kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশ্ব খাদ্য দিবস

খাদ্য নিরাপত্তায় ইসলামের নির্দেশনা

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ    

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ১১:০৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খাদ্য নিরাপত্তায় ইসলামের নির্দেশনা

১৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী খাদ্য দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও)। ১৯৭৯ সালের এফএওর সদস্য রাষ্ট্রের ২০তম অধিবেশনে হাঙ্গেরির খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রী পাল রোমানির বিশেষ ভূমিকায় ১৬ অক্টোবর খাদ্য দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, যা বর্তমানে বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে পালিত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা নিবারণ ও খাদ্যের ঘাটতি পূরণের ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করাই এ দিবসের মূল লক্ষ্য।

সুস্থ দেহ ও প্রাণ নিয়ে তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তাই সুন্দর ও সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজন দেহ ও প্রাণের উপযুক্ত খাবার। আত্মার পরিচর্যার মাধ্যমে যেমন সুস্থ মন-মস্তিষ্ক গড়ে ওঠে, তেমনি পর্যাপ্ত খাবারের মাধ্যমে দেহ হয়ে ওঠে সজীব ও সবল। আল্লাহর বিধি-নিষেধ লঙ্ঘনের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে দানা বাঁধে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, হিংসা, ভয়, লোভ-লালসা ছাড়াও আত্মার অন্যান্য রোগব্যাধি। তাই ইসলামে রুগ্ণ আত্মার যেমন প্রতিষেধক আছে, তেমনি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য আছে খাবারের সুশৃঙ্খল নীতিমালা।

মানুষের জীবন গঠনে খাবারের ভূমিকা খুবই স্পষ্ট। আর আত্মা ও দেহ রুগ্ণ হয়ে উঠলে মানুষ হারিয়ে ফেলে নিজের আসল পরিচয়। জীবন হয়ে ওঠে মরীচিকাময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে তার জীবন হবে সংকীর্ণ ও অস্থির, আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ করে পুনরুত্থিত করব।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১২৪)

ইসলামপূর্ব যুগে মরুবেষ্টিত মক্কায় নিরাপদে খাদ্য আমদানি আল্লাহর বিশেষ রহমতস্বরূপ ছিল। আর মানবজীবনে খাদ্য ও ভৌগোলিক নিরাপত্তার গুরুত্ব অপরিসীম। এই গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব তারা যেন এই গৃহের মালিকের ইবাদত করে, যিনি তাদের ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং ভীতি থেকে তাদের নিরাপদ করেছেন।’ (সুরা : কুরাইশ, আয়াত: ৪)

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করে চলাফেরার সুযোগ দেওয়ার পর থেকে মানুষ দেহের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টির পর তাঁরা খাবারের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছেন। তাই মানবজীবনে বিশৃঙ্খলা তৈরিতে খাদ্যের বিশেষ ভূমিকা আছে। আল্লাহ বলেন, ‘ইতিপূর্বে আমি আদমের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম, সে তা ভুলে গিয়েছিল, আমি তাঁকে দৃঢ়সংকল্পরূপে পাইনি।’   (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১১৫)

পৃথিবীতে মানব বসতি গড়ে উঠার পর থেকে খাদ্যের চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে। তাই যেকোনো স্থানে বসবাসের উপযুক্ততা নির্ভর করে খাদ্যের পর্যাপ্ততার ওপর। আর উন্নত নগর-রাষ্ট্রে বিলাসী জীবন অসাড় হয়ে পড়ে খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে। প্রাচীনকাল থেকে খাদ্যের অভাব পূরণে গড়ে ওঠে কৃষিব্যবস্থা। আর চাষাবাদের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে মজবুত অর্থনীতি। চাষাবাদের মাধ্যমে খাদ্যের অভাবের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে ইসলামে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো মুসলিম গাছ রোপণ করলে বা চাষাবাদ করলে, তা থেকে কোনো মানুষ বা জীবজন্তু আহার করলে তার জন্য এটি সদকা হিসেবে গণ্য হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৫৫২)

মানবসভ্যতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কৃষিব্যবস্থারও উন্নতি ঘটে। খাদ্যের মানোন্নয়ন, উৎপাদন, সরবরাহ বৃদ্ধি ও সার্বিক নিরাপত্তায় নিত্যনতুন কাজ করা অতীব জরুরি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য ভূপৃষ্ঠকে অধীন করেছেন, অতএব তোমরা এর ওপর চলাচল করো এবং তাঁর প্রদত্ত রিজিক গ্রহণ করো, তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৫)

খাবার ছাড়া যেকোনো বস্তু ব্যবহারে অপচয় পরিহার অপরিহার্য। অপচয়ের মাধ্যমে জীবনে নেমে আসে অধঃপতন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও এবং পান করো, অপচয় কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩০)

ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা খাদ্য গ্রহণ হালাল করেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তা অপচয় বা অহংকারবশত না হবে।’ (তাফসিরে তাবারি, ৪৭২/৫)

খাবার দেহের প্রয়োজন অনুপাতে গ্রহণ করা জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম নীতিও এটি। আল্লামা ইবনে রজব (রহ.) নিম্নের হাদিসটিকে সব চিকিৎসার মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মানুষ নিজের পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো বস্তু ভর্তি করে না। সে চাইলে শুধু প্রয়োজন পূরণে পেট ভর্তি করতে পারে। আবার চাইলে সে পেটের এক-তৃতীয়াংশ পূর্ণ করবে। বাকি এক-তৃতীয়াংশ পানি পান করবে। বাকি এক-তৃতীয়াংশ নিজের জন্য বাকি রাখবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৮০)

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে সুরা ইউসুফে ইউসুফ (আ.)-এর গৃহীত পদক্ষেপ ছিল ইতিহাসের যুগান্তকারী একটি ঘটনা। তৎকালীন মিসরের বাদশাহর স্বপ্নযোগে দেখা দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে তিনি এক অনবদ্য নীতিমালার উদ্ভাবন করেন। ওই সময়ে পরিকল্পিতভাবে পর্যাপ্ত চাষাবাদের মাধ্যমে আসন্ন খাদ্যের ঘাটতি ও অভাব দূর করেছিলেন তিনি। তাঁর উদ্ভাবিত খাদ্যের জোগান, ব্যবহার ও সুষম বণ্টননীতি আজও অনুসরণযোগ্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সাত বছর একাধারে চাষ করবে, আর ফসল কাটার সময় খাওয়ার সামান্য পরিমাণ ছাড়া বাকিগুলো শীষের ভেতরে রাখবে। এরপর কঠিন সাত বছর আসবে, তখন মানুষ তোমাদের জমা করা খাবার খাবে, তবে এর থেকে সামান্য তোমরা সংরক্ষণ করবে।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪৭-৪৮)

বিশ্বব্যাপী খাদ্যের নিরাপত্তা ও সুষম বণ্টনে ইসলামের শাশ্বত নির্দেশিকা অবশ্য-অনুকরণীয়।

লেখক : অনুবাদক ও গবেষক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা