kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ধর্মতত্ত্ব

ফ্যাশন ও মডেলিংয়ের এ যুগে অলংকার পরিধানে ইসলামের নীতিমালা

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

২৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০৯:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ফ্যাশন ও মডেলিংয়ের এ যুগে অলংকার পরিধানে ইসলামের নীতিমালা

অলংকার মানুষের রুচিবোধ, ব্যক্তিত্ববোধ, আর্থিক অবস্থা ও জীবনাচারের প্রকাশ ঘটায়। ফ্যাশন ও মডেলিংয়ের এ যুগে অলংকারের নিত্যনতুন ব্যবহারবিধি, রূপ ও পদ্ধতি প্রকাশিত হচ্ছে। ইসলাম বরাবরই সৌন্দর্যবোধকে পছন্দ করে। তবে সব বিষয়েই ইসলামের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। এ বিষয়টিও এর ব্যতিক্রম নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নারী ও পুরুষের জন্য সোনা-রুপার পাত্র আর পুরুষের জন্য সোনার আংটি ও রেশমজাত কাপড় ব্যবহার করা হারাম। আর নারীদের জন্য এগুলো ব্যবহার করা মুবাহ। তবে সোনা-রুপা ও রেশমের অনধিক চার আঙুল পরিমাণ পাড় ও আঁচল বা অনুরূপ কিছু পুরুষের জন্য বৈধ।’ (সূত্র : সহিহ মুসলিম, ইফা সংস্করণ, অধ্যায় ৩৮, পোশাক ও সাজসজ্জা, হাদিস : ৫২১৮)

কিন্তু কেন? কী কারণে পুরুষদের জন্য সোনা-রুপা ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে? নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো—

১. সোনা এমন একটি বস্তু, যার ওপর অনারবরাও গর্ব করে থাকে। যদি এ উদ্দেশ্যে সোনার অলংকার পরিধান করার ব্যাপক প্রচলন চালু হয়ে যায় যে পুরুষ ও নারী সবাই ব্যাপকভাবে পরিধান করতে পারবে, তাদের বেশি বেশি দুনিয়া অনুসন্ধানের প্রয়োজন পড়বে। রুপা এর বিপরীত, রুপার দ্বারা পুরুষদের জন্য শুধু আংটি বানানোর বৈধতা দেওয়া হলে এ অনিষ্টতা আবশ্যক হয় না। তবে নারীদের ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়ার কারণ হলো, নারীদের সাজসজ্জার প্রয়োজন বেশি হয়। কারণ সাজসজ্জার কারণে তাদের স্বামীরা আকৃষ্ট হয়। এ কারণেই আরব হোক বা অনারব হোক, পুরুষদের তুলনায় নারীদের সাজসজ্জা করার প্রয়োজন বেশি, এমন রীতি আগে থেকেই চলে আসছে। তাই পুরুষের তুলনায় নারীদের বেশি অলংকার ব্যবহারের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) উভয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে বলেন, ‘স্বর্ণ ও রেশমি পোশাক আমার উম্মতের নারীদের জন্য বৈধ করা হয়েছে এবং পুরুষদের জন্য হারাম করা হয়েছে। (তিরমিজি)

অন্য হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তির আঙুলে সোনার আংটি দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আগুনের অঙ্গার চায় সে যেন নিজ হাতে সোনার আংটি পরিধান করে।’ (মুসলিম শরিফ)

রেশমি কাপড়ের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমি কাপড় পরিধান করবে সে আখিরাতে তা পরিধান করতে পারবে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)

২. নারীদের পোশাক ও সাদৃশ্যতা থেকে পুরুষদের পৃথক রাখা আবশ্যক। এ জন্য সোনা-রুপা ও রেশম পরিধান করা নারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর রুপার আংটি ছাড়া অন্যগুলো পুরুষের জন্য হারাম।

এ সম্পর্কে ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, নারীদের সঙ্গে সাদৃশ্যতা হওয়ার কারণে সোনা ও রেশম পুরুষের জন্য হারাম করে দেওয়া হয়েছে। এরূপ সাদৃশ্য অবলম্বনকারীর ওপর অভিশাপ আরোপিত হয়।

৩. বিলাসিতার জীবন-যাপন করা আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না। রেশমি পোশাক পরিধান করা এবং সোনা-রুপার পাত্রে পানাহার করা এমন কাজ যা মানুষকে অনেক নিম্নস্তরে নামিয়ে দেয়। মন-মানসিকতাকে দ্বিন ও আখেরাতের দিক থেকে ফিরিয়ে সুখ-শান্তি ও বিলাসিতার দিকে নিয়ে যায়।

সীমাহীন বিলাসপ্রিয়তা নিন্দনীয় কাজ, তথাপি এটা কোনো বিধিবদ্ধ বিষয় নয় যে এ বিষয়গুলো নিয়ে যেকোনো নিম্নস্তরের লোক উচ্চস্তরের কাউকে কৈফিয়ত তলব করতে পারে। মানুষের জীবনপদ্ধতি বৈচিত্র্যময় হওয়ার কারণে সবার বিলাসিতা এক রকম হয় না। কারো বিলাসিতার সামগ্রী অন্যের দৃষ্টিতে সীমিত পরিসরের জীবন হিসেবে সাব্যস্ত হয়। তেমনিভাবে কোনো বস্তু একজনের কাছে মূল্যবান; কিন্তু অন্যজনের কাছে তা নগণ্য মনে হয়। তাই ইসলামী শরিয়ত সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর কারণও দর্শিয়েছে। সেগুলোর মাধ্যমে মানুষ শুধু শান্তির উপকরণ তালাশ করে এবং তা সমাজে নিছক বিলাসিতার সামগ্রী হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। ইসলামী শরিয়ত যেসব বিষয়ে রোম ও অনারবের সবাইকে অভ্যস্ত পেয়েছে সেগুলোকে পূর্ণমাত্রার বিলাসসামগ্রী হিসেবে চিহ্নিত করে হারাম আখ্যায়িত করেছে। অন্যদিকে যেসব বস্তু থেকে স্বল্প পরিসরে উপকৃত হওয়া বিধিবদ্ধ হয়েছে অথবা প্রতিবেশী দেশে ওই বিষয়টি অভ্যাসের রূপ নিয়েছে সে সম্পর্কে শরিয়ত কোনো ইতিবাচক বিধান প্রণয়ন করেনি। ফলে সোনা-রুপা ও রেশমের ব্যবহারকে হারাম সাব্যস্ত করেছে এবং সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভীতিপ্রদর্শনমূলক বাণী নির্দেশ করেছে। যেমন—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা সোনা-রুপার পাত্রে পানাহার কোরো না। কেননা এগুলো দুনিয়াতে কাফিরদের জন্য আর তোমাদের জন্য জান্নাতে। (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৫২২০)

[আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) রচিত ‘আহকামে ইসলাম আকল কি নজর মে’ থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা