kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

শিশু ও টেলিভিশন

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২২:০৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শিশু ও টেলিভিশন

কোনো কোনো শিশুর জন্য মাতা-পিতার পর টেলিভিশন যেন তৃতীয় অভিভাবক। শিশুদের মা-বাবা শিশুদের বিরক্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের দীর্ঘ সময় টেলিভিশন দেখার প্রতি উৎসাহিত করে আরাম অনুভব করেন। আবার শিশুবিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারকারী অনেক টিভি চ্যানেল শিশুদের মা-বাবাকে তাঁদের শিশুদের টিভির সামনে ছেড়ে দিতে বিশ্বাস জন্মিয়েছে। তাঁদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে টিভি শিশুদের যত্ন নেয় ও শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তবে এই টিভি দেখার দরুন শিশুদের যে ক্ষতি হয়, তা তাদের প্রদত্ত সুবিধা থেকে অনেক বেশি। এ বিষয়ে কৃত ব্যাপক অনুসন্ধান ও একাডেমিক গবেষণার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও তাদের নির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা মেনে টিভি দেখতে দেওয়া উচিত, যা নিচে দেওয়া হলো—

১. প্রতিদিন টিভি দেখার সময় সব মিলিয়ে ১ থেকে ২ ঘণ্টার বেশি যেন না হয়।

২. যেসব প্রগ্রাম তারা টিভিতে দেখে, তা যেন মৌলিকভাবে শিক্ষামূলক হয়।

৩. এ ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা মুখ্য। সন্তান টিভিতে যা দেখছে, তা নিয়ে নজরদারি করা দরকার।

টিভি দেখার নেতিবাচক প্রভাব

১. দীর্ঘ সময় ধরে টিভি দেখা শিশুকে এমন সব প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে বঞ্চিত করে, যা তার মস্তিষ্কেও যথাযথ উন্নতির জন্য জরুরি ও মেধা বিকাশে প্রয়োজন হয়। টিভি দেখা শিশুদের যেসব কাজ থেকে বঞ্চিত করে, তাদের একটি হলো, মা-বাবার সঙ্গে বিনোদন করা। কারণ শিশু দীর্ঘ সময় ধরে টিভির সামনে বসে থাকে। এটা শিশুদের এমন অনেক উপকারী খেলা থেকে বঞ্চিত করে, যা তাদের মানসিক সক্ষমতাকে উন্নত করে। তা ছাড়া এটা শিশুদের শারীরিক স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড হ্রাস করে। অনুরূপ আপনজনের সঙ্গে বিনোদনের অভাব শিশুর সামাজিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করে।

২. শিশু দীর্ঘ সময় টিভির সামনে বসে থাকা ও টিভি দেখার সময় অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ায় ও রেডিমেট খাবার খাওয়ার ফলে টিভিকে মেদ বাড়ার একটি উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

৩. এটা শিশুর একাডেমিক লেখাপড়া ও সামাজিক সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করে।

৪. কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগীয় একজন প্রফেসরের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, একটি শিশুর এক ঘণ্টা টিভি দেখার দরুন তার ১০ শতাংশ সচেতনতা ও মনোযোগের দক্ষতা কমে যায়। এটা শিশুকে সাধারণত পড়ার প্রতি অনীহা ও বইয়ের প্রতি তার অনুরাগ কমিয়ে ফেলে। এটা তাকে এমন এক অলস চিন্তাশীল বানায় যে সে সহজেই বিরক্ত হয়।

৫. কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন স্টাডি বিভাগের ডিন ড. মুস্তফা আবদুস সামি বলেন, টিভি দেখার দরুন শিশুর ওপর এর শারীরিক ও মানসিকভাবে একটি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে এবং শিশুর উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি হ্রাস করে, সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল করে এবং অনীহা ও উদাসীনতা সৃষ্টি করে।

৬. সহিংস নাটক ও হত্যার দৃশ্যপট শিশুর মাঝে ভয়, আতঙ্ক ও ভয়ানক দুঃস্বপ্ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যেসব শিশু দুই থেকে সাত বছরের, তাদের ওপর এর প্রভাব বেশি। এসব দৃশ্যপট তাকে হিরো ও সুখী করবে ভেবে শিশু তার আপনজনের সঙ্গে ওই চরিত্রের সহিংস অভিনয়ও করতে পারে।

