kalerkantho

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজবিবি মসজিদ

গ্রানাইটের কিবলা, পূর্ণ প্রস্ফুটিত গোলাপের স্প্যান্ড্রিল-গম্বুজে সেলকুজ স্থাপত্যরীতি

শেখ আবদুল্লাহ বিন মাসউদ    

২৫ আগস্ট, ২০১৯ ০৯:১০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



গ্রানাইটের কিবলা, পূর্ণ প্রস্ফুটিত গোলাপের স্প্যান্ড্রিল-গম্বুজে সেলকুজ স্থাপত্যরীতি

বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জে সুলতানি আমলের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক রাজবিবি মসজিদ। ধারণা করা হয়, ইলিয়াস শাহর আমলে (১৪৮০ খ্রি.) মসজিদটি নির্মিত হয়। রাজবিবি মসজিদটি খনিয়াদিঘি মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি প্রাচীন গৌড় নগরের উঁচু মাটির দেয়াল থেকে উত্তরে এবং ঐতিহাসিক খনিয়াদিঘির পশ্চিম পারে অবস্থিত। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রাজবিবি মসজিদ পরিচালিত হচ্ছে।

সুলতানি আমলে নির্মিত হলেও এ সময়ের অন্যান্য মসজিদের সঙ্গে এর সাদৃশ্য খুব সামান্য। বরং সেলজুক ও উসমানীয় আমলে নির্মিত মসজিদে অনুসৃত স্থাপত্যরীতির সঙ্গে রাজবিবি মসজিদের মিল রয়েছে। ধারণা করা হয়, মোঙ্গলীয়দের আক্রমণের মুখে ভারতবর্ষে আশ্রয় নেওয়া কোনো সেলজুক স্থাপত্য কারিগর নির্মাণ করে থাকবেন মসজিদটি।

রাজবিবি মসজিদে ৯ মিটার প্রশস্ত মূল প্রার্থনাকক্ষ ছাড়াও রয়েছে তিন মিটার প্রশস্ত বারান্দা। প্রার্থনাকক্ষের ওপর গোলাকার গম্বুজ আকৃতিতে নির্মাণ করা হয়েছে ছাদ। আর বারান্দায় রয়েছে তিনটি ছোট গম্বুজ। প্রধান গম্বুজটি অন্তঃকোণগুলোতে নির্মিত অর্ধগম্বুজাকৃতির আড়াআড়ি খিলান (স্কুইঞ্চ), চার প্রধান পাশের বদ্ধ খিলান এবং খিলানগুলোর মধ্যবর্তী পেন্ডেন্টিভের ওপর স্থাপিত। ছোট গম্বুজ তিনটিও একই রীতিতে নির্মিত। বারান্দা থেকে প্রার্থনাকক্ষে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি খিলানপথ। ইমারতের বাইরের চার কোণে রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ। এগুলো ছাদ পর্যন্ত উঁচু। আরো দুটি বুরুজ প্রার্থনাকক্ষ ও বারান্দার মিলনস্থলকে চিহ্নিত করেছে। ইমারতের কার্নিস সামান্য বক্রাকারে তৈরি।

কিবলা দেয়াল অভ্যন্তরভাগে গ্রানাইট পাথরের টুকরা দ্বারা আবৃত। এই দেয়ালে আছে অর্ধবৃত্তাকৃতির কুলুঙ্গিতে তিনটি মিহরাব, পূর্ব দিকের তিনটি খিলানপথের বরাবর। গম্বুজ বহনকারী বদ্ধ খিলান ও স্কুইঞ্চগুলো দেয়ালগুলোতে দৃঢ়ভাবে নিহিত পাথরের স্তম্ভগুলোর ওপর স্থাপন করা হয়েছে। তিনটি মিহরাবের মধ্যে মাঝেরটি অন্য দুটির তুলনায় বড়। আয়তাকার ফ্রেমে স্থাপিত এই মিহরাবের প্রতিটির মুখে খাঁজকাটা খিলান রয়েছে।

প্রতিষ্ঠাকালে পুরো ইমারতটি টেরাকোটা অলংকরণে শোভিত ছিল, যার কিছু চিহ্ন ভেতরে ও বাইরে এখানে-সেখানে এখনো বিদ্যমান। ইমারতের চারদিকে ছাঁচকৃত দুটি কার্নিসপট্টির মধ্যবর্তী স্থানসমূহে রয়েছে লতাপাতার নকশাসমৃদ্ধ ক্ষুদ্রাকৃতির খিলান সারি। এর আরো নিচে রয়েছে হীরকখণ্ডাকৃতি ও বুটিদার নকশার সারিসহ এক জোড়া সমতল পট্টিবলয়। চার দেয়ালের সম্মুখভাগে (ফাসাদে) আছে স্পষ্টভাবে অভিক্ষিপ্ত আয়তাকার প্যানেলের দুটি সারি। এগুলো জানালার ধারণা দেয়। এ ধরনের অলংকরণ বাংলার সুলতানি আমলের মসজিদগুলোতে অত্যন্ত লোকপ্রিয়ভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

কিবলা দেয়ালের অভ্যন্তরভাগে মূল অলংকরণের বেশির ভাগ এখনো অক্ষতভাবে সংরক্ষিত আছে। খোদাই করা অলংকৃত স্তম্ভগুলো, যার ওপর মিহরাব খিলানগুলো স্থাপিত, চিরাচরিত ঝুলন্ত মোটিফ ও অন্যান্য নকশাসমূহ প্রদর্শন করে। মিহরাব খিলানগুলোর স্প্যান্ড্রিল পূর্ণ প্রস্ফুটিত গোলাপ নকশায় অলংকৃত।

অন্যদিকে এগুলোর আয়তাকার ফ্রেমগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে দ্রাক্ষালতার পেঁচানো নকশা দ্বারা শোভিত। গম্বুজের বৃত্তাকার ভিত্তির ভেতরে ছাঁচকৃত কার্নিসপট্টি আছে, যার ওপরের প্রান্ত (বর্ডার) কাঙ্গুরা মারলোন এবং ওপরের অংশ বিচিত্র নকশায় সজ্জিত।

রাজবিবি মসজিদ ও তার স্থাপত্যরীতি বাংলা অঞ্চলের উন্নত সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই প্রমাণ বহন করে।

বাংলাপিডিয়া অবলম্বনে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা