঠতে পারে আপনার ভগ্নিপতি। এটা কক্ষনো হতে দেবেন না। মনে রাখবেন, যারা অন্যের প্রাইভেট জীবন নিয়ে নাক গলায়, এদের দৃষ্টান্ত রাস্তায় চলা বেয়াড়া ট্রাকের মতো। ট্রাকের পেছনে যেভাবে লেখা থাকে, ১০০ গজ দূরে থাকুন। অনুরূপভাবে এজাতীয় লোক থেকেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।

৫. নিজেকে পরিপাটি রাখুন : পুরুষরা তাদের সঙ্গিনীকে সুন্দরভাবে দেখতে পছন্দ করে। ঠিক একই ভাবে তারা তাদের সঙ্গীকেও সুন্দরভাবে দেখতে পছন্দ করে। ইবনু আব্বাস (রা.) বলতেন, আমি আমার স্ত্রীর জন্য পরিপাটি থাকা পছন্দ করি, যেমন পছন্দ করি আমার স্ত্রী আমার জন্য পরিপাটি থাকাকে। (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবা : ১৫৭১২)

৬. বলবেন কম, শুনবেন বেশি : আপনার সঙ্গী কী বলছেন, সেই কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন। তার দুটো কথা শুনেই নিজের মতামত দিতে শুরু করবেন না। এতে আপনাদের মধ্যে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। আমরা সবাই নিজের কথা বলতে ভালোবাসি, কিন্তু বিপরীতের মানুষটির বক্তব্য শোনার কোনো ইচ্ছাই আমাদের মধ্যে থাকে না। তাই ঝগড়া-অশান্তিও বাড়ে। সব সময়ই যে আপনাকে ডিফেন্সিভ হতে হবে, এমন কোনো অর্থ নেই। বরং এবার থেকে শোনার অভ্যাসও গড়ে তুলুন। তাঁর মতামতকে সম্মান করুন। আপনার এই ব্যবহারে তিনিও খুশি হবেন।

৭. মধুর স্মৃতিগুলো স্মরণ করুন : আপনার সঙ্গীর কোনো কাজ বা আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কারণ আপনি তাকে অনেক ভালোবাসেন। সে এমনটি করবে বা বলবে তা আপনি কল্পনায়ও ঠাঁই দিতে পারছেন না! তাই খুব চটেছেন! একটু থামুন! কয়েক সেকেন্ড ভাবুন। তার সঙ্গে অতিবাহিত সুন্দর ভালোবাসার ও ভালো লাগার আচরণগুলো স্মরণ করুন। সেগুলোর স্মৃতিচারণা করুন। দেখবেন, রাগ কমে যাবে! স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

মানুষ ভুল করে। ভুল করতে পারে। ভালো-মন্দ স্বভাবের মিশ্রণেই মানুষের সৃষ্টি! একটি আচরণ খারাপ হলে তার অনেক আচরণ আছে, যেগুলো মুগ্ধকর। প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। আপনার ক্ষেত্রে। আপনার সঙ্গী/সঙ্গিনীর ক্ষেত্রে। সবার ক্ষেত্রে! প্রত্যেকের উচিত তার সঙ্গীর উত্তম আচরণগুলো দেখা। মন্দগুলো মানবিক দুর্বলতা হিসেবে ক্ষমা করে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো মুমিন অন্য মুমিন নারী (পুরুষ)-কে চূড়ান্তভাবে ঘৃণা করতে পারে না। তার একটি স্বভাবে সন্তুষ্ট না হলে অন্য স্বভাবে অবশ্যই সন্তুষ্ট হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৬৯)

আরো পড়ুন
সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

 

৮. শয়তান কিন্তু জিতে গেল, আপনি হেরে গেলেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইবলিস তার সিংহাসন পানিতে স্থাপন করে। তারপর তার বাহিনীদের প্রেরণ করে। সর্বোচ্চ দুষ্কৃতকারী তার সর্বাধিক নৈকট্য লাভ করে। (দুষ্কৃতি শেষে) একজন এসে বলে : আমি এই এই কাজ করেছি। ইবলিস বলে, তুমি উল্লেখযোগ্য কিছু করনি! অপর একজন এসে বলে, আমি স্বামীর পেছনে লেগেই ছিলাম। একপর্যায়ে তার ও তার স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাই! তখন শয়তান তাকে কাছে টেনে নেয় আর বলে, হ্যাঁ, তুমিই কাজের কাজ করেছ! এবং তার সঙ্গে আলিঙ্গন করে! (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫০৩৯)

যখনই নিজেদের মাঝে কিছু হয়ে যাবে লক্ষ্য রাখতে হবে শয়তান যেন জিতে না যায়! সাবধান হতে হবে।

৯. বিরতি নিন : আপনি যদি মনে করেন যে আলোচনাটি উত্তপ্ত হতে চলেছে, তবে বিরতি নিন। কথায় আছে, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। সুতরাং এ সময় প্রয়োজনে তাকে নিজ সম্মুখ থেকে সরিয়ে দিন অথবা নিজেই অন্যত্র সরে যান কিংবা অজু করে নিন বা কিছু পানি পান করুন, আপনার গাছপালা দেখুন। এসব একটি রিসেট বোতামের মতো কাজ করবে। আপনি যখন আবার রুমে প্রবেশ করবেন এবং আপনার সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলবেন, তখন দুজনেই নিজেকে শান্ত করবেন এবং সম্ভবত বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলবেন।

আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহ.)-কে বলা হলো—উত্তম চরিত্র সম্পর্কে এককথায় আমাদের কিছু বলুন। তিনি বললেন, রাগ ত্যাগ করা। (জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম : ১/৩৬৩)

১০. সহজ উপায় খুঁজে বের করুন : ঝগড়াবিহীন কোনো দম্পতি খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনাদের সম্পর্কে যদি টুকটাক ঝগড়া না থাকে, তবে সেটি স্বাভাবিক নয়। তবে দিন দিন ঝগড়া বাড়তে দেওয়াও কোনো কাজের কথা নয়। কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে তার সমাধান করার সহজ পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে কোনোভাবেই যেন তালাকের প্রসঙ্গ সামনে না আসে। নুন থেকে চুন খসলে কিংবা নিজের পরিবারের কথায় প্ররোচিত হয়ে স্বামী  স্ত্রীকে তালাক দেওয়া কিংবা স্ত্রী স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া জঘন্য কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৭৫)

সুতরাং প্রতিশোধ নেওয়া বা পরাস্ত করা থেকে বিরত থাকুন! কাকে পরাস্ত করবেন? কার ওপর প্রতিশোধ নেবেন? সে তো আপনার জীবনসঙ্গী! এখানে প্রতিশোধ নয়, বরং ভালোবাসা ও মমতা কাম্য! নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন। সাবধান হোন!

মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরো পড়ুন
আদর্শ সন্তানের প্রতি ইসলামের ৮ নির্দেশনা

আদর্শ সন্তানের প্রতি ইসলামের ৮ নির্দেশনা