৭. শিশু টিভি ও ডিশ দেখার দরুন অশ্লীল ও পর্নোগ্রাফির মতো উপাদান দেখারও প্রবল সম্ভাবনা থাকে। অনেক পরিবার তাদের শিশুদের নিয়ে টিভির চারপাশে ভিড় জমায় এবং তার সামনে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে বসে ওই সব লোকের দ্বারা তৈরি এমন মুভি ও বিভিন্ন প্রগ্রাম দেখে, যার বেশির ভাগ পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করে না।

৮. প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখা, বিশেষভাবে খাদ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপন দেখার মধ্যে শিশুদের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে ওই সব শিশুর জন্য এটি ক্ষতিকর, যারা সব কিছু টিভিতে খুঁজে বেড়ায় এবং এতে যা দেখে তা-ই সর্বোত্তম ভাবে। প্রায় সময় বিজ্ঞাপন করা খাদ্যসামগ্রী শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যেমন—চিপস বা এমন খাবার, যাতে প্রচুর চর্বি, চিনি বা উচ্চমাত্রার ক্যালরি রয়েছে। খাদ্যে মেশানো ওই সব উপাদানের কারণে শিশুদের অতিমোটা বা স্থূল করে তুলবে।

একান্ত যদি টিভি দেখতেই হয়

এমন কিছু উপদেশ, যা টিভিকে হন্তারক শক্তি থেকে শিশুদের জন্য কিছুটা উপকারী হিসেবে পরিণত করবে—

১. যদি শিশু দুই বছরের কম বয়সী হয়, তাহলে তার মোটেই টিভি দেখা উচিত নয়।

২. টিভিকে শিশুনির্ভর ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। তা ছাড়া মা-বাবাকে তাঁদের শিশুদের সঙ্গে টিভি দেখতে হবে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, যাতে তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের উপকারী দিকটা প্রবেশ করিয়ে দেওয়া যায় এবং ক্ষতিকর দিকটা দূর করা যায়। কারণ তারা এসব প্রগ্রামে কোনটা বাস্তব আর কোনটা কাল্পনিক, তা পার্থক্য করতে সক্ষম নয়।

৩. শিশুকে নির্দিষ্ট সময় টিভি দেখার অনুমতি দিন, এটা যেন  প্রতিদিন ১-২ ঘণ্টার বেশি না হয়। তা ছাড়া এটাও যেন টিভি দেখার ওই সময়ানুযায়ী হয়, যে সময় মা-বাবা সময় দিতে রাজি হন।

৪. আপনার শিশুকে প্রচুর টিভি না দেখার উপমা পেশ করুন।

৫. টিভির বিকল্প উপস্থাপন করুন। যেমন—কিছু খেলাধুলা, কিছু শখ পালন করা এবং তাকে এমন কিছু শারীরিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত করুন, যা আপনার শিশুকে উপকার দেবে।

৬. টিভি দেখার সময় খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন।

৭. আপনার শিশুকে টিভি দেখার অনুমতি দেওয়ার আগে অনুষ্ঠানের বিষয়সূচি খুঁজে বের করুন।

৮. ওই সব কার্টুন দেখা এড়িয়ে চলুন, যেগুলোর মধ্যে সহিংসতা ও হিংস্রতা রয়েছে। এ ধরনের চরিত্রের মধ্যে রয়েছে টম অ্যান্ড জেরি, যা সাধারণত জেদি মনোভাবাপন্ন ও সহিংস চরিত্রভিত্তিক হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে এর প্রদর্শন এখন খুব জনপ্রিয়।

৯. আপনার শিশুকে বাড়ির কাজ ও গৃহস্থালির কাজকর্ম সম্পাদনের আগে টিভি দেখার অনুমতি প্রদান করবেন না।

১০. রিমোট কন্ট্রোল আপনার শিশুর হাতে ছেড়ে দেবেন না। 

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতুল মদিনা, নবাবপুর, ঢাকা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা