kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

মুসলিম মনীষী

তিনি যুগশ্রেষ্ঠ তাফসিরবিদ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১২:২৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তিনি যুগশ্রেষ্ঠ তাফসিরবিদ

ইসলামের সোনালি যুগের সুঘ্রাণ যখন পৃথিবীকে মুখরিত করছিল, তখন এ ঘ্রাণ ইউরোপে গিয়েও পৌঁছেছিল। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদের সময় তাঁর নিযুক্ত উত্তর আফ্রিকার গভর্নর মুসা ইবন নুসাইবের নির্দেশে বীর সেনানায়ক তারিক ইবন জিয়াদ স্পেন জয় করেন। মুসলিম শাসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় স্পেন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তাঁরা স্পেন শাসন করেন ৭৮০ বছর। আর তখন সেখানে জন্ম নেয় বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক, গণিতবিদ, সাহিত্যিক ও গবেষক। মুসলিম শাসকরা যখন বিলাসিতা ও দুনিয়াপ্রেমিক হয়ে পড়েন, তখন স্পেনে মুসলমানদের ওপর নেমে আসে অমানিশার ঘোর আঁধার। ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা প্রথম ফার্নান্ডো কর্ডোবা দখল করলে মুসলমানদের রক্তে রঞ্জিত হয় স্পেনের মাটি। হত্যা করা হয় বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ও জ্ঞানী-গুণীদের। ইমাম কুরতুবি তখন ছিলেন টগবগে যুবক। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন স্বীয় পিতার হত্যার করুণ দৃশ্য। অতঃপর শত্রু ফাঁকি দিয়ে কোরআন মাজিদ অধ্যয়ন করতে করতে সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে চলে আসেন মিসরে।

পরিচিতি : নাম মুহাম্মদ, উপনাম, আবু আবদুল্লাহ, পিতার নাম আহমদ, দাদার নাম আবু বকর, পরদাদার নাম ফারহ, নেসবতি নাম আনসারি, খাজরাজি। উপাধি কুরতুবি। স্পেনের কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেছেন বলে তাঁকে কুরতুবি বলা হয়।

জন্ম : হিজরি সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে তিনি স্পেনের কর্ডোবায় জন্মগ্রহণ করেন।

পারিবারিক অবস্থা : ইমাম কুরতুবি দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন কৃষক। স্প্যানিশ আক্রমণের সময় পিতা মারা যান। তরুণ বয়সে তিনি পাত্র তৈরির জন্য তাঁর পরিবারে মাটি আনার কাজ করেছেন।

দেশত্যাগ : ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা ফার্নান্ডো কর্ডোবা দখল করলে ইমাম কুরতুবি আলেকজান্দ্রিয়া চলে যান। সেখানে তিনি তাফসির ও হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি মিসরের রাজধানী কায়রো যান এবং মুনিয়া আবিল খুসাবে বসবাস শুরু করেন এবং অবশিষ্ট জীবন এখানেই অতিবাহিত করেন।

গুণাবলি : ইমাম কুরতুবি ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, সাহিত্যিক ও ফিকাহবিদ। তিনি সদা ইবাদত বন্দেগি ও জ্ঞানসাধনায় নিয়োজিত থাকতেন। শহরের কোলাহলমুক্ত নির্ঝঞ্ঝাট গ্রামীণ পরিবেশে নীরবে রচনা করে গেছেন সুবিশাল সাহিত্যকর্ম। তাঁর এসব রচনা বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা, পাণ্ডিত্য ও গভীর জ্ঞানের পরিচয় বহন করে। অনেক পণ্ডিত তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ কর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

রচনা সম্ভার : ইমাম কুরতুবি আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন অসংখ্য অমূল্য রচনা সম্ভার। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ কিছু হলো— ১. আল জামে লি আহকামিল কোরআন (তাফসিরে কুরতুবি), তা ২০ খণ্ডে বিভক্ত। ২. আল আসনা ফি শরহে আসমায়িল্লাহ হিল হুসনা। ৩. আত তাসকিয়া বি আহওয়ালিল মাওতা ওয়া উমুরিল আখিয়াহ। ৪. আত তাজকার বি আফদালিল আজকার। ৫. কামউল হারসি বিজ জুহদি ওয়াল কানাআতি ওয়া রাদ্দি জিল লিস সাওয়াল বিল কুতুবি ওয়াশ শাফায়াতি। ৬. শারহুত তাকাসি। ৭. আরজুযাহ ফি আসমায়িন নবী (সা.)। ৮. আত তাকরির লি কিতাবিত তামহিদ। ৯. আল মুকতাবাস ফি শারহি মুয়াত্তা মালিক ইবন আনাস। ১০. আল লামউল লু’লুবিয়া ইত্যাদি।

মাজহাব : উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে ইমাম মালিক (রহ.)-এর অনুযায়ী তখন বেশি ছিল। ফলে স্পেনের বেশির ভাগ মুসলমান মালিকী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। এ হিসেবে ইমাম কুরতুবি (রহ.)ও মালিকী মাজহাবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

মৃত্যু : ইমাম কুরতুবি হিজরি ৬৭১ সালে মোতাবেক ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে আল মুনিয়া শহরে মৃত্যুবরণ করেন। আল মুনিয়া আবিল খুসাবে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর কবরের পাশে তাঁর নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়।

তাফসিরে কুরতুবির বৈশিষ্ট্য

তাফসিরে কুরতুবির রয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য :

১. উন্নত ভূমিকা : ইমাম কুরতুবি তাঁর বিখ্যাত তাফসিরের শুরুতে উলুমুল কোরআনবিষয়ক একটি উন্নত ভূমিকা পেশ করেছেন। এতে ফাজায়েলে কোরআন, কোরআন তেলাওয়াতের নিয়ম-নীতি, ই’রাবুল কোরআন, তাফসির ও মুফাসসিরদের ফজিলত, কোরআন মাজিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, নিজস্ব রায় দ্বারা তাফসির করার বিষয়ে ভীতি প্রদর্শন, মুফাসসিরদের স্তর, হাদিস দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা, কোরআন সংকলনের ইতিহাস, সুরা ও আয়াতগুলোর বিন্যাস, কোরআনের অলৌকিকতা প্রভৃতি বিষয় উল্লেখ করেছেন, যা জানা একজন কোরআন গবেষক ও মুফাসসিরের জন্য আবশ্যক।

২. অবতীর্ণের প্রেক্ষাপটের বর্ণনা : কোরআনের মর্মার্থ অনুধাবন করার জন্য আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট জানা আবশ্যক। ইমাম কুরতুবি কোরআন মাজিদের মর্মার্থ বোঝার সুবিধার্থে আয়াত অবতীর্ণের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন।

৩. আয়াতগুলো বিভিন্ন মাসআলায় বিভক্তকরণ : তিনি এক বা একাধিক আয়াত উল্লেখকরত সেগুলোকে বিভিন্ন মাসআলায় বিভক্ত করেছেন। যেমন—সুরা ফাতিহার তাফসিরকে চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছেন। প্রথম অধ্যায়ে সুরা ফাতিহার ফজিলত ও নামগুলোকে সাতটি মাসআলায়, দ্বিতীয় অধ্যায়ে এর শানেনুজুল ও বিধি-বিধানগুলোকে ২০টি মাসআলায়, তৃতীয় অধ্যায়ে আমিন প্রসঙ্গটি আটটি মাসআলায়, চতুর্থ অধ্যায়ে সুরার অর্থ, ক্বিরাআত, ইরাব ও প্রশংসাকারীদের ফজিলত ৩৬টি মাসআলা আলোচনা করেছেন।

৪. হাদিসের ওপর নির্ভরতা : ইমাম কুরতুবি (রহ.) স্বীয় তাফসিরে হাদিসের ওপর নির্ভর করেছেন। কুরতুবিতে তিনি ছয় হাজার ৫০০-এর বেশি হাদিস উল্লেখ করেছেন। তাফসিরের যথার্থতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি হাদিসকে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন।

৫. জোরালো দলিল গ্রহণ : ইমাম কুরতুবি (রহ.) ছিলেন মালেকি মাজহাবের অনুসারী। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে মালেকি মাজহাবের খ্যাতনামা আলেম-ওলামা ছাড়াও শাফেঈ মাজহাবের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু মালেকি মাজহাবের প্রতি ইমাম কুরতুবি (রহ.)-এর গোঁড়ামি ছিল না। জোরালো দলিল যে মাজহাবের পক্ষে গেছে তিনি সে মতটিই গ্রহণ করেছেন। দুর্বল দলিলবিশিষ্ট বর্ণনাগুলোকে তিনি বর্জন করেছেন। পূর্ণ আমানতদারির সঙ্গে মাসআলাগুলোর ব্যাখ্যা করেছেন। মুহাম্মদ হুসাইন আজ-জাহাবী (রহ.) বলেছেন, ইমাম কুরতুবির প্রশংসনীয় দিক হলো, তিনি মালেকি মাজহাবের প্রতি আদৌ গোঁড়ামি প্রদর্শন করেননি। তাঁর দৃষ্টিতে যে মতটি সঠিক বলে মনে করেছেন, সে মতই গ্রহণ করেছেন। সে মতের প্রবক্তা যে মাজহাবেরই হোক না কেন।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা