kalerkantho

‘আমারও ছিল কাবা দেখার স্বপ্ন’

নায়লা হাসান, প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা, অকল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৬ আগস্ট, ২০১৯ ১৩:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আমারও ছিল কাবা দেখার স্বপ্ন’

গত ১৫ মার্চ জুমার নামাজের সময় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের আল নুর মসজিদ ও লিনউড ইসলামিক সেন্টারে ব্রেন্টন হেরিসো টারান্ট নামের অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত এক শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী যুবক মুসল্লিদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালায়। এতে ৫১ জন মুসল্লি নিহত হন এবং প্রায় ৫০ জন আহত হন। এই হামলার পরদিন নিহত মুসলিমদের প্রতি আবেগপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় সমবেদনা জ্ঞাপন করেন নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড পুলিশ বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট নায়লা হাসান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল তাঁর ভাষণটি, যা মুহূর্তেই বিশ্বে পরিচিত করে তোলে এই মুসলিম নারীকে।

সম্প্রতি শেষ হওয়া পবিত্র হজে সৌদি আরবের কিং সালমান বিন আবদুল আজিজের রাজকীয় অতিথি হিসেবে ৭৩টি দেশের ছয় হাজার ৩০০ লোকের হজের ব্যবস্থা করা হয়। এতে নিউজিল্যান্ডের হামলায় নিহতদের নিকটাত্মীয়দের থেকে মোট ২০০ লোকের হজের ব্যবস্থা করা হয়, যাঁদের মধ্যে ছিলেন নিউজিল্যান্ডের সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা ও সর্বোচ্চ পদাধিকারী মুসলিম নারী নায়লা হাসানও। প্রথমবারের মতো হজ আদায় করতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করেন এবং সৌদি যুবরাজ সালমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

এক সাক্ষাৎকারে নায়লা হাসান নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন মুসলিম হিসেবে সবার মতো আমারও পবিত্র কাবা দেখার স্বপ্ন ছিল। মক্কা ও মদিনা গমনের ইচ্ছাও ছিল। আজ পবিত্র কাবা দেখে আমি সত্যিই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি। আমার স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় আমি খুবই আনন্দ বোধ করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডে মসজিদের হামলায় নিহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপনের বক্তব্যটি ছিল আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত। এমন পাশবিক আক্রমণে আমি খুবই ভারাক্রান্ত হয়েছিলাম। তা ছাড়া নিউজিল্যান্ডের মুসলিমসমাজেও এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ খুব বেশি বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল।’

ঈদের পরদিন হজ সমাপ্তির পর সৌদি আরবের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী আবদুল লতিফ আলে শায়েখ মিনায় অবস্থিত মসজিদুল খাইফে সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা নায়লা হাসানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তিনি এই পুলিশ কর্মকর্তার খোঁজখবর নেন এবং বলেন, কিং সালমান ও ক্রাউন প্রিন্সের সম্মানিত অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও যথোপযুক্ত সম্মান প্রদানের অংশ হিসেবে মন্ত্রীদের সঙ্গে আমন্ত্রিত রাজকীয় অতিথিদের সৌজন্য সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়।

বিস্ময় ও বৈচিত্র্যে ভরপুর সময়ের সাহসী নায়িকা নায়লা হাসানের জীবন। বাবা নাসা ছিলেন পাকিস্তানের লাহোর থেকে আগত একজন ধার্মিক মুসলিম। মা জোসেফিনের সঙ্গে ইংল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পর্ক তৈরি হয় তাঁর বাবার। ১৯৬৮ সালের ৯ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন নায়লা হাসান। দুই যমজ বোন সামিনা ও রুকসানাকে নিয়েই বেড়ে ওঠা তাঁর। বিখ্যাত বক্সার মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল তাঁদের বাবার। ফলে তাঁর ঘরে যাতায়াত ছিল তাঁদের। আর সময়গুলোও খুব সুন্দরভাবে কাটত তাঁদের।

ইংল্যান্ডে সবার সঙ্গে সবার যোগাযোগ ছিল খুব বেশি। কিন্তু নিউজিল্যান্ডে স্থায়ীভাবে আসার পর মুসলিম হিসেবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন নায়লা। মুসলিম হওয়ায় নানা রকম প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। আর তা এড়িয়ে চলতে কখনো কারো কাছে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা প্রকাশ করেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা। সমাজের সঙ্গে মিলেমিশে থাকাকেই গুরুত্ব দেন তিনি। তাই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যুক্ত হন এবং ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেন।

নেপালের বিখ্যাত হিমালয়ের পর্বত শাখা মেরাপিক পর্বতের ছয় হাজার ৪৭৬ কিলোমিটার ভয়ংকর পথ পাড়ি দেন তিনি। তা ছাড়া জাতীয় ববসলাইয়ের সদস্যও তিনি। অলিম্পিকের হয়ে অনেক খেলায়ই অংশ নিয়েছেন। সাইকেল চালানো, মাছ শিকার, ফ্রি ডাইভিংসহ নানা রকম কাজে যুক্ত আছেন তিনি।

পুলিশে যোগ দিয়ে নায়লা সিডনির চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুলিশিং ইনভেস্টিগেশন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল ডিগ্রি অর্জন করেন। ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। পুলিশ হিসেবে তিনি ইনভেস্টিগেশন বিভাগ, প্রসিকিউটর, ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটর ম্যানেজার, এরিয়া প্রিভেনশন ম্যানেজার ও ডিস্ট্রিক্ট কমান্ডারের কাজ করেছেন। সর্বশেষ অকল্যান্ডের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি।

বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী নায়লা ব্যক্তিজীবনে ধর্মীয় অনুশাসন অতীতে পুরোপুরি না মানলেও সাম্প্রতিক সময়ে মেনে চলার চেষ্টা করছেন। তবে অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, ক্যারিয়ারে যথেষ্ট উন্নতি করেও চাকরিজীবনের দীর্ঘ ২০ বছর নিজের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কাউকে কিছু বলেননি তিনি। এমনকি সহকর্মীদের কাছেও বিষয়টি ছিল গোপন। পরবর্তী সময়ে পুলিশের উচ্চ পদে আসীন হয়ে নিজের মুসলিম হওয়ার কথা প্রকাশ করলে সবাই বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে। এর পর থেকে তিনি মুসলিম হিসেবে জীবনযাপনের প্রতি মনোযোগী হন। তা ছাড়া ক্রাইস্টচার্চের বর্বরোচিত হামলার পরদিন তাঁর দেওয়া বক্তব্য পুরো বিশ্বের সব মসুলিম-অমুসলিমের হৃদয়ে খুবই রেখাপাত করে। একজন দৃঢ়প্রত্যয়ী মুসলিম হিসেবে তাঁর ভাষণটি ছিল যথেষ্ট আবেগপূর্ণ ও সময়োপযোগী। একজন মুসলিমের দৃঢ় অবস্থান ও হজে গমনের স্বপ্নপূরণের বিষয়টি সামনের দিনগুলোতে ইসলামের চিন্তা-বিশ্বাস ও অনুশাসন মেনে চলার শক্তি জোগাবে বলে মনে হয়। মহান আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য ইসলামের ওপর অবিচলতা ও আনুগত্যের দৃঢ়তাই কামনা করি।

আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর করেছেন মো. হেদায়াতুল্লাহ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা