kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

হারানো ঐতিহ্য

তখন মসজিদের সঙ্গেই থাকত ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল!

মুফতি তাজুল ইসলাম    

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১২:৫২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তখন মসজিদের সঙ্গেই থাকত ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল!

সুস্থতা মহান আল্লাহর অনেক বড় নিয়ামত। সুস্থতার মূল্য বোঝা যায় অসুস্থ হলে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ সুস্থতার সঠিক ব্যবহার করে না। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘এমন দুটি নিয়ামত আছে, যেগুলোর বিষয়ে মানুষ ধোঁকার মধ্যে থাকে। তা হচ্ছে, সুস্থতা আর অবসর।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

একজন মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে যায়, তখন সে নিজের অক্ষমতা উপলব্ধি করতে পারে। অসুস্থ ব্যক্তিরা নিজেকে অসহায় ভাবতে শুরু করে। সে সময় তারা অন্যের কাছ থেকে সেবা ও পরিচর্যার মুখাপেক্ষী হয়। এ জন্য ইসলামের সোনালি যুগে রোগীর সেবা করার জন্য চমৎকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। কোনো অসুস্থ রোগী যেন চিকিৎসাহীন না থাকে, এদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হতো। কারাগারে থাকা অপরাধীদেরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হতো।

বিভিন্ন বড় মসজিদ ও জনবহুল স্থানে বসানো হতো ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র। মাকরিজি (রহ.) বলেন, ইবনে তুলুন যখন মিসরের বিখ্যাত জামে মসজিদ নির্মাণ করেন, তখন মসজিদের পেছনে একটি ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রয়োজনীয় সব ধরনের ওষুধ সেখানে ছিল। প্রতি জুমার দিন একজন ডাক্তার অসুস্থদের সেখানে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন। (আলমাওয়াইজু ওয়াল ইতিবার : ৪/২৬৭)

এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের পাশাপাশি নির্মিত ছিল বড় বড় হাসপাতাল। সেখান থেকে রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হতো। সমাজের নেতৃস্থানীয় লোক ও ধনী ব্যক্তিরা অসহায় মানুষদের সেবার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য এগুলো প্রতিষ্ঠা করতেন।

সুলতান নুরুদ্দীন (রহ.) ৫৪৯ হিজরিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলমুসতাশফান নুরী আলকাবীর’। দামেস্কে নির্মিত এ হাসপাতালটি ছিল তৎকালীন দেশের সবচেয়ে সুন্দর হাসপাতাল। হাসপাতালটি শুধু গরিব ও অসহায় ব্যক্তিদের জন্য তিনি ওয়াক্ফ করেছিলেন। ধনীরাও সেখানে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারত। রোগীদের সব ধরনের ওষুধ হাসপাতাল থেকে বিনা মূল্যে প্রদান করা হতো।

৮৩১ হিজরিতে একজন রুচিশীল পর্যটক আলমুসতাশফান নুরীতে যান এবং হাসপাতালের সেবার মান, শৃঙ্খলা, খাবারদাবার ও রোগীদের প্রতি চিকিৎসকদের যত্ন দেখে অভিভূত হন। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁদের কতটুকু অভিজ্ঞতা আছে তা পরীক্ষা করার জন্য অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রধান চিকিৎসক এসে তাঁর নাড়ি ধরে বুঝতে পারেন—আসলে তাঁর কোনো রোগ নেই। চিকিৎসকদের পরীক্ষা করাই উদ্দেশ্য। তিন দিন পর্যন্ত তাঁকে হাসপাতালে আপ্যায়ন করা হয়। মুরগি, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও ফল দিয়ে যত্ন করা হয়। তিন দিন পর প্রধান চিকিৎসক তাঁকে একটি কাগজ দিলেন, সেখানে লেখা ছিল, আমাদের এখানে তিন দিন মেহমানদারি করা হয়। তখন তিনি বুঝে গেলেন, চিকিৎসক আগেই তাঁর রোগ ধরে ফেলেছেন। (তারিখুনা আলমুফতারা আলাইহি, পৃষ্ঠা : ১৬৩)

৬৮৩ হিজরিতে আলমালিকুল মানসুর সাইফুদ্দীন নির্মাণ করেন ‘আলমুসতাশফাল মানসুরী আলকাবীর’। শৃঙ্খলা ও পরিপাটির দিক থেকে এটি ছিল তৎকালীন যুগের পৃথিবীর সুন্দরতম একটি হাসপাতাল। এর চিকিৎসাসেবাও ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত ও সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। প্রত্যেক রোগীর সেবায় দুজন ব্যক্তি নিযুক্ত থাকত। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, শুধু হাসপাতালে অবস্থানরত ব্যক্তিদেরই চিকিৎসাসেবা দিত না; বরং যেসব রোগী হাসপাতালে আসতে অক্ষম, তাদের বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়া হতো এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হতো। প্রতিদিন প্রায় চার হাজার মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হতো এ হাসপাতাল থেকে। যারা সেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠত, যাওয়ার সময় পরিধান করার জন্য তাদের একটি করে নতুন কাপড় দেওয়া হতো এবং ঘরে ফিরে অতিরিক্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ করে স্বাস্থ্যের যেন অবনতি না ঘটে এ জন্য প্রয়োজন পরিমাণ অর্থও দিয়ে দেওয়া হতো। (মিন রাওয়াইয়ি হাদারাতিনা, পৃষ্ঠা : ২১২)

সোনালি দিনগুলোতে এসব স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য অবারিত ছিল। কারাবন্দিরাও এ সেবার বাইরে ছিল না।

অজির আলী ইবনে ঈসা বাগদাদের প্রধান চিকিৎসক সিনান ইবনে সাবেতকে লিখেছিলেন, আমি বন্দিদের ব্যাপারে ভেবে দেখেছি। সংখ্যাধিক্য এবং প্রতিকূল আবহাওয়া ও অবস্থানের কারণে অনেক সময় তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই তাদের জন্য আলাদা চিকিৎসক নির্ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব। চিকিৎসক প্রতিদিন কারাগারে যাবে। পুরো কারাগার ঘুরে অসুস্থদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করবে। (তারিখুল হুকামা, পৃষ্ঠা ১৪৮)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা