kalerkantho

শুক্রবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৭ নভেম্বর ২০২০। ১১ রবিউস সানি ১৪৪২

ভেদাভেদ ভুলে রাসুল (স.) প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

মো. মোকছেদ আলী   

৮ নভেম্বর, ২০২০ ১৯:৫০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভেদাভেদ ভুলে রাসুল (স.) প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

প্রতীকী ছবি।

ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী হচ্ছে রাসূল (সা.) -এর জন্মদিবস। ঈদ অর্থ খুশি, মিলাদুন্নবী অর্থ জন্মবৃত্তান্ত, জীবনী। ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী (সা.)-এর আক্ষরিক অর্থ নবী (সা.)-এর জন্মে খুশি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একজন শ্রেষ্ট মহামানব। তাঁর আগমনে বসুন্ধরা ধন্য ও গৌরান্বিত হয়েছিল। বর্বর, নির্লজ্জ, বেহায়া, অসভ্য ও বেদুঈন জাতি, তাঁর অনুপম, উত্তম স্বভাব চরিত্রের সংস্পর্শে এসে ধন্য ও শ্রেষ্ট জাতিতে পরিণত হয়েছিল। এমন কোনো অন্যায়, পাপাচার, গর্হিত কাজ ছিল না যা তৎকালীন আরববাসী করত না। অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, মদ, জুয়া, দেব-দেবীর নামে নর-নারী উৎসর্গ তাদের নিত্য নৈমত্তিক কাজ ছিল। নারী ছিল পণ্যের মতো। মেয়ে শিশুদের জীবন্ত কবর দিত। 

অমানিশা সূচিভেদ্য অন্ধকারে অরুণ রবির কণত কিরণে জগৎবাসী যেভাবে উৎফুল্ল ও উদ্ভাসিত হয়ে উঠে সেভাবেই নবী (সা.)-এর আগমনে জগৎবাসী আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। কুসংস্কার, ধর্ম নামে বাড়াবাড়ির মূলোৎপাটন, নারী-পুরুষের সমান অধিকার রক্ষা, শ্রমিকদের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই মজুরি পরিশোধের নির্দেশ প্রদান করেন।

মানুষ সৃষ্টির রহস্য যদি বলতে চাই, তবে বলতে হয়, আল্লাহ পাক মানুষকে সর্ব প্রথম সৃষ্টি করেননি। হাদিসে কুদসি’তে এসেছে, স্রষ্টা আপন কুদরতে স্বীয় মহিমায় গুপ্ত ভাণ্ডারে ছিলেন, নিজেই নিজের কাছে আপন মহিমায় প্রকাশিত হচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর মহত্ব, বড়ত্ব প্রকাশের জন্য প্রেমাস্পদ সৃষ্টি করতে লাগলেন। গ্রহীতা ছাড়া যেমন দাতার বড়ত্ব প্রকাশ পায় না, শ্রোতা ছাড়া বক্তার মনের ভাব প্রকাশ পায় না। ঠিক তেমনি আল্লাহর বড়ত্ব মহত্ব সৃষ্টি ছাড়া প্রকাশ হয় না। তাই তো সর্ব প্রথম স্বীয় নূর হতে কুদরতি নূর দ্বারা নূরে মোহাম্মদী সৃষ্টি করেন। তা হতে ফেরেস্তাকূল সৃষ্টি করলেন। ফেরেস্তাকূল দিয়ে আল্লাহর দয়ার প্রকাশ হচ্ছিল না। কারণ আল্লাহ’র হুকুম পালনে ফেরেস্তাকূল কোনো ব্যত্যয় ঘটাননি।

আল্লাহ এরপর ধ্রুমবিহীন আগুন থেকে জ্বীন জাতি সৃষ্টি করলেন। জ্বীন জাতি হুকুমের তোয়াক্কা তো করেই না বরং অহংকারবশত ভুল ভ্রান্তির জন্যও অনুতপ্ত, অনুশোচনা করে না। ফলে আল্লাহ’র উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। তাই তিনি সমস্ত কিছুর নির্যাস দিয়ে, প্রতিনিধির মর্যাদায় মানুষ সৃষ্টি করলেন। সমস্ত সৃষ্টির নিকট তাঁর আমানতসমূহ পেশ করলে আসমান, জমিন, পাহাড় তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালো। কিন্তু মানুষ সেই আমানত নির্দ্বিধায় গ্রহণ করলো (সূরা আহযাব-৭২)। 

প্রশ্ন উঠে এই আমানত কি? উত্তরে অনেক ইসলামী মনীষীগণ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে আত্মা (রূহ বা কাল্ব), জ্ঞান ও কোরআনকে অভিহিত করেছেন। জ্ঞান যেহেতু নির্দিষ্ট বয়সে স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে কমবেশি হয়, সে ক্ষেত্রে আত্মা ও কোরআনকে প্রকৃত আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সুরা আহযাব এর ৭২ নং এবং সূরা হাশর এর ২২ নং আয়াতের মর্মানুযায়ী জ্ঞাতা (আত্মা) ও জ্ঞেয় বিষয় (কোরআনের আদেশ-নিষেধ) অর্থাৎ আত্মা (রূহ/কাল্ব/খলিফা) এবং কোরআনের বাণী সমষ্টিই আমানত। মানুষ যেন ঠিকমত আমানত রক্ষা করে, একমাত্র মালিক আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থাশীল থাকে তাই সমস্ত সৃষ্টিকূলের জন্য রাসুল (সা.)-এর নিকট কিতাব প্রদান করলেন।

স্রষ্টার নিকট মানুষ দাস বা গোলাম হিসেবে কৃত কর্মের জন্য অনুশোচনা করবে, অন্যদিকে মানুষ প্রতিনিধির মর্যাদা পাওয়ায় এক বান্দা অপর বান্দাকে দয়া করবে। আল্লাহ হযরত মোহাম্মদ (সা.) -কে চূড়ান্ত ও শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি মনোনীত করেন।

আল্লাহর বাণী (আদেশ-নিষেধ) রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে প্রয়োগ করে কিভাবে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন সম্ভব হবে তার লক্ষ্যে রাসূল (সা.) -কে সকল মানুষের অনুকরণের জন্য প্রেরণ করেন। নবী (সা.) হলেন কোরআনের মূর্ত প্রতীক। সুরা ফাতিহা’র ৬ নং আয়াতের মর্মার্থ হলো, নবী (সা.) সিরাতুল মোস্তাকিমের নিয়ামতপ্রাপ্ত প্রকৃত ব্যক্তি। সুরা আম্বিয়া’র ১০৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তিনি রাসুল (সা.)-কে দুনিয়ার রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। দয়াল রাসুল (সা.)-কে ঘিরে ইসলাম ধর্ম আবর্তিত ও বিকশিত হয়েছে। কাজেই তাঁর জন্ম দিন ও মাস মুসলিম উম্মাহ’র জন্য এক বরকতময় ও রহমত স্বরূপ। 

একদল মুসলমান রাসুল (সা.)-এর শান ব্যাখ্যা করতে অতি উৎসাহিত হয়ে অতিরঞ্জিত উক্তি, আচরণ প্রকাশ করে থাকেন। আবার আরেক দল রাসুল (সা.)-এর শান ব্যাখ্যায় কৃপণতাবশত তাঁকে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, মাটির মানুষ, বলে অভিহিত করেন। মুসলমানদের মধ্যে আকিদাগত মতের পার্থক্য থাকলেও সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সকলকে ’রাসুল (সা.)’ প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

লেখক: অধ্যক্ষ, আক্কেলপুর মুজিবর রহমান সরকারি কলেজ, জয়পুরহাট

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা