kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

যে জাতি মৃত্যুকে তেমনি ভালোবাসে, যেমনি ভালোবাসে জীবনকে

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ    

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০৯:১০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যে জাতি মৃত্যুকে তেমনি ভালোবাসে, যেমনি ভালোবাসে জীবনকে

মৃত্যু ঈমানদারের জন্য উপহারস্বরূপ। একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো, মৃত্যু পরকালের অনন্ত সুখ লাভের সিঁড়িমাত্র। তাই প্রকৃত মুসলমান মৃত্যুকে সানন্দে বরণ করে নেয়।

সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) পারস্য সম্রাটের দরবারে প্রবেশ করেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি দৃঢ়স্বরে বলে ওঠেন, ‘হে সম্রাট! আপনার এখানে আমি এমন এক জাতি নিয়ে এসেছি, যারা মৃত্যুকে তেমনি ভালোবাসে, যেমনি ভালোবাসে জীবনকে।’

অতীতের মুসলিম মনীষীদের সামনে পাপের উপাদান ও ভোগের উপকরণ পেশ করা হতো। কিন্তু তাঁরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না। তাঁদের মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হতো। তাঁরা তাতে বিচলিত হতেন না। মৃত্যুকে তাঁরা বরণ করে নিতেন হাসিমুখে। তাঁদের কাছে তাঁদের প্রতিপালকের সন্তুষ্টিই সব কিছুর ওপরে স্থান পেত।

ইবনে কাসির (রহ.) বর্ণনা করেছেন, একবার ওমর (রা.) রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য একটি বাহিনী পাঠিয়েছেন। ওই বাহিনীতে আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.) নামে একজন যুবক সাহাবি ছিলেন। মুসলমান ও রোমানদের মধ্যে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। রোম সম্রাট মুসলমানদের অবিচলতা ও মৃত্যুর প্রতি থোড়াই কেয়ার দেখে বিস্মিত হন। তাই কিছু মুসলমান বন্দি হওয়ার পর সম্রাট একজন বন্দিকে তাঁর সামনে হাজির করতে বলেন। তারা আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.)-কে টেনেহিঁচড়ে সম্রাটের সামনে নিয়ে আসে। তাঁর হাতে হাতকড়া ও পায়ে বেড়ি পরানো ছিল। সম্রাট তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাঁর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা দেখে মুগ্ধ হন। তিনি তাঁকে বলেন, তুমি খ্রিস্টান হও, তাহলে তোমাকে এই বন্দিশালা থেকে মুক্তি দেব। আবদুল্লাহ (রা.) দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এবার সম্রাট বলেন, তুমি খ্রিস্টান হলে আমার সাম্রাজ্যের অর্ধেক তোমাকে দিয়ে দেব। তোমাকে আমার সঙ্গে রাজত্বে অংশীদার করব। আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, আপনি যদি আপনার সাম্রাজ্য, আপনার পূর্বপুরুষের সাম্রাজ্য ও আরব-অনারবের সব সাম্রাজ্য আমাকে এই শর্তে দেন যে আমি আমার ধর্ম থেকে সামান্য সময়ের জন্য ফিরে আসব, তবু আমি তা করব না।

সম্রাট ক্রোধান্বিত হয়ে বলেন, তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করব। তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি রাজি। তাহলে আমাকে হত্যা করুন।

সম্রাট তাঁকে টেনে নিয়ে যেতে বলেন। অতঃপর লোকেরা তাঁকে টেনে নিয়ে যায়। তারা তাঁকে একটি উঁচু স্থানে বেঁধে রাখে। সম্রাট তীরন্দাজ বাহিনীকে নির্দেশ দেন তাঁর চারপাশে এমনভাবে তীর নিক্ষেপ করতে, যেন তাঁর শরীরে তীর না লাগে। আর তিনি এই ফাঁকে তাঁর কাছে খ্রিস্টধর্ম উপস্থাপন করতে লাগলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর দিকে ভ্রুক্ষেপও করেননি। তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলেন। সম্রাট তাঁর ঈমানের অবিচলতা দেখে তাঁকে জেলখানায় বন্দি করে রাখতে বলেন। সৈন্যরা বাঁধ খুলে তাঁকে জেলে নিয়ে যায়। সম্রাট তাঁকে দানা-পানি দিতে নিষেধ করেন। একপর্যায়ে ক্ষুধায় কাতর হয়ে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। এ অবস্থায় তারা তাঁর সামনে মদ ও শূকরের গোশত উপস্থিত করে। আবদুল্লাহ (রা.) তা দেখে বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার জানা আছে, এ অবস্থায় এই খাদ্য গ্রহণ করা আমার জন্য বৈধ। কিন্তু আমি চাই না, আমার মাধ্যমে কাফিররা আনন্দিত হোক। তাই তিনি সেই খাদ্যগুলো ছুঁয়েও দেখেননি। সম্রাট এ খবর শুনে তাঁর সামনে উত্তম খাবার পরিবেশনের নির্দেশ দেন। অতঃপর সম্রাট তাঁর কাছে একজন সুন্দরী নারী পাঠাতে বলেন। ওই নারীকে বলা হলো, তাঁকে যেন ব্যভিচারে বাধ্য করা হয়। ওই রূপসী তাঁকে ব্যভিচারে বাধ্য করার জন্য সব কলাকৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু তিনি তার দিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি। অবশেষে ওই নারী নিরাশ হয়ে বেরিয়ে আসে। তার ভাষ্য হলো, আল্লাহর কসম! আপনারা আমাকে এমন পুরুষের কাছে পাঠিয়েছেন, আমার জানা নেই, তিনি পুরুষ নাকি পাথর। সম্ভবত সেও জানে না, আমি নারী নাকি পুরুষ। সম্রাট সব চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শেষ চেষ্টায় মনোনিবেশ করেন। তিনি একটি পিতলের হাঁড়িতে তেল গরম করতে বলেন।

এরপর আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.)-কে তার সামনে দাঁড় করান। একজন মুসলিম বন্দিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ওই ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ করা হয়, মুহূর্তের মধ্যে তাঁর দেহ তেলের সঙ্গে মিশে যায়। হাড়গুলো তেলের ওপর ভাসতে থাকে। আবদুল্লাহ বিন হোজায়ফা (রা.) তা স্বচক্ষে অবলোকন করেন। সম্রাট আবার তাঁকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে বলেন। কিন্তু যথারীতি তিনি অস্বীকৃতি জানান। সম্রাটের ক্রোধ আরো বেড়ে যায়।

তাই এবার তিনি তাঁকেই ফুটন্ত তেলে নিক্ষেপ করতে বলেন। সৈন্যরা যখন তাঁকে টেনে হাঁড়ির কাছে নিয়ে যায়, তিনি আগুনের উত্তাপ অনুভব করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কেঁদে ফেলেন। সম্রাট ভাবেন, তিনি ভয় পেয়েছেন। তাই আনন্দিত হয়ে তিনি বলেন, তুমি খ্রিস্টান হও, আমি তোমাকে অর্ধরাজ্য দিয়ে দেব। তিনি আগের মতো অস্বীকৃতি জানান।

তাহলে কান্নার হেতু কী?
আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি কাঁদছি এই জন্য যে, আমার জীবন মাত্র একটি। এই জীবন এই হাঁড়িতে নিক্ষেপ করার সঙ্গে সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ আমি মনেপ্রাণে কামনা করি, যদি আমার ১০০ জীবন হতো, আর আমি প্রতিটি জীবন আজকের মতো আল্লাহর পথে দিতে পারতাম। তখন সম্রাট বলেন, তুমি আমার মাথায় চুম্বন করো, তাহলে আমি তোমাকে ছেড়ে দেব। আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, তাহলে আপনার কাছে থাকা সব মুসলিম বন্দিকে ছেড়ে দিতে হবে। সম্রাট বলেন, ঠিক আছে। আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর কথা রাখেন। তিনি সম্রাটের মাথায় চুম্বন করেন। অতঃপর তাঁর সঙ্গে সব বন্দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা