kalerkantho

রবিবার  । ১৫ চৈত্র ১৪২৬। ২৯ মার্চ ২০২০। ৩ শাবান ১৪৪১

কাঁকড়া ব্যবসার বিধান

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০৯:২২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কাঁকড়া ব্যবসার বিধান

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী উপাদানগুলোর মধ্যে কাঁকড়ার অবদান ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ দেশের রপ্তানীকৃত মৎস্য সম্পদের মধ্যে চিংড়ির পরেই কাঁকড়ার স্থান। আমাদের দেশে বর্তমানে উৎপাদিত কাঁকড়ার পরিমাণ সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব না হলেও কাঁকড়া রপ্তানি থেকে প্রতিবছর প্রায় ২৫ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে।  প্রজাতিভিত্তিক মিঠা ও নোনা পানির উভয় পরিবেশে কাঁকড়া বেঁচে থাকে। মিঠা পানির কাঁকড়া আকারে ছোট এবং নোনা পানির কাঁকড়া আকারে বেশ বড় হয়। এ দেশের প্রাপ্ত সর্বমোট ১৫টি প্রজাতির কাঁকড়ার মধ্যে চার প্রজাতির স্বাদু বা মিঠা পানির কাঁকড়া এবং ১১টি প্রজাতি সামুদ্রিক। সামুদ্রিক প্রজাতির কাঁকড়ার মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁকড়া হলো ম্যাডক্র্যাব। এটি অন্যান্য প্রজাতির কাঁকড়ার তুলনায় আকারে সবচেয়ে বড় হয়ে থাকে। সেন্ট মার্টিনস বাদে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরিশাল, সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় নদীগুলো এবং মহেষখালী, কুতুবদিয়া, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, দুবলারচর এলাকা, উপকূলীয় চিংড়ির খামার, সমুদ্রের মোহনা, নদী এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল (সুন্দরবন) অঞ্চলে কাঁকড়ার বিস্তৃতি দেখা যায়। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত কাঁকড়া উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত পানিতে বাগদা চিংড়ির খামারে একই পরিবেশে বাগদা চিংড়ির সঙ্গে বড় হয়ে থাকে। চিংড়ির খামারে অবাঞ্ছিত প্রাণী হিসেবে উৎপাদিত কাঁকড়া বিগত কয়েক বছর ধরে চিংড়ির মতো বিদেশে রপ্তানি শুরু হওয়ায় উপকূলবাসীর মধ্যে কাঁকড়ার চাষ সম্পর্কে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কাঁকড়া চাষে নাম লিখিয়েছেন বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। দেশের দক্ষিণাঞ্চল সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালী এলাকায় একটি কাঁকড়ার খামার গড়ে তুলছেন সাকিব। এর নাম দিয়েছেন ‘সাকিব অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড’।

বাংলাদেশের কাঁকড়া রপ্তানি হচ্ছে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাগেরহাটের সাত উপজেলায় এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে তিন হাজার ৭৭৮টি কাঁকড়ার খামার রয়েছে। গত বছর এসব খামারে দুই হাজার ৩২ টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়েছে। এ ছাড়া প্রাকৃতিক উৎস থেকে ৫৯৭ টন কাঁকড়া আহরণ করেছে জেলেরা। জেলায় উৎপাদিত এসব কাঁকড়ার ৮০ শতাংশ চীনে রপ্তানি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, একসময় বাংলাদেশের মানুষ এই ব্যবসার সঙ্গে আরো বেশি যুক্ত হবে। ফলে এই ব্যবসার শরয়ি দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

কাঁকড়ার ব্যবসা করার বিধান
স্মরণ রাখতে হবে যে কোনো কোনো মাজহাবে আবার জলজ সব প্রাণী হালাল মনে করা হয়। হানাফি মাজহাবেও একান্ত প্রয়োজনে কিংবা ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কাঁকড়ার ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ বলা হয়েছে। (বাদায়েউস সানায়ে : ৫/৩৫, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ১৭/৩৪০)

তাই বাংলাদেশে গড়ে ওঠা কাঁকড়াশিল্পকে ঢালাওভাবে হারাম/নাজায়েজ বলার ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ এদের রক্তের এনজাইম ওষুধ এবং জৈবচিকিৎসা শিল্পে মানুষের জীবন রক্ষার্থে ইনট্রাভেনাস ড্রাগ এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রোসথেটিক গ্রুপের বিশুদ্ধতা পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয় এবং বর্তমানে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির এন্ডোটোক্সিন দূষণের পরীক্ষায়ও ব্যবহৃত হয়। (বাংলাপিডিয়া)

ইদানীং করোনাভাইরাস আতঙ্কে চীনের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ায় হতাশ হয়ে পড়ছেন বাংলাদেশের কাঁকড়া ব্যবসায়ীরা। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করছেন, বাংলাদেশের মানুষকে কাঁকড়া খেতে উৎসাহিত করে তুলতে। যাতে আমাদের দেশের কাঁকড়া ব্যবসায়ীরা বড় বিপর্যয় থেকে বেঁচে যায়। এ ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, যেহেতু বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ হানাফি মাজহাবের অনুসারী এবং তারা এটি খেতে অভ্যস্ত নয়, তাদের এটি খাওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ না করে কাঁকড়া রপ্তানির বিকল্প পথ খুঁজে বের করা উচিত। তা ছাড়া, ওষুধশিল্পেও বিশ্বের বহু দেশে এর চাহিদা আছে।

কাঁকড়া খাওয়া কি বৈধ?
হানাফি মাজহাব মতে, জলজ প্রাণীর মধ্যে মাছ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী খাওয়া জায়েজ নেই। কাঁকড়া যেহেতু মাছ নয়, তাই তা খাওয়ার ব্যাপারে অনুৎসাহ করা হয়েছে। উপরন্তু কোনো কোনো জায়গায় কাঁকড়াকে পানির বিচ্ছু বলা হয়। তাই

একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কখনো এই খাবারটি খাওয়া বৈধ নয়।

(বাদায়েউস সানায়ে : ৫/৩৫) ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ১১/৩৭৫)।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা