kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

যেসব কারণে মহানবী (সা.) কান্না করেছেন

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা    

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০৯:৩২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যেসব কারণে মহানবী (সা.) কান্না করেছেন

আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া মহান আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। তাই মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর ভয়ে বেশি বেশি অশ্রু বিসর্জন দিতেন। এ ছাড়া তিনি মৃত্যুর স্মরণে, উম্মতের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে ও প্রিয় সাহাবি ও পরিবারবর্গদের দুঃখ-কষ্টে তাদের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে কেঁদেছেন। আজকে এমন কিছু সময়ের স্মরণ করব, যে সময়গুলো প্রিয় নবীর নয়ন মোবারক থেকে অশ্রু ঝরেছিল।

উম্মতের মাগফিরাতের জন্য : আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়াসংবলিত আয়াত, ‘হে আমার রব, এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হবে তুমি তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৩৬) পাঠ করেন। আর ঈসা (আ.) বলেছেন, ‘তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও তাহলে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদের ক্ষমা করো, তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : আল মায়েদা, আয়াত : ১১৮)

তারপর তিনি তাঁর উভয় হাত উঠালেন এবং বলেন, হে আল্লাহ, আমার উম্মত, আমার উম্মত! আর কেঁদে ফেলেন। তখন মহান আল্লাহ বলেন, হে জিবরাইল, মুহাম্মদের কাছে যাও, তোমার রব তো সবই জানেন-তাঁকে জিজ্ঞেস করো, তিনি কাঁদছেন কেন? জিবরাইল (আ.) এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) যা বলেছিলেন, তা তাঁকে অবহিত করলেন। আর আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, হে জিবরিইল, তুমি মুহাম্মদের কাছে যাও এবং তাঁকে বলো, নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করে দেব, আপনাকে অসন্তুষ্ট করব না।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৮৭)

অসুস্থ সাহাবিকে দেখতে গিয়ে : আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) রোগাক্রান্ত হলেন। নবী (সা.) আবদুর রাহমান ইবনে আওফ সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে দেখতে এলেন। তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে পরিজনের মধ্যে দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তার কি মৃত্যু হয়েছে! তাঁরা বলল, না। হে আল্লাহর রাসুল, তখন নবী (সা.) কেঁদে ফেলেন। নবী (সা.)-এর কান্না দেখে উপস্থিত লোকেরা কাঁদতে লাগলেন। (বুখারি, হাদিস : ১৩০৪)

শিশুপুত্রের শোকে : জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আবদুর রাহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর হাত ধরে তাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ পুত্র ইবরাহিম (রা.)-এর কাছে গেলেন। তাঁকে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পেলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে কোলে তুলে নিলেন এবং কাঁদলেন। আবদুর রাহমান (রা.) তাকে বলেন, আপনিও কাঁদছেন? আপনি কি কান্না করতে বারণ করেননি? তিনি বলেন, না; বরং আমি দুটি নির্বোধসুলভ ও পাপাচারমূলক চিৎকার নিষেধ করেছি; বিপদের সময় চিৎকার করা, মুখমণ্ডলে আঘাত করা এবং জামার সম্মুখভাগ ছিঁড়ে ফেলা আর শয়তানের মতো (চিৎকার) কান্নাকাটি করা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০০৫)

মৃত্যুপথযাত্রী নাতিকে কোলে নিয়ে : উসামাহ ইবনে জায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে,  রাসুল (সা.)-এর কোনো এক কন্যার এক ছেলের মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি তাকে দেখতে যান। সেখানে প্রবেশ করলে তখন তারা শিশুটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে দিলেন। আর তখন বাচ্চার বুকের মধ্যে এক অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা নবী (সা.) তখন বলেছিলেন, এ তো যেন মশকের মতো। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) কাঁদলেন। তা দেখে সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) বলেন, আপনি কাঁদছেন? তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর দয়ালু বান্দাদের ওপরই দয়া করেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৭৪৪৮)

 

কোরআন তিলাওয়াত শুনে : ইবরাহিম (আ.) বলেন, একদিন নবী (সা.) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বলেন, তুমি আমাকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাও।...অতঃপর তিনি (আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ) সুরা নিসার প্রথম থেকে ‘হে নবী, একটু ভেবে দেখুন তো সে সময় এরা কী করবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী হাজির করব, আর এসব লোকের জন্য আপনাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করব।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪১)

এ আয়াত পর্যন্ত তাকে পড়ে শোনালেন। এতে তিনি (সা.) কেঁদে ফেলেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৭৫৪)

মায়ের কবরের পাশে : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী (সা.) তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সঙ্গের লোকদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন, আমি আমার রবের কাছে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের কাছে তাঁর কবর জিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর জিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৫৭২)

নামাজের মধ্যে কান্না : মুতাররিফ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বলেন, আমি দেখেছি রসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ আদায় করছিলেন এবং সে সময় তাঁর বুক থেকে জাঁতা পেষার আওয়াজের মতো কান্নার আওয়াজ হচ্ছিল।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৯০৪)

খাদিজা (রা.)-এর স্মরণে : মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) তাঁর প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর কথা মনে করে কান্না করেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬৯২)

মৃত্যুর স্মরণে : বারা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে এক জানাজায় উপস্থিত ছিলাম। তিনি কবরের কিনারে বসে কাঁদলেন, এমনকি তাঁর চোখের পানিতে মাটি ভিজে গেল। অতঃপর তিনি বলেন, ‘হে ভাই সব, তোমাদের অবস্থাও তার মতোই হবে, সুতরাং তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৯৫)

প্রিয় সাহাবিদের শাহাদতবরণের খবর দিতে গিয়ে : আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) জায়দ, জাফর ও আবদুল্লাহ (রা.)-এর মৃত্যু সংবাদ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসার আগেই আমাদের শুনিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, জায়দ (রা.) পতাকা ধারণ করে শাহাদাত লাভ করেছে। অতঃপর জাফর (রা.) পতাকা ধারণ করে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করল। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) পতাকা হাতে নিয়ে শাহাদাত লাভ করল। তিনি যখন এ কথাগুলো বলছিলেন তখন তাঁর দুই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। (অতঃপর বলেন) আল্লাহ তাআলার তরবারিগুলোর এক তরবারি অর্থাৎ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পতাকা উঠিয়েছেন। অবশেষে আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দিয়েছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৭৫৭)



সাতদিনের সেরা