kalerkantho

রুক্ষ ও প্রতিকূল আরবে যেভাবে আমূল পরিবর্তন আনে ইসলাম

মুফতি আবদুল্লাহ নুর    

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ১০:৫৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রুক্ষ ও প্রতিকূল আরবে যেভাবে আমূল পরিবর্তন আনে ইসলাম

রুক্ষ ও প্রতিকূল পরিবেশের ভেতর গড়ে ওঠে আরব সভ্যতা। আরব উপদ্বীপের কোথাও কোথাও সবুজের ছোঁয়া থাকলেও এর বৃহদংশই প্রাণহীন মরু। তাই আরব সভ্যতার জীবন-জীবিকার প্রশ্নটি সব সময় মুখ্য ছিল। পশুর চারণভূমি ও পানির উেসর সন্ধান ও তার নিরাপত্তায় ব্যয় হতো আরবদের সামগ্রিক চেষ্টার বড় অংশ। তাদের ধর্ম ও সাহিত্য চর্চায় বিষয়টি প্রাধান্য পায়। নিজ গোত্রের নিরাপত্তার জন্য যেমন তারা প্রার্থনা করত, তেমনি গোত্র স্বার্থ রক্ষাকারী বীররা প্রচার পেত সমকালীন সাহিত্যে। ইসলামপূর্ব আরবে আরবি সাহিত্য চরম উৎকর্ষ লাভ করে। আরবি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয় জাহেলি যুগকে। গোত্রীয় নিরাপত্তা রক্ষায় তারা যত সাহসী ও হিংস্র ছিল, তেমনি গোত্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় নিজস্ব নিয়ম-নীতির প্রতি ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ। এ ছাড়া রক্তের পবিত্রতা রক্ষা, আতিথেয়তা, অঙ্গীকার রক্ষা, নিরাপত্তা বিধান, বদান্যতার মতো অনেক ভালো গুণের চর্চা ছিল আরব সমাজে। ধর্মীয় বিচারে ইসলামপূর্ব আরবরা ছিল মূর্তিপূজারি। গোত্র ও অঞ্চলভেদে পৃথক পৃথক মূর্তিপূজা-অর্চনা হতো। আবার সমগ্র আরবে কিছু অভিন্ন মূর্তির উপাসনা হতো, যদিও আরব উপদ্বীপের এক দল সত্যানুসন্ধানী ইবরাহিমি ধর্মের অনুসারী ছিল। তারা একত্ববাদে বিশ্বাস করত এবং মূর্তিপূজা করত না।

ইসলামের আগমনে আরব সভ্যতায় আমূল পরিবর্তন আসে। ইসলাম ও আরব সভ্যতা পরস্পরকে আত্মস্থ করে। ইসলামপূর্ব অনেক আরবরীতিকে ইসলাম স্বীকৃতি দিয়েছে। আরব সমাজে চর্চিত বিষয়গুলো ইসলামী আইনের উৎসর (উরফ) মর্যাদা দিয়েছে। একইভাবে আরব সভ্যতার অসততা, অনৈতিকতা, স্খলন, অবিশ্বাস, জুলুম, সংকীর্ণ গোত্রচিন্তাকে দূরীভূত করেছে ইসলাম। বিশ্বাসের সংস্কার দিয়ে শুরু করলেও ধীরে ধীরে আরব সভ্যতা ইসলামী সভ্যতায় রূপান্তরিত হয়।

বিশ্বাসের সংস্কার
ইসলামের আগমনের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বপ্রথম একত্ববাদের আহ্বান জানান। ইবরাহিম (আ.) প্রবর্তিত ধর্মের উত্তরসূরি হলেও আরবরা একত্ববাদের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায়। মহান স্রষ্টা আল্লাহর ওপর থেকে তাদের বিশ্বাস সরে যায় পৌত্তলিকতায়। অগ্নি উপাসক ও প্রকৃতি পূজারিদের একটি দলও ছিল আরবে। ফলে তাদের জীবন ও বিশ্বাস আক্রান্ত হয় নানা আড়ষ্টতায়। আবার বিচ্যুত ধর্মবিশ্বাস আরবদের নানা বিরোধের সৃষ্টি করেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) একত্ববাদের শাশ্বত বিশ্বাসের প্রতি আরবদের আহ্বান জানান। ব্যক্তিগত জীবনেও মানুষকে পবিত্র হওয়ার আহ্বান জানান। বিশ্বাসের সংস্কার ও নৈতিক উন্নতিই ছিল ইসলামী সভ্যতা বিকাশের প্রথম ধাপ।

পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা
বিশ্বাসের সংস্কারের পর মহানবী (সা.) আরবদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি মনোযোগ দেন। আল্লাহর নির্দেশনায় তিনি তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। পরিবার গঠন, পরিচালনা ও তার সদস্যদের অধিকার বিষয়ে কথা বলেন। ইসলামপূর্ব আরব সমাজে বিয়ের প্রচলন থাকলেও তাতে নানা অবিচারের আশ্রয় ছিল। যেমন—পিতার মৃত্যুর পর ছেলে পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করত সম্পদ ভোগের জন্য। কখনো সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে বিধবাকে বিয়ের অনুমতি দেওয়া হতো না। পরিবারে নারী ও কন্যাসন্তানের কোনো সুনির্দিষ্ট অধিকার ও মর্যাদা ছিল না। সামাজিক জীবনে ছিল শক্তি ও সম্পদের আধিপত্য। সামাজিক সুবিচার বলতে কিছুই ছিল না। ইসলাম মৌলিক অধিকারে সব মানুষ সমান—এই ঘোষণা দেয়। অন্যের সম্পদ, সম্ভ্রম ও মর্যাদা হরণকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে।

রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা
ইসলামপূর্ব আরবে কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছিল না। আরব উপদ্বীপে ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রীয় শাসন। ইসলাম আরব উপদ্বীপে প্রথম রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। অবশ্য আরবের সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেন রোমান সাম্রাজ্যের অধীন হওয়া থেকে সেখানে একটি প্রশাসনিক কাঠামোর ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামো দাঁড় করান। তাঁর রচিত মদিনার সনদ একটি আধুনিক ও সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা সুদৃঢ় করে। মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী সমাজ-সভ্যতা ও রাষ্ট্রের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

মক্কা বিজয়ে ইসলামী সভ্যতার অগ্রযাত্রা
কালক্রমে তাওহিদের ভূমি মক্কা পরিণত হয়েছিল পৌত্তলিক আরবদের প্রাণকেন্দ্রে। একত্ববাদের চর্চায় নির্মিত পবিত্র কাবাঘরে স্থান পেয়েছিল অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তি। অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবাঘরকে মূর্তিমুক্ত করেন। মক্কা বিজয় আরবে পৌত্তলিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির পতন এবং আরব সভ্যতার ইসলামায়ন চূড়ান্ত হয়। ঐতিহাসিক এই বিজয়ের পর আরবের দ্বিধাগ্রস্ত গোত্রগুলো ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় আরব উপদ্বীপের ইসলামী সভ্যতা শক্ত ভিত লাভ করে। তবে তা স্থিতিশীল হয় পরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদার শাসনামলে। ইসলামের প্রচার-প্রসার, ইসলামী শিক্ষার বিস্তার, প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিন্যাস ও সুশাসন আরব সভ্যতায় ইসলামের প্রভাব দিন দিন গভীর থেকে গভীর করছিল। একইভাবে ইসলামী বিশ্বাস ও মূল্যবোধ আরবি ভাষা ও সাহিত্যের স্রোতধারাই বদলে দেয়। বিশেষত পবিত্র কোরআনের ভাষা ও সাহিত্যমান ছিল আরবদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়কর। কোরআন আরবি ভাষার নতুন গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। খোলাফায়ে রাশেদার যুগেই আরব সভ্যতা ইসলামী সভ্যতায় রূপান্তরিত হয়। ইসলাম ও ইসলামী শাসনের প্রভাবে আরবদের সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যাভ্যাসে পর্যন্ত পরিবর্তন আসে। একসময় মদ, জুয়া, পরনারী হরণ, অন্যের সম্পদ ভোগে কাতর আরব গোত্রগুলো একটি সভ্য, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক জীবনে অভ্যস্ত হয়। তাদের পেশাগত ও অর্থনৈতিক জীবনেও আসে বৈচিত্র্য।

বিশ্বসভ্যতায় আরব সভ্যতার প্রভাব
ইসলামের মহান চার খলিফার পর উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনকালে ইসলামী সাম্রাজ্যের সীমানা আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এ সময় ইউরোপীয় দর্শন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে ইসলামী সভ্যতা। মুসলিম শাসকরা পরদেশি বলে প্রত্যাখ্যান না করে তা আত্মস্থ করেন। ইউরোপীয় সাহিত্যের অনুবাদ উমাইয়া আমলে শুরু হলেও আব্বাসীয় আমলে তা বিশেষ যত্ন লাভ করে। আব্বাসীয় শাসকদের রাজধানী বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত হয় বায়তুল হিকমা নামক আধুনিক গবেষণাগার। মুসলিম শাসকরা ইউরোপীয় দর্শন ও সাহিত্যের শুধু অনুবাদ করেননি, বরং তার উন্নয়নে যথেষ্ট অবদানও রেখেছেন। মুসলিম স্পেনের অবদানের কথা ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরাও নিঃসংকোচে স্বীকৃতি দিয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নে স্পেনীয় মুসলিমদের অবদান চিরস্মরণীয়।

মূলত ইসলাম ও ইসলামী সভ্যতা কোনো সভ্যতাকে ধ্বংস করতে কখনো উদ্যত হয়নি, বরং নিজস্ব নীতিমালার আলোকে তা আত্মস্থ করা এবং তা থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করেছে। মানুষের কল্যাণে তার উন্নয়নও করেছে। এ জন্য সমকালে ইসলামী সভ্যতার যে কাঠামো আমরা দেখতে পাই, তাতে আরব, পারস্য, ইউরোপ ও ভারতীয় সভ্যতার অনেক উপকরণ খুঁজে পাওয়া যায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা