kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

হ্যাকিং ও ইসলামের বিধি-নিষেধ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ১০:১৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হ্যাকিং ও ইসলামের বিধি-নিষেধ

ডিজিটাল বাংলাদেশ। গ্লোবাল ভিলেজের মানচিত্রে তথ্য-প্রযুক্তিতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা প্রভাবশালী এক পরিবার। গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রাম হলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর এমন একটি সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, যেখানে পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষই একটি একক সমাজে বসবাস করে এবং আইসিটি ব্যবহারের মাধ্যমে সহজেই তাদের চিন্তা-ভাবনা, সংস্কৃতি-কৃষ্টি ইত্যাদির মিথস্ক্রিয়াসহ একে অপরকে সহযোগিতা করে থাকে।

বিশ্বগ্রামে বিচরণের জন্য হার্ডওয়্যার বা কম্পিউটার-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি (মোবাইল, টেলিফোন, স্মার্ট ওয়াচ), প্রগ্রামসমূহ বা সফটওয়্যার, ব্যক্তিবর্গের সক্ষমতা, ডাটা বা ইনফরমেশন, ইন্টারনেটে সংযুক্ততা ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। এই জিনিসগুলো ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা চিন্তার আদান-প্রদান করতে পারি। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের খবর পেয়ে যাই মুহূর্তেই। কিন্তু এই ডিভাইস, সফটওয়্যার ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এতে আমাদের ব্যক্তিগত অনেক তথ্য জমে যায় সেখানে। যেগুলো আমরা সাধারণত কারো সঙ্গে শেয়ার করতে চাই না। যদি কেউ এই তথ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে, তবে সে খুব সহজেই আমাদের বিপদে ফেলে দিতে পারে। শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও অনেক বড় ক্ষতি করে দিতে পারে। যারা এ ধরনের কাজগুলো করে তাদের আমরা চিনি হ্যাকার হিসেবে।

অন্যের গোপন তথ্য চুরি করা ইসলামের জঘন্যতম অপরাধ। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোনো চোর (পূর্ণাঙ্গ) মুমিন থাকাবস্থায় চুরি করে না। (মুসলিম, হাদিস : ১০৬)

বিশেষজ্ঞদের মতে হ্যাকারদের তিনটি শ্রেণি রয়েছে। হোয়াইট হ্যাট, গ্রে হ্যাট ও ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার। এদের মধ্যে ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার বেশ ভয়ংকর। যারা মানুষের তথ্য হ্যাক করে তাদের বিপদে ফেলে দেয়। এ ধরনের হ্যাকিং ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয়, সেদিন আসার আগে, যেদিন তার কোনো দিনার বা দিরহাম থাকবে না। সেদিন তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার জুলুমের পরিমাণ তার কাছ থেকে নেওয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ থেকে নিয়ে তা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯)।

গ্রে হ্যাট হ্যাকাররাও বিভিন্ন সিস্টেমের ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু তারা কখনো কখনো সিস্টেমের মালিককে তার ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত করে, কখনো আবার ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারদের মতো বিপদেও ফেলে। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ক্যাটাগরির হ্যাকিংও জায়েজ নেই। বিনা অনুমতিতে অন্যের গোপন তথ্য খোঁজাও ইসলামে নিষিদ্ধ।

আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেন, তোমার জন্য পর্দা (বাধা) তুলে নেওয়া হয়েছে। তাই তুমি আমার কাছে এসে আমার গোপন কথা শুনতে পারো, যতক্ষণ না আমি তোমাকে নিষেধ করি। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৯)

কাজেই হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার অর্থাৎ যারা বিনা অনুমতিতে বিভিন্ন সিকিউরিটি সিস্টেমে, কম্পিউটার নেটওয়ার্কের ত্রুটি বের করে দেয়, তাদের এমন কাজ ইসলাম অনুমোদন করে না। তবে কেউ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাদের কম্পানি বা ব্যক্তির তথ্যের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন ত্রুটি বের করার জন্য হ্যাকিং করে, তবে তা জায়েজ হবে। যারা এই প্রক্রিয়ায় বৈধ পদ্ধতিতে মানুষের নিরাপত্তার জন্য কাজ করে, তাদের ইথিক্যাল হ্যাকারও বলে।

বর্তমানে আমাদের স্মার্টফোনে ব্যবহৃত বিভিন্ন অ্যাপ আমাদের তথ্য হ্যাক করে। টেক্সট মেসেজ, কল লিস্ট, লোকেশনসহ যাবতীয় হ্যাক করে তারা আমাদের পছন্দ অপছন্দগুলো বিভিন্ন ডাটা অ্যানালিস্ট কম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়। যার মাধ্যমে তারা অনলাইনে আমাদের  পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে থাকে। বিনা অনুমতিতে মানুষের তথ্য এভাবে অন্য কম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়াও হারাম।

কারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ তার অধিকার। তার অনুমতি ছাড়া এই হক থেকে অন্য কেউ উপকৃত হওয়ার অবকাশ নেই। হজরত সাহাল ইবনে সাআদ সায়াদি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.)-এর কাছে কিছু পানীয় দ্রব্য আনা হলো। তিনি তা থেকে কিছুটা পান করলেন। তাঁর ডান দিকে বসা ছিল একটি বালক, আর বাঁ দিকে ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠরা। তিনি (সা.) বালকটিকে বলেন, এ বয়োজ্যেষ্ঠদের দেওয়ার জন্য তুমি আমাকে অনুমতি দেবে কি? তখন বালকটি বলল, না, হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কসম! আমি আপনার কাছ থেকে প্রাপ্য আমার অংশে কাউকে অগ্রাধিকার দেব না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) পানির পেয়ালাটা তার হাতে ঠেলে দিলেন। (বুখারি, হাদিস : ২৪৫১)।

অতএব যেসব অ্যাপভিত্তিক কম্পানি নিজেদের অ্যাপের মাধ্যমে মানুষের তথ্য চুরি ও বিক্রয়ে লিপ্ত রয়েছে, তারাও হারাম কাজ করছে।

কিছু হ্যাকার আছে যারা তথ্য চুরি না করলেও ডস অ্যাটাকের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইটকে সাময়িক ডাউন করে দেয়। যার দরুন ওই প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে হ্যাক করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। কিছু নিচু পর্যায়ের হ্যাকার এমনও আছে, যারা হ্যাকিংকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় দাঙ্গা পর্যন্ত সৃষ্টি করে। কারণ রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কেউ অপরের ক্ষতি করলে আল্লাহ তার ক্ষতি করবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৬৩৫)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই সূক্ষ্ম অপরাধগুলো থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